

কয়েক ঘণ্টা আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকানে এসে ঝালমুড়ি খেয়ে গিয়েছেন। এরই মধ্যে ঝাড়গ্রাম শহরের মশলামুড়ি বিক্রেতা বিক্রমকুমার সাউ হয়ে উঠেছেন সেলেব্রিটি। দোকানে ভিড় করছেন এলাকার লোকজন। বার বার তাঁর বাবা, মায়ের কাছেও ফোন আসছে। শুনতে চাইছেন, সেই মুহূর্তে ঠিক কী কী হলো। শুধু বিক্রমের কাছেই নয়, ফোন আসছে তাঁর পরিবারের লোকজনের কাছেও।

রাজনীতির রণক্ষেত্রে লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন মেজাজটা একটু হালকা করতে কার না ইচ্ছে করে? আর সেই জায়গাটা যদি হয় পশ্চিমবঙ্গ, তবে তো কথাই নেই!
প্রচারের মাঝপথে রাজপথ ছেড়ে হুট করে পাড়ার মোড়ের ঝালমুড়ির দোকানে ঢুকে পড়লেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী (Narendra Modi)। দশ টাকার ঝালমুড়ির (Jhalmuri) ঠোঙায় যে এমন রাজকীয় ‘ক্যামেরা মোমেন্ট’ লুকিয়ে ছিল, তা আগে কে জানত!

ঝাড়গ্রাম স্টেডিয়ামে নির্বাচনী জনসভা শেষে হেলিপ্যাডে ফেরার পথে মোদী রাজ কলেজ মোড়ের একটি রাস্তার ধারের দোকানে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়েন। তারপর একটি দোকান থেকে মুড়ি কিনে খেতে শুরু করেন। সেই সময়ে আবার দোকানি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি পেঁয়াজ খান কিনা। মোদী মুচকি হেসে জবাব দেন, ‘পেঁয়াজ খাতে হ্যাঁয়!’ একটু থেমে আবার বলেন, ‘লেকেন দিমাগ নহি খাতে হ্যাঁয়’। এর অর্থ, ‘পেঁয়াজ খাই, মাথা খাই না।’ তারপর দেখা যায়, বাংলার অন্যতম প্রসিদ্ধ খাবার, ঝালমুড়ি বেশ আরাম করেই খান মোদী। ওই সময়ের মধ্যেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং জনসংযোগ স্থাপন করেন।
ভোটের মরসুমে এ বঙ্গে রাজনীতির সঙ্গে রান্নাবান্নার সম্পর্ক বেশ পুরনো। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কখনও দেখা গেছে খুন্তি নাড়িয়ে চপ ভাজতে, কখনও বা রাস্তার ধারের দোকানে পরম মমতায় চা বানাতে। অন্যান্য প্রার্থীরা আবার কোথাও মাছ কাটছেন তো কোথাও বাড়ির দেওয়ালে পটু হাতে চুনকাম করছেন। কিন্তু এ বার সব প্রচারের লাইমলাইট কেড়ে নিলেন নরেন্দ্র মোদী। প্রচারের কনভয় থামিয়ে তিনি যখন ঝালমুড়ির দোকানে পা রাখলেন, তখন নিরাপত্তারক্ষীদের কপালে ভাঁজ পড়লেও আমজনতার চোখেমুখে ছিল বিস্ময়।

দোকানির হাতে দশ টাকার কড়কড়ে নোট দিয়ে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি নিলেন প্রধানমন্ত্রী। সর্ষের তেলের ঝাঁঝ আর কাঁচালঙ্কার ঝালে যখন মোদীর মুখ উজ্জ্বল, ঠিক তখনই দেখা গেল এক অন্য দৃশ্য। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক শিশুর দিকে মুড়ির ঠোঙা বাড়িয়ে দিলেন তিনি। শুধু ওই শিশুদের নয়, পাশে থাকা কয়েকজনের সঙ্গেও ভাগ করে নিলেন নিজের খাবার। প্রধানমন্ত্রীর এই ‘শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং’ মেজাজ দেখে পথচলতি মানুষ থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া – সবই এখন সরগরম।
বিরোধীরা অবশ্য একে ‘গিমিক’ বলে কটাক্ষ করতে ছাড়ছেন না। তবে ঝালমুড়ির সেই মশলার গন্ধ ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মোদীর এই ঘরোয়া অবতার। আসলে বাংলার নাড়ি বুঝতে হলে যে বাংলার খাবারের অলিগলিতে ঘুরতে হয়, তা সম্ভবত দিল্লির মসনদে বসে থাকা রাজনীতিকরাও বুঝে গিয়েছেন।

রবিবার ঝাড়গ্রামে সভা করতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখান থেকে ফেরার পথে ঝালমুড়ি খান বিক্রমের দোকানে। নিজেই সমাজমাধ্যমে সেই ছবি পোস্ট করেছেন তিনি। সেই ছবি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তে ভাইরাল বিক্রম। ঝাড়গ্রাম শহরেই বিক্রমের ঝালমুড়ির দোকান। ঝাড়গ্রাম শহরে স্টেশনপাড়ায় বিক্রমের বাড়ি। তিনি জানিয়েছেন, ১২ বছর ধরে ঝালমুড়ি, ছোলা ভাজা, বাদাম ভাজা, চাল ভাজা বিক্রি করেন তিনি। প্রথমে ঠেলা গাড়ি নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও পরে শহরের কলেজ মোড়ে একটি ছোট্ট গুমটি ঘর ভাড়া নিয়ে ঝালমুড়ির দোকান করেন।

রাস্তা সম্প্রসারণের সময়ে রাস্তার পাশে থাকা সমস্ত দোকান ভাঙা পড়লে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর ঝালমুড়ির দোকান। পরে ঝাড়গ্রামের এক জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফেরার সময়ে পুনর্বাসনের আবেদন জানান দোকানদাররা। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে অন্যান্য দোকানদারের পাশাপাশি ভাড়া দোকানের পরিবর্তে রাস্তার পাশেই নিজের স্থায়ী দোকান পান বিক্রম। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দোকান করার জন্য জায়গার পাশে দোকান দেওয়া হয়। মোট ৫৪ জন পান দোকান। তারই মধ্যে রয়েছেন বিক্রমও।
বিক্রম বলেন, ‘আমার দোকানে মোদীজি আসার ১৫ মিনিট আগে থেকেই তাঁর সিকিউরিটি এখানে ঘোরাফেরা করছিলেন। তবে আমার দোকানে আসবেন, আমি বুঝতে পারিনি। আমাকে এসে যখন জিজ্ঞাসা করলেন ঝালমুড়ি আছে কি না, আমি যে কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। ১০ টাকার মুড়ি কিনলেন তিনি। আমি টাকা নিতে চাইনি। তিনি জোর করে দিলেন।’

সদ্য সদ্য মোদী মুড়ি খেয়ে যাওয়ার পরে লোকজন এখন বিক্রমের দোকান দেখতে আসছেন, তাঁকে দেখতে আসছেন। যাঁরা সকাল সন্ধে তাঁর দোকানের সামনে আড্ডা মারেন, তাঁরাও ঘুরে ঘুরে দেখছেন, মুখে হাসি। এমনকী এলাকার বিজেপি নেতা কর্মীরাও বিক্রমের দোকানে ভিড় করেছেন আজ।
চপ-মুড়ি-চা-এর এই ভোট যুদ্ধের ময়দানে মোদীর এই ‘মুড়ি-কূটনীতি’ শেষ পর্যন্ত ইভিএমে কতটুকু মশলা যোগ করবে, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত ১০ টাকার ঝালমুড়িতেই কুপোকাত বঙ্গ রাজনীতি।



