

মেসি কলকাতায় আসার পর যেই উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল সেটা ২০ মিনিটের একটা ঘটনায় নষ্ট হয়। মেসিকে ঘিরে যেই স্বপ্ন দেখেছিলেন সমর্থকরা তার শেষ হয় আয়োজকদের ব্যর্থতায়। শনিবার সকাল থেকে মেসিকে ঘিরে কী হলো? রইল টাইম লাইন।
ভোররাতের কলকাতা। কুয়াশা, শীত আর উত্তেজনা মিলিয়ে-মিশিয়ে শনিবার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে হাজির কাতারে কাতারে সমর্থক। ভোর আড়াইটে নাগাদ বিলাসবহুল পার্সোনাল জেট থেকে বাইরে পা রাখলেন লিওনেল মেসি। সঙ্গে লুইস সুয়ারেস , রদ্রিগো দি পল । তিনদিনের ‘গোট ট্যুর ইন্ডিয়া’-র সূচনা কলকাতা থেকে। শহর জুড়ে উন্মাদনার আবহ তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। বাস্তবেও তার কমতি ছিল না।

কিন্তু দিন গড়াতে গড়াতে সেই উচ্ছ্বাস কীভাবে ধীরে ধীরে অস্বস্তি, ক্ষোভ আর শেষ পর্যন্ত বিশৃঙ্খলায় বদলে গেল—তার সাক্ষী রইল শনিবারের কলকাতা। ভোরের দৃশ্যটা ছিল চেনা। বিমানবন্দরের বাইরে রাতভর অপেক্ষা। কেউ পতাকা হাতে, কেউ আকাশি-সাদা জার্সিতে। কেউ বা শুধু মোবাইল ক্যামেরা আঁকড়ে দাঁড়িয়ে—এক ঝলক মেসিকে দেখার আশায়। কিন্তু কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ব্যাক এন্ট্রি দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যান আর্জেন্তিনীয় ফুটবল তারকা। অপেক্ষারত অধিকাংশ সমর্থকই তাঁকে চোখে দেখার সুযোগ পাননি। হতাশা গ্রাস করলেও কুলভাঙা নয়। নিয়ন্ত্রিত। কারণ সামনে দিনভর কর্মসূচি।
১৩ তারিখ সকাল সাতটার আগে থেকে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের বাইরে সমর্থকরা ভিড় করেন। কেউ হানিমুনের জন্য জমানো টাকা দিয়ে টিকিট কেটে এসেছেন, আবার কেউ ২ লাখ টাকা খরচ করে নেপাল থেকে এসেছেন। প্রত্যেকেই তৈরি ছিলেন মেসিকে বরণ করার জন্য।

নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হয় অনুষ্ঠান। গান, নাচের মধ্যে দিয়ে সমর্থকদের মাতিয়ে রাখা হয়। অন্যদিকে সকাল সাড়ে ৯টার সময়ে হোটেলে স্পনসরদের অনুষ্ঠানে অংশ নেন মেসি। সেখানে মেসির সঙ্গে দেখা করেন শাহরুখ খান। ছবি তোলেন তিনি।
সাডে় ১০টা নাগাদ মেসি ভার্চুয়ালি উন্মোচন করেন তাঁর মূর্তি। লেকটাউনে ৭০ ফিটের মূর্তি উন্মোচন করে তিনি প্রশংসা করেন। পাশাপাশি শহরে এসে যে তিনি খুশি সেটাও জানান। সেখানেই মেসির সঙ্গে দেখা করেন টলিউড অভিনেত্রী শুভশ্রী।
১১টা ১০ নাগাদ মেসির জন্য বিশেষ ম্যাচ শুরু হয়। মুখোমুখি হয় মোহনবাগান মেসি অলস্টার ও ডায়মন্ড হারবার মেসি অলস্টার। ম্যাচ হাফ টাইমের পর ফের শুরু হয়।

সাড়ে ১১টার সময়ে মেসি মাঠে প্রবেশ করেন। গাড়ি করে মাঠের পাশে নামেন তিনি। সঙ্গী রদ্রিগো ডি পল, সুয়ারেজ় ও তাঁর টিম। গাড়ি থেকে নেমে মেসি হেঁটে স্টেডিয়াম ঘুরে দেখা শুরু করেন।
এর পর হয় শুরু বিশৃঙ্খলা। প্রথমে মেসির সঙ্গে ডি পল, সুয়ারেজ় ও তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা থাকলেও ধীরে ধীরে সেই ভিড়টা বাড়তে থাকে। সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে আয়োজকদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষরা মেসির পাশে ভিড় করেন। কেউ ভিড় ঠেলে সেলফি তোলেন আবার কেউ অটোগ্রাফ নেন।
এ ভাবে চলে ২০ মিনিট। এতেই বিরক্ত হন মেসি। স্টেডিয়ামের অর্ধেকও পরিদর্শন করেননি মেসি। তখনই বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর পর টানেল দিয়ে সরাসরি বেরিয়ে যান মেসি। ১১টা ৫৫ মিনিটে মেসি বেরিয়ে যান যুবভারতী ছেড়ে।

তাঁকে বেরিয়ে যেতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সমর্থকরা। স্লোগান দিতে থাকেন We Want Messi বলে। মেসি আর ফিরবেন না দেখেই বোতল ছোড়া শুরু করেন সমর্থকরা। সেই ক্ষোভ আরও বাড়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে কোনও ঘোষণা না আসায়। বোতল ছোড়াটা ধীরে ধীরে পোস্টার ছেঁড়ায় রূপ নেয়। এবং পুরো দর্শক ক্ষেপে যায়। মেসি বেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁর পিছন পিছন সেলিব্রিটি, আয়োজকরা বেরিয়ে যান। দর্শকরা ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠে নেমে ভাঙচুর চালান। প্লেয়ার টানেল, চেয়ার, পোস্টার, সোফা, গোলপোস্টের নেট নষ্ট করা হয়। পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিয়ে লাঠিচার্জ করে।
দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইট করে ঘটনার নিন্দা করেন এবং আয়োজকদের ব্যর্থতার দিকে আঙুল তোলেন। পাশাপাশি মেসি ও সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চান। তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা করেন।
দুপুর দুটো নাগাদ মেসি শহর ছাড়েন। ব্যক্তিগত বিমানে ডি পল, সুয়ারেজ়কে নিয়ে তিনি শহর ছেড়ে হায়দ্রাবাদে যান। একই সময়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে জানানো হয়, মেসির ইভেন্টের আয়োজক শতদ্রু দত্ত গ্রেপ্তার।

গোটা ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে মেসির কাছে ক্ষমা চান। ‘মিসম্যানেজমেন্ট’-এর কথা স্বীকার করেন। তদন্তের ঘোষণা করেন।
বিকেলে সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার সাফ জানান—ঘটনার দায় অর্গানাইজারদের। মূল আয়োজক শতদ্রু দত্তকে আটক করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। ভিড়ের অনুমান, টিকিট বিক্রি আর স্টেডিয়ামের সক্ষমতার মধ্যে বড় ফারাক ছিল বলেই উঠে এসেছে প্রাথমিক তদন্তে।
কিন্তু এই চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও গোটা দিনের টুকরো টুকরো কিছু দৃশ্য আলাদা করে মনে থেকে যায়। যেমন, বিমানবন্দরে এক তরুণীর হাতে ধরা প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা—‘ভারতীয় ফুটবলকে বাঁচান’ । কোনও চিৎকার নেই। অযথা নাটক নেই। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপ যেন গোটা দিনের সারকথা বলে দেয়। মেসির সফর জৌলুসে ভরা। অথচ ভারতীয় ফুটবলের বাস্তবতা আলাদা।

দিনের শেষে কলকাতার প্রাপ্তি-ই বা কী? মূর্তি উদ্বোধন, ২০ মিনিটের উপস্থিতি আর বিশৃঙ্খলার কলঙ্ক? অবতরণে উচ্ছ্বাস ছিল। প্রস্থানে রয়ে গেল প্রশ্ন, ক্ষোভ আর তদন্তের প্রতিশ্রুতি। মেসি চলে যাবেন হায়দরাবাদ, দিল্লি। কিন্তু কলকাতার শনিবার ফুটবলের ইতিহাসে থাকবে এক ব্যর্থ আয়োজনের দিন হিসেবে।



