


‘বাড়ি ফিরে এসো সন্ধে নামার আগে’। ‘বিদায় ব্যোমকেশ’ ছবিতে ঈশান মিত্রের গাওয়া এই গান ছিল প্রিয় মানুষের ঘরমুখো হওয়ার আকুতি। কিন্তু শনিবার তপ্ত রোদে সেই গানের কলিই হয়ে উঠল তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে
সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। বাংলায় এখনও অনেকের স্মৃতিতে তাজা আরজি কর কাণ্ডের ঘটনা। সেই পর্ব অশরীরী আত্মার মতো এখনও সরকার বিরোধিতায় হাওয়া দিয়ে চলেছে। তা আন্দাজ করে বাংলায় নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী এদিন এমন ভাবে বিঁধেছেন শাসকদলকে যাতে সকলের বোধগম্য হয়। মরমে পৌঁছয়। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “বাংলায় মেয়েদের আজ বলতে হয়, ‘বাড়ি ফিরে এসো সন্ধে নামার আগে’। আর এই অন্ধকার ঘোচাতেই ভরসা রাখতে হবে ‘মোদী কি গ্যারান্টি’র উপর।

সব ঠিক থাকলে আগামী সোমবার বিধানসভা ভোট ঘোষণা হয়ে যাবে। তার আগে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবার ব্রিগেডে সভা করেছেন তিনি। আর সেখান থেকে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই তৃণমূল কংগ্রেসকে নিশানা করেন তিনি।
ব্রিগেডে তাঁর বক্তব্যে গ্যাস-সঙ্কট এবং এসআইআরের প্রসঙ্গ খুব একটা শোনা যায়নি। কিন্তু শাসক দলকে বিঁধতে এতটুকু সময় নষ্ট করেননি নরেন্দ্র মোদী। তার আগে রাজ্য বিজেপির নেতারা একে একে তুলোধনা করেন রাজ্যের শাসক শিবিরকে।

ব্রিগেড থেকে তৃণমূলকে মোদীর দশ বাণ :
নির্মম সরকারের অন্ত হবেই –
মহা জঙ্গলরাজ শেষ হবে, বাংলার নির্মম সরকারের অন্ত হবেই, বলেন মোদী।
চুন চুনকে হিসাব হোগা –
যারা অত্যাচার করবে, তাদের ছাড়া হবে না। বেছে বেছে হিসেব হবে।

কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে –
তৃণমূল সরকারের যাওয়াটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করেছেন।
দুসরে তরফ সবকা হিসাব –
বিজেপি ক্ষমতায় অপরাধীদের জায়গা হবে জেল। ‘এক তরফ সবকা সাথ, দুসরে তরফ সবকা হিসাব’

বাঙালিকে শেষ করার চেষ্টা –
বাংলার জনবিন্যাস বদলে গেছে আর বাঙালি হিন্দুদের সংখ্যালঘু করে দেওয়া হচ্ছে। ওরা হিন্দুদের নিজের ভোট ব্যাঙ্ক মনে করে না।
মানুষকে ঘর পেতে দিচ্ছে না তৃণমূল –
সারা দেশ পিএম আবাস যোজনার কথা শুনেছে। কিন্তু এখানে এই প্রকল্পের নাম বদল করে উপভোক্তাদের নামের তালিকাই বদলে দেওয়া হয়েছে।
প্রকাশ্যে চাকরি বিক্রি করেছে –
এখানকার যুবক-যুবতী ডিগ্রি পাচ্ছেন না, চাকরিও পাচ্ছেন না। তাঁদের ভিনরাজ্যে চলে যেতে হচ্ছে। তৃণমূল সরকার প্রকাশ্যে চাকরি বিক্রি করেছে।

কাটমানি না পেলে প্রকল্প চালু হতে দেয় না –
তৃণমূল সরকারের শুধু টাকা চাই। তাই বাংলায় উন্নয়নের কাজ থমকে রয়েছে।
একে একে পকেট ভরেছে –
কংগ্রেস, তারপর বাম এবং এখন তৃণমূল সরকার, এরা একে একে এসে নিজেদের পকেট ভরেছে। রাজ্যের উন্নয়নের কাজ তাই পড়েই থেকেছে।
বাড়ি ফিরে এসো সন্ধে নামার আগে –
সন্দেশখালি থেকে আরজি কর কাণ্ড, মানুষ ভোলেনি। তাই মেয়েদের বলতে হয়, বাড়ি ফিরে এসো সন্ধে নামার আগে।

এদিন ব্রিগেডে মোদীর ভাষণ ছিল অদ্ভুত মেলানো মেশানো। তৃণমূলকে আক্রমণের শুরুটা হয়েছিল বাংলা ছবির গান দিয়ে, আর শেষটা রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গানে।
তৃণমূলের ‘মা-মাটি-মানুষ’ স্লোগানকে কটাক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বামেদের হঠিয়ে অনেক আশায় বাংলার মানুষ তৃণমূলকে এনেছিলেন। কিন্তু আজ পরিস্থিতি এমন যে বাংলার মা নিঃস্ব, মাটি লুণ্ঠিত আর মানুষ রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে।”
ব্রিগেডের মঞ্চে দাঁড়িয়ে, রাজ্যের মানুষকে এদিন ফের সন্দেশখালি থেকে আরজি করের মতো ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। অভিযোগ করেন, অপরাধীদের আড়াল করাই এ রাজ্যের সরকারের কাছে সহজাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর কথায়, “গুন্ডা-মাফিয়াদের নিজের দলে টেনে নিয়েছে তৃণমূল। অপরাধীদের বাঁচানোর পূর্ণ চেষ্টা করা হয় এখানে।”

প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ২০২৬-এর এই লড়াই কেবল গদি দখলের নয়, বরং ‘বাংলার আত্মাকে বাঁচানোর’ লড়াই। তিনি বলেন, “কেউ কেউ ভয় দেখাবেন, কেউ বলবেন বদল সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলার মানুষ যখন ঠিক করে নেন, তখন ইতিহাস বদলে যায়’।
এবারের ভোটকে কাটমানি আর ভয় থেকে মুক্তির ভোট বলে অভিহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। ব্রিগেড চলোর এই জনসমুদ্র দেখে তিনি যে আসন্ন পরিবর্তনের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন, সে কথা জানাতেও ভোলেননি মোদী। তাঁর কথায়, তৃণমূল সরকারের যাওয়ার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। বিজেপি সরকার তৈরি হওয়ার পরে সকলের উন্নয়ন হবে। অন্য দিকে সব কিছুর হিসাব হবে। তৃণমূলের গুন্ডারা যারা আপনাদের ভয় দেখায়, তাদের খারাপ দিন আসছে। আইনের শাসন হবে। অপরাধীদের একটাই জায়গা জেল… জেল।’’

আর এই ভয়ের কাছেই সাধারণ মানুষকে মাথা নত না করার বার্তা দেন মোদী। রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়’। বাংলার মানুষকে আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবর্তনের এই সংকল্প যেন প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যায়। তাহলেই পশ্চিমবঙ্গের জনগণের জয় নিশ্চিত হবে।
এদিকে, ব্রিগেডের সভা থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তাপস রায় বললেন, হুমায়ুন কবীর এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই। দু’জনের কথার মধ্যে কোনও অমিল নেই বলেই দাবি তাঁর। তাপসের দাবি, হুমায়ুন এবং মমতা দু’জনেই হিন্দুদের অসম্মান করেন। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি তাঁরাই করছেন। সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করছেন মমতা, অভিযোগ তাঁর।

ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তৃণমূলকে জঞ্জালের সঙ্গে তুলনা করলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূল নামক জঞ্জালকে বিসর্জন দিতে হবে। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী কৃষকসম্মান নিধিতে যে ১৩ হাজার কোটি টাকা দিয়েছেন তা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখতে পাননি।

অন্যদিকে, আলু চাষিদের বঞ্চিত করছেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গে জমি পড়ে আছে, কিন্তু চাকরি-কারখানা-শিল্প হচ্ছে না। আসলে বাংলার ভাবমূর্তি এমন করেছে তৃণমূল সরকার যে শিল্পপতিরা ভয় আসেন না। বাংলা ছাড়া অন্য রাজ্যে কম সময়ের মধ্যেই শিল্পের কাজ শুরু হয়ে যায়, বলেন দিলীপ ঘোষ।

মিঠুন চক্রবর্তী আবার বোঝাতে চান, বাংলায় একটা অরাজক সরকার চলছে। যে সরকারের আমলে বাংলায় কোনও উন্নতি তো হয়নি, গোটা বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড উনি ভেঙে দেওয়া হয়েছে স্রেফ নিজের রাজনীতির জন্য। তৃণমূল টিকে রয়েছে পুলিশের ভরসায়। তাঁর হুঁশিয়ারি – পুলিশ একটু নিরপেক্ষ থাকুক, ৩০ সেকেন্ডে তৃণমূলের খেলা শেষ করে দেব।

সবমিলিয়ে শনিবারের বিজেপির ব্রিগেড রাজ্যের ভোট ঘোষণার আগে রাজনৈতিক পারদ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। শনিবার ব্রিগেডে ছবিগুলি তুলেছেন শুভাশিস রায় ।




