জোড়াফুল প্রতীক শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে —মমতা না ঋতব্রতর? দুই শিবিরকে দিল্লিতে তলব নির্বাচন কমিশনের
deshersamay

তৃণমূল কংগ্রেসের জোড়াফুল প্রতীক শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট শিবির, না বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী? নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন ঘোষণার পর সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আগামী ১২ সেপ্টেম্বর দুই শিবিরকেই দিল্লিতে ডেকে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে যেমন ওই দিন কমিশনের সামনে হাজির হতে বলা হয়েছে, তেমনই এক ঘণ্টার ব্যবধানে ডাকা হয়েছে কালীঘাট-তৃণমূলের প্রতিনিধিদেরও। এ বিষয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে কমিশন।
ফলে রাজনৈতিক মহলের নজর এখন ১২ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের দিকে। ওই দিনই কি জোড়াফুল প্রতীকের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে? নাকি দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর সিদ্ধান্তের জন্য আরও সময় নেবে কমিশন? আপাতত কোনও উত্তরই নিশ্চিত নয়।
মমতা শিবিরের বক্তব্য, উপনির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি ইতিমধ্যেই জারি হয়ে গিয়েছে এবং আদর্শ আচরণবিধিও কার্যকর হয়েছে। ফলে নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগের ব্যবস্থাই বহাল থাকবে।

তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, প্রার্থী ঘোষণা এবং প্রচার শুরু করার ক্ষেত্রে তাঁদের কোনও বাধা নেই। তাঁর কথায়, “আদর্শ আচরণবিধি জারি হয়ে গিয়েছে। ফলে প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচার শুরুতে বাধা নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই প্রতীক দেওয়ার অধিকার ছিল। কমিশন নতুন কোনও নির্দেশ দেয়নি। ফলে এখন আর নতুন করে তারা নির্দেশ দিতে পারবে না।”
কালীঘাট শিবিরের যুক্তি, কমিশন এখনও পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতীক অনুমোদনের ক্ষমতা বাতিল করে কোনও নির্দেশ জারি করেনি। তাই উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের জোড়াফুল প্রতীক দেওয়ার অধিকার তাঁর হাতেই রয়েছে।
তবে কমিশনের ১২ সেপ্টেম্বরের শুনানি সেই অবস্থানে পরিবর্তন আনতে পারে কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে জল্পনা।

অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও নিজেদের সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবেই তুলে ধরছে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ উপনির্বাচনের দাবি জানিয়ে তারা রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে দলীয় লেটারহেডে স্মারকলিপি দিয়েছে।
তবে জোড়াফুল প্রতীক পাওয়ার দাবি বা সেই বিষয়ে তাঁদের আইনি অবস্থান কী, তা প্রকাশ্যে স্পষ্ট করেননি ঋতব্রত শিবিরের নেতারা। ঘরোয়া আলোচনায় তাঁদের একাংশের বক্তব্য, বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবারের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন প্রতীক নিয়ে কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে পারে।
দুই পক্ষই নিজেদের মূল তৃণমূল বলে দাবি করায় নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন শুধু প্রতীক নয়, দলের সাংগঠনিক কর্তৃত্ব নির্ধারণের প্রশ্নও রয়েছে। কোন শিবিরের হাতে সংগঠনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন কার দিকে এবং দলীয় সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার—এসব বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, হাতে সময় অত্যন্ত কম থাকায় নির্বাচন কমিশন আপাতত জোড়াফুল প্রতীকটি ফ্রিজ করে দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে মমতা ও ঋতব্রত—দুই শিবিরকেই পৃথক অস্থায়ী নাম ও প্রতীক নিয়ে উপনির্বাচনে লড়তে বলা হতে পারে।
রাজনৈতিক দলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধের অতীত মামলাগুলিতে নির্বাচন কমিশন এমন অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ করেছে। চূড়ান্ত শুনানি এবং নথিপত্র যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত মূল প্রতীক কোনও পক্ষকেই ব্যবহার করতে না দেওয়ার নজির রয়েছে।
যদিও তৃণমূলের ক্ষেত্রে কমিশন শেষ পর্যন্ত সেই পথে হাঁটবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কালীঘাট শিবিরের দাবি, নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ার পরে প্রতীকের বর্তমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন করা উচিত নয়। ঋতব্রত শিবির আবার নিজেদের সাংগঠনিক ও পরিষদীয় শক্তির ভিত্তিতে স্বীকৃতি দাবি করতে পারে।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৬ সেপ্টেম্বর। ফলে ১২ সেপ্টেম্বরের শুনানির পর নির্বাচন কমিশনের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য খুব বেশি সময় থাকবে না।
প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দলীয় প্রতীক সংক্রান্ত নির্দিষ্ট অনুমোদন জমা দিতে হয়। তাই কোন শিবিরের মনোনীত প্রার্থী জোড়াফুল ব্যবহার করতে পারবেন, অথবা আদৌ কোনও শিবির সেই প্রতীক পাবে কি না—তা দ্রুত স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারলে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাই সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এই প্রতীক-লড়াইয়ের মধ্যেই আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টে উঠতে চলেছে তৃণমূলের ২০ জন সাংসদের সদস্যপদ খারিজের আবেদন। মামলাটি করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
কাকলি ঘোষদস্তিদার-সহ ওই সাংসদরা তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআই-তে যোগ দিয়ে এনডিএ-কে সমর্থন করার পর তাঁদের সদস্যপদ বাতিলের দাবি ওঠে। সেই সূত্রেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন অভিষেক।
উপনির্বাচনে জোড়াফুল প্রতীকের মালিকানা এবং ২০ সাংসদের সদস্যপদ সংক্রান্ত মামলার মধ্যে সরাসরি আইনি সম্পর্ক নেই। তবে রাজনৈতিকভাবে দুটি বিষয়ই তৃণমূলের ভাঙন এবং কোন শিবিরকে মূল দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে—সেই বৃহত্তর সংঘাতের অংশ।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়েও আইনি লড়াই চলছে। হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আপাতত তাঁকে ‘প্রভিশনাল’ বা অস্থায়ী বিরোধী দলনেতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
একই সঙ্গে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে মামলাটির নিষ্পত্তি করতে সিঙ্গল বেঞ্চকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের শুনানি, অন্যদিকে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি ঘিরে হাইকোর্টের মামলা—দুই ক্ষেত্রেই ঋতব্রত শিবিরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিচারাধীন।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন উপনির্বাচনের প্রতীক। মনোনয়নের সময়সীমা এগিয়ে আসায় বল কার্যত নির্বাচন কমিশনের কোর্টে। ১২ সেপ্টেম্বর কমিশন কোনও একটি শিবিরের হাতে জোড়াফুল তুলে দেয়, প্রতীক ফ্রিজ করে নাকি সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে—তার উপরেই নির্ভর করবে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে দুই তৃণমূলের নির্বাচনী লড়াইয়ের চেহারা।
