উলট পুরাণ: বাংলাদেশে প্রথমবার ইলিশ রপ্তানি করল ভারত ,ত্রাতা মোদীর রাজ্য
deshersamay


প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে ওপার বাংলা থেকে ‘উপহার’ হিসেবে এ পার বাংলায় ইলিশ আসার চেনা ছবিটা এ বার একেবারেই বদলে গিয়েছে । বাংলাদেশের ইলিশের জন্য মুখিয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি। কিন্তু সেই ভাবে ও পার থেকে এ পারে ইলিশ আসে না। অন্তত এই বছর বাংলাদেশের ইলিশ আসেইনি ভারতে। কিন্তু এ বার ঘটল উলট পুরাণ। ইলিশ খেতে বাংলাদেশের ভরসা হয়ে উঠেছে ভারত। আরও নির্দিষ্ট করে বললে গুজরাট। হাওড়ার মাছ বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য থেকে গত দুই মাসে ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশে।

বর্ষা এলেই দুই বাংলার পাতে রকমারি ইলিশ পদের চল বহুদিনের। এ বারের বর্ষায় বাংলাদেশে ইলিশ উৎপাদন কম হওয়ায় ভরসা হয়ে উঠেছে ভারতের গুজরাট। কারণ গুজরাটে প্রচুর ইলিশ মাছ উঠছে। নিজেদের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশের মাছ ব্যবসায়ীরা গুজরাটের ভারুচ বন্দর এবং হাওড়া পাইকারি মাছ বাজার থেকে গত দুই মাসে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি করেছে। আরও এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে দেড়শো থেকে দুশো মেট্রিক টান ইলিশ মাছ বাংলাদেশ পাঠানো হবে বলে জানাচ্ছেন হাওড়ার মাছ ব্যবসায়ীরা।

হাওড়া হোলসেল ফিস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ বলেন, আমরা সাধারণত ভারত থেকে বোয়াল, রুই, পার্শে, ট্যাংরা বাংলাদেশে পাঠাই। এ বার ওখানে ইলিশের ঘাটতি থাকায় এই প্রথম এখান থেকে বাংলাদেশে ইলিশ পাঠানো হলো।

গুজরাটের ইলিশ কেন চাইছে বাংলাদেশ?
সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং সিলেটে ডিম ভর্তি ইলিশের চাহিদা বেশি। ভারতের মধ্যে গুজরাটের ইলিশে ডিম ভর্তি থাকে, সেই কারণে তা বাংলাদেশে বেশি পছন্দের বলে জানাচ্ছে তিনি। চট্টগ্রামের দিকে নোনা মাছ খাওয়ার চল রয়েছে। গুজরাট থেকে যাওয়া ইলিশ শুকিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও, ইলিশের ডিম বের করে সেটা প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর পুজোর আগে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার থেকে প্রচুর ইলিশ মাছ আমদানি করা হয়।’ তিনি জানান, এই বছর ভারতের মাছ ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য বিভাগের কাছে সরাসরি ইলিশ মাছের জন্য আবেদন করেছেন। কবে পদ্মার ইলিশ ঢুকবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এন্ড স্টাফ ওয়েল ফেয়ার এ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, উৎসব-অনুষ্ঠানে পাতে ইলিশ না থাকলে বাঙালির মন কোনোভাবেই ভরতে চায় না, তা সে এ পার বাংলাই হোক কিংবা ও পার বাংলা। বিশ্বের মধ্যে ইলিশ ধরার দিক থেকে প্রথম স্থানে থাকা বাংলাদেশে মোট উৎপাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ইলিশ ধরা হয়। কিন্তু চলতি বছর সেখানে ইলিশের আকাল দেখা দেওয়ায় সেই ঘাটতি মেটাতে উদ্যোগী হয়েছেন ওপার বাংলার ব্যবসায়ীরা। হাওড়া পাইকারি মাছ বাজার এবং গুজরাটের ভারুচ বন্দর থেকে গত দু’মাসে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি করেছে বাংলাদেশ। শুধু তা-ই নয়, সেই মাছ প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশেও পাঠানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার জলচুক্তি জট কাটার পরিবর্তে ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই দুই দেশের মৎস্য বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করে। পরের বছর অর্থাৎ ২০১২ সালের ১ অগাস্ট সব রকম মাছ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাংলাদেশ। যদিও পরবর্তীতে অন্য মাছে নিষেধাজ্ঞা উঠলেও ইলিশের ক্ষেত্রে তা বহাল থাকে। ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় কেবল ‘সৌজন্য উপহার’ হিসেবে কিছু নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ পাঠানোর প্রথা চালু হয়, যা অতিমারির পর থেকে আরও কমে গিয়েছে।

গত বছর বাংলাদেশ সরকার ১২০০ টন ইলিশ রপ্তানির ছাড়পত্র দিলেও শেষ পর্যন্ত এসেছিল মাত্র ১৪৩.৮০ টন। তার আগের দু’বছরে এই পরিমাণ ছিল ৬০০ টনেরও কম। এদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ওপার বাংলার সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারতে যা পাঠানো হয় তা কোনো বাণিজ্য নয়, পুরোটাই ‘সৌজন্য উপহার’, এবং এই মুহূর্তে সরাসরি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। ফলে এ বছর পুজোয় উপহারের পরিমাণ কী হবে, তা নিয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট চিত্র নেই। সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ জানান, এ পারের মাছ ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য দপ্তরের কাছে সরাসরি ইলিশের জন্য আবেদন করেছেন, তবে কবে নাগাদ পদ্মার সুস্বাদু ইলিশ এ দেশে ঢুকবে, তা এখনও সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
