পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর পরিবর্তনের হাওয়া কি কুমোরটুলিতে এসেছে ?খোঁজ নিল দেশের সময়
deshersamay


কলকাতা: হাতে আর সপ্তাহ দু’য়েক। পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার দিন যত এগিয়ে আসছে, পটুয়া পাড়ার অলিগলিতে ততই বাড়ছে কর্মব্যস্ততা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ছবিশিকারি এবং কৌতূহলী মানুষদের ভিড়।

সকাল হোক বা বিকেল, এ সময় থেকে মহালয়া পর্যন্ত পটুয়া পাড়াতে মানুষের আনাগোনা সাধারণত বেশিই থাকে। তুঙ্গে থাকে মৃৎশিল্পীদের প্রতিমা তৈরির শেষ পর্বের প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোর আগে এখন কেমন ব্যস্ততা কুমোরটুলিতে? দেখে এল দেশের সময়।

কুমোরটুলিতে কাজ করেন পাঁচ শতাধিক শিল্পী। সঙ্গে রয়েছেন সাড়ে তিন হাজারের বেশি কারিগর। সকলেই এখন ব্যস্ত। নাওয়া-খাওয়ার সময়টুকুও যেন নেই।

বেশির ভাগ শিল্পীরই প্রতিমা গড়ার কাজ প্রায় শেষ। অন্ধকার ঘুপচি ঘরগুলিতে এখন চলছে মূর্তি শুকোনোর কাজ। কেউ কেউ সদ্য হাত দিয়েছেন রঙে। কেউ কেউ আবার মন দিয়েছেন দুর্গার চোখ, মুখ, নাক টান টান করার কাজে।

প্রত্যেক শিল্পীরই কর্মশালায় এখন থরে থরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুর্গা, গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতীর মূর্তি। অনেক মূর্তির হাতে একটি করে কাগজে ঝোলানো রয়েছে বায়নাপত্র। তাতে যিনি বা যে ক্লাব মূর্তির বরাত দিয়েছে, তাঁর বা সেই ক্লাবের নাম, ঠিকানা লেখা।

তবে এখন মোটামুটি যে প্রতিমাগুলি তৈরি হচ্ছে বা কুমোরটুলিতে রাখা আছে, তার বেশির ভাগই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা বা আশপাশের রাজ্য থেকে বরাত পাওয়া। বিদেশে যে সব প্রতিমা পাড়ি দেয়, তা তৈরি হয়ে পাঠানো শুরু হয়ে গিয়েছে অনেক দিন আগে থেকেই। কিছু কিছু মূর্তি জাহাজে করে গন্তব্যে পৌঁছোনোর মুখে।
এ বারও মিন্টু পাল, কৌশিক ঘোষেদের তৈরি ঠাকুর পাড়ি দিচ্ছে আমেরিকা, কানাডা, জার্মানি, ইটালি, এমনকি আফ্রিকার কেনিয়া এবং উগান্ডার মতো দেশে। ফলে তাঁদের ব্যস্ততা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
বড় বড় ঠাকুরের পাশাপাশি চাহিদা থাকে তিন-পাঁচ-সাত ফুটের ছোট ছোট ঠাকুরেরও। তবে তার বেশির ভাগই ছোট ক্লাবের কিংবা বাড়ির ঠাকুরের পুজো।

কুমোরটুলির কয়েক জন শিল্পীর সেই ছোট মূর্তি গড়ার জন্যই নামডাক রয়েছে। ফলে বড় প্রতিমার পাশাপাশি ছোট দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজও চলছে জোরকদমে।
সকাল-বিকাল ছবিশিকারিদেরও ভিড় জমছে কুমোরটুলিতে। কেউ কেউ আসছেন প্রতিমা এবং কারিগরদের ছবি তুলতে, আবার নতুন প্রজন্মের অনেকে আসছেন নিজেদের ছবি তোলাতেও।
দিব্য তাঁরা ঢুকে পড়ছেন মৃৎশিল্পীদের কর্মশালায়। অনেকে অনুমতি নিচ্ছেন, অনেকে সেটাও করছেন না। অনেকে মৃৎশিল্পী এই অতি উৎসাহীদের নিয়ে বিরক্ত। প্রতিমার ছবি তুলতে সাফ মানা করছেন তাঁরা।

চলতি বছর পশ্চিমবঙ্গে পালাবদল হয়েছে। রাজ্যে এখন বিজেপি সরকার। সেই পরিবর্তনের হাওয়ায় কি কুমোরটুলিতেও কিছু পরিবর্তন এসেছে?
গত ১০ বছরে রাজ্যে দুর্গাপুজো আর থিম সমার্থক হয়ে উঠেছে। তবে শিল্পীদের একাংশের মতে, এ বছর সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। থিমের ঠাকুরের পরিবর্তে চাহিদা বেশি সাবেকি প্রতিমার।
গত সরকারের মতো এই সরকার পুজোয় ক্লাবগুলিকে অনুদান দেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, পুজোর সংখ্যা কমবে কি না।
কিন্তু কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের হিসাব সে কথা বলছে না। তাঁরা জানিয়েছেন, আগে যেমন অর্ডার আসত, তেমনই আসছে। কুমোরটুলির একাংশের মতে বরং সেই সংখ্যা বেড়েছে।

কুমোরটুলির নামকরা শিল্পী মিন্টু পালের কথায়, ‘‘পুজোর অর্ডার যেমন আসত তেমনই আসছে। তবে এ বার পুজোয় সাবেকি ঠাকুরের চাহিদাই বেশি বলে মনে হচ্ছে। পুজো এ বার ভালই হবে বলে মনে হয়।’’
পুজোর মরসুম ধরে বছরে অন্তত ৫০০ লরি মাটি লাগে কুমোরটুলিতে। পুজোর চার-পাঁচ মাস আগে থেকে পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। অন্যান্য বছরে জুনেই মা দুর্গার মূর্তিতে মাটি দেওয়ার কাজ অনেকটা এগিয়ে যায়। কিন্তু এ বার তা হয়নি।
প্রতিমা তৈরির জন্য বিশেষ ধরনের এঁটেল মাটি আসে ডায়মন্ড হারবার থেকে। তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় সেখানে মাটি কাটার কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল নতুন সরকার।
তার পরে মৃৎশিল্পীদের সংগঠনের তরফে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দেওয়া হয়। মাটি আনার অনুমতিও মেলে। তবে তাতে মাটির দাম কিঞ্চিৎ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন মৃৎশিল্পীরা। যদিও মৃৎশিল্পীদের একাংশের দাবি, মাটির দাম বাড়লেও পুরো বিষয়টি সরকারি ভাবে হচ্ছে। ফলে কাজে অসুবিধা হচ্ছে না।

কিন্তু রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের কারণে কি সার্বিক ভাবে কুমোরটুলির পরিবর্তন এসেছে? ৮৮ বছর বয়সি জনৈক মৃৎশিল্পীর কথায়, ‘‘কত সরকারই তো এল-গেল। কত আলোচনা হল কুমোরটুলি নিয়ে। কিন্তু কুমোরটুলির পরিবর্তন নেই।’’

