দেশের সময় ওয়েবডেস্কঃ জল্পনাই সত্যি হল। তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক শেষমেশ ছিন্ন হয়ে গেল। মন্ত্রী, বিধায়ক পদের পর এবার তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়লেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ইস্তফাপত্র পাঠালেন রাজীব। এই ঘটনাপ্রবাহে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজেপি-তে যোগদানের সম্ভাবনা আরও জোরালো হল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বিধায়ক পদে ইস্তফা দেওয়ার পরই রাজীব জানিয়েছিলেন, তিনি শনিবার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। এদিকে, আজই দু’দিনের রাজ্য সফরে আসছেন অমিত শাহ। প্রাক্তন বিজেপি সর্বভারতীয় সভাপতির সভামঞ্চেই রাজীবের বিজেপি-তে যোগদানের সম্ভাবনা জোরদার হল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর রাজীব বলেছিলেন, ‘আমি আজ বিধায়ক পদে ইস্তফা দিয়েছি। বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে ইস্তফাপত্র পেশ করেছি। ওঁকে আমি আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি। বাংলার মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। দলনেত্রীর কাছেও কৃতজ্ঞ, কারণ উনি আমাকে বিধায়ক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। ডোমজুড়ের মানুষের পাশে থাকব। মানুষের স্বার্থেই রাজনীতি করব’।

বিজেপি-তে যোগ দিচ্ছেন? রাজীবের জবাব ছিল, ‘এখনও দলেই আছি। মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। আমার সিদ্ধান্ত আগামীকাল জানাব। আমি মনে করি, মানুষের জন্য কাজ করতে গেলে, একটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে থাকতে হবে’। রাজীবের এ হেন মন্তব্য অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

মন্ত্রী পদে ইস্তফা দেওয়ার পর কেঁদে ফেলেছিলেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়।রাজভবন থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে ইস্তফা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন রাজীব। তিনি বলছিলেন, ‘খুব খারাপ লাগছে। আমার হৃদয় ভেঙে গিয়েছে। খুবই বেদনাগ্রস্ত হয়েছি। কোনও দিন ভাবিনি এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কাউকে আঘাত দিয়ে থাকলে মার্জনা করবেন। যতদিন বেঁচে থাকব আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। উনি আমায় কাজের সুযোগ দিয়েছেন। নতমস্তকে ওঁকে প্রণাম জানাচ্ছি। হয়তো এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতাম না। কিন্তু গত এক মাস মানসিক দ্বন্দ্ব হয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিলাম’।

রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রবীর ঘোষালের বিজেপি-তে যোগদানের জল্পনা বাড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি বলেছেন, ‘৩০ বা ৩১ তারিখ রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় কী করবে জানি না। রাজীব যদি চলে যান, তাহলে মুখ্যমন্ত্রী কি ডোমজুড়কে সেজো বোন বলবেন? উত্তরপাড়ার বিধায়কও বেসুরো, প্রবীরদা চলে গেলে কি উনি উত্তরপাড়াকে ছোট বোন বলবেন?’। অন্যদিকে, শাহী সফরে অনেক চমক থাকছে বলে ইঙ্গিতবাহী মন্তব্য করেছেন দিলীপ ঘোষ। এই প্রেক্ষাপটে রাজীবের তৃণমূল ত্যাগ ও বিজেপি-তে যোগদানের জল্পনায় নয়া মোড় নিল ভোটমুখী বাংলা।

বৈঠকে শুভেন্দু, রাজীব: পরশু রবিবার হাওড়ায় ডুমুরজলা স্টেডিয়ামে সভা করবেন অমিত শাহ। তার আগে জেলায় শাসক দলের সংগঠন যেন ভেঙে তছনছ করে দিতে চাইছে বিজেপি।


ইতিমধ্যেই হাওড়ার দুই মন্ত্রী লক্ষ্মীরতন শুক্ল ও রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। শুক্রবার তৃণমূলের বিধায়ক পদ ও দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকেও ইস্তফা দিয়েছেন রাজীব। তার এক ঘন্টার মধ্যেই হাওড়ার যুব তৃণমূল সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন অনুপম ঘোষ।

তার পরই বিজেপির এক রাজ্য নেতা এদিন দাবি করেছেন, “প্রতি ঘন্টায় ওই দল থেকে এক জন করে ইস্তফা দেবে এবার। দেখুন না কী হয়!”
তৃণমূল ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে থেকেই শুভেন্দু অধিকারী ও রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলোচনা চলছিল। দুজনে তালমিল করেই চলছিলেন। শুক্রবার রাজীব ইস্তফা দেওয়ার পর শুভেন্দুর সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়। এদিন বিকেলে তাঁদের আলোচনাতেও বসার কথা রয়েছে।


এই দুই নেতার ঘনিষ্ঠ সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, যাঁরা তৃণমূল ছাড়ছেন তাঁরা সবাই যে পরশু বিজেপিতে যোগ দেবেন তা নয়। কিছু নেতা সেদিন যোগ দেবেন। বাকিরা ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়ায় হাওড়ায় একাধিক সভা তথা যোগদান মেলায় বিজেপিতে সামিল হবেন।
হাওড়া তৃণমূলের অরূপ রায় ও রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে বনিবনার অভাব বহুদিন ধরে সুবিদিত ছিল। রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর অরূপ রায়কে রাজনৈতিক ভাবে পর্যুদস্ত করার যে লক্ষ্য নিয়ে চলবেন সে ব্যাপারে অনেকেরই কোনও সংশয় নেই। অরূপ রায়ের অতি ঘনিষ্ঠ এক নেতা ইতিমধ্যেই শিবির বদল করে রাজীবের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। তলে তলে আরও অনেকে যোগাযোগ রেখে চলছেন বলেই রাজীব ঘনিষ্ঠরা দাবি করছেন।

এ সব ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া তৃণমূল মুখপাত্র ও মন্ত্রী ব্রাত্য বসু শুক্রবারও বলেছেন, এ সব যাওয়া আসায় কিছু এসে যায় না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে উন্নয়নের কাজ করেছেন, তার পর মানুষ তাঁকে ছেড়ে কখনও যাবে না। তৃণমূলের লক্ষ, কোটি সমর্থক, কর্মী রয়েছেন। তাঁরাই দলের শক্তি।

তবে পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, শেষমেশ ভোট ফলাফলে কী হবে তা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু এখন আপাত দর্শনে বলা যায়, হাওড়ায় তৃণমূল খুবই সংকটে পড়ে গিয়েছে। কারণ, ভোটের মুখে জেলা সভাপতি দল ছেড়েছেন। দুই মন্ত্রী ও যুব তৃণমূল সভাপতি দল ছেড়েছেন। হাওড়ার প্রাক্তন মেয়র রথীন চক্রবর্তী দল ছাড়ছেন। বালির বিধায়ককে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছে দল। আর এ সবের মধ্যে যে নেতাটির উপর একমাত্র ভরসা টিকিয়ে রাখতে হয়েছে, তিনি নিজে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

এগারো সালের বিধানসভা ভোটের পর কলকাতা থেকে সচিবালয় সরিয়ে হাওড়ায় নিয়ে এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ দশ বছর পর সেই হাওড়াতেই তৃণমূলের পায়ের তলায় মাটি আন্দোলিত। কে কতক্ষণ দলে রয়েছেন, নিশ্চয়তা নেই। এটা খুব ভাল সংকেত কি!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here