

বনগাঁ : পিঠেপুলি হোক বা পায়েস কিংবা মিষ্টি— নলেন গুড় ছাড়া শীত অসম্পূর্ণ। টাটকা খেজুরের রস সংগ্রহ করে ছেঁকে, জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় এক উৎকৃষ্ট, উপাদেয় খাবার। নলেন গুড়। শুকনো হাতে গড়া রুটিও যেন অমৃত হয়ে ওঠে একটু গুড়ের ছোঁয়ায়।

শীত এলেই সীমান্ত শহর বনগাঁর হাট-বাজার ও মিষ্টির দোকানে নলেন গুড়ের ঘ্রাণে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক। রসগোল্লা, কাঁচাগোল্লা, দই ও মালপোয়ার স্বাদে মিশে যায় বনগাঁর লোকজ ঐতিহ্য আর শীতের মিষ্টি উষ্ণতা।

গ্রামের খেজুর গাছ থেকে নামানো টাটকা রস দিয়ে তৈরি নলেন গুড়ের ধোঁয়াটে ঘ্রাণ ও গভীর মিষ্টতা সন্দেশ, পিঠে ও পায়েসে আলাদা মাত্রা যোগ করে। খেজুর গুড় বিক্রেতাদের কথায় , “খেজুর গুড় এমন একটি সুস্বাদু তরল যা যেকোনও মিষ্টির সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে। আমরা গর্বিত সবচেয়ে উৎকৃষ্ট গুড় তৈরি করতে পেরে।” এই আত্মবিশ্বাসই বনগাঁর গুড়ের স্বাদকে আলাদা পরিচয় দেয়। তবে শুধু স্বাদে নয়, পু্ষ্টিগুণেও কম যায় না এটি। সাদা চিনির চেয়ে গুড়ের পুষ্টিগুণ বেশি। সেই মাত্রা নির্ভর করে কোন প্রক্রিয়ায় বা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে গুড় তৈরি হচ্ছে, তার উপরে। দেখুন ভিডিও

বনগাঁর কাঁচাগোল্লা তার সরলতা ও টাটকা স্বাদের জন্য সুপরিচিত। অতিরিক্ত রস ছাড়াই নরম ছানার স্বচ্ছ স্বাদই এই মিষ্টির আসল বৈশিষ্ট্য। মুখে দিলেই গলে যাওয়া টেক্সচার গ্রামবাংলার খাঁটি দুধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। ঐতিহ্য আর সহজ স্বাদের কারণে আজও বনগাঁর কাঁচাগোল্লা জনপ্রিয়। তার উপরে নলেনগুড় শীতের রসনাতৃপ্তিতে একাধিপত্য।

শীতকালে বনগাঁর বোলদা, এঁরোপোতা ,সুখপুকুর সহ বিভিন্ন গ্রাম ও শহরের মিষ্টির দোকানে নলেন গুড়ের দই মানেই আলাদা আকর্ষণ। মাটির হাঁড়িতে বসান এই দইয়ের হালকা টকভাবের সঙ্গে মিশে যায় নলেন গুড়ের ধোঁয়াটে সুবাস। স্বাদে ঘন, মোলায়েম আর স্বাভাবিকভাবে মিষ্টি এই দই শীতের দুপুরে এক অনন্য তৃপ্তি দেয়।

বনগাঁর শীতের সন্ধ্যা মানেই নলেন গুড়ের মালপোয়ার লোভনীয় সুবাস। গুড়ের মিষ্টতা আর ভাজার গন্ধে তৈরি এই মালপোয়া বাইরে হালকা খাস্তা, ভেতরে নরম। প্রতিটি কামড়ে নলেন গুড়ের উষ্ণতা শীতের আমেজকে আরও গভীর করে তোলে। উৎসব ও পারিবারিক আড্ডায় এই মালপোয়া বনগাঁর শীতকালীন মিষ্টির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সব মিলিয়ে বনগাঁর শীত মানেই নলেন গুড়কে ঘিরে এক মিষ্টি সংস্কৃতি। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে মিষ্টি তৈরির শেষ ধাপ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জড়িয়ে আছে পরিশ্রম, ধৈর্য আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোকজ ঐতিহ্য। এই মিষ্টিগুলো শুধু স্বাদের নয়, বনগাঁর গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির গল্পও বলে। নলেন গুড়ের ঘ্রাণে তাই সীমান্ত শহরে শীত আরও উষ্ণ ও আপন হয়ে ওঠে।



