তিন হাজার ঢাকের তালে ‘উমা আগমনী’, দুর্গোৎসবের সূচনা, গিনেস বুকে নজির কলকাতার
deshersamay

যে মাঠে ব্যাট-বলের লড়াই দেখতে অভ্যস্ত কলকাতা, সেখানে এবার দুর্গোৎসবের বাদ্যি। তিন হাজার ঢাকি, এক হাজারের বেশি নৃত্যশিল্পী, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর আকাশজুড়ে আলোর খেলায় শনিবার অন্য রূপ নিল ইডেন গার্ডেন্স। রাজ্য সরকারের ‘উমা আগমনী’ অনুষ্ঠানে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, তিন হাজার ঢাকির সমবেত অংশগ্রহণে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতিও পেল কলকাতা।

তবে আয়োজনের ছবি শুধু ইডেনের গ্যালারিতে আটকে থাকেনি। প্রিন্সেপ ঘাট থেকে ডালহৌসি, রেড রোড থেকে কুমোরটুলি ঘাট—পুজোর আবহে শহরের পরিচিত জায়গাগুলিকে একসঙ্গে সাজিয়ে তোলার সরকারি উদ্যোগ এবার আলাদা নজর কেড়েছে। মণ্ডপের বাইরেও কলকাতাকে উৎসবের অংশ করে তোলার এই ভাবনা অনেকেরই মন ছুঁয়েছে।
শনিবার বিকেল ৫টা নাগাদ ইডেনে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। পরনে হলুদ হাফহাতা পাঞ্জাবি, সুতির ধুতি, পায়ে চপ্পল। তাঁকে স্বাগত জানায় সমবেত শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি। মাঠের মাঝে রাখা ছিল দুটি বিশাল শঙ্খের প্রতিরূপ। আলপনায় লেখা ‘দুর্গাপুজো ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গ’।

তার আগে রেড রোডে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে তৈরি থিম শিবির ঘুরে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে হেঁটে ইডেনে আসেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, স্বরাষ্ট্রসচিব সংঘমিত্রা ঘোষ, পূর্তমন্ত্রী অজয় পোদ্দার, পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত-সহ বিশিষ্টরা।

অনুষ্ঠানের বড় আকর্ষণ ছিল তিন হাজার ঢাকির সমবেত বাদ্যি। তাঁদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় যোগ দেন এক হাজারের বেশি নৃত্যশিল্পী। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন অভিনেত্রী সৌরসেনী মৈত্র। গিনেসের স্বীকৃতির কথা মঞ্চ থেকে জানান তিনি। পরে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে শংসাপত্র তুলে দেন মুখ্যসচিব।
সন্ধ্যা নামতেই দর্শকদের চোখ উঠে যায় আকাশে। ড্রোনের আলোকবিন্যাসে ফুটে ওঠে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার রূপ। মঞ্চ থেকে মাঠে নেমে সেই প্রদর্শনী দেখেন মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল আরএন রবি এবং অন্য অতিথিরা। তার পরে আতশবাজি।
সঙ্গীতেও ছিল উৎসবের নানা রং। শান্তনু মৈত্রের পরিচালনায় ‘সাউন্ডস অফ দুর্গাপুজো’ পরিবেশনায় কণ্ঠ দেন কৌশিকী চক্রবর্তী ও শান। অনুষ্ঠানে অংশ নেন দোহার ব্যান্ডের শিল্পীরাও।

কলকাতার দুর্গাপুজোর আকর্ষণ বরাবরই তার মণ্ডপ, প্রতিমা আর পাড়ার উৎসব। এবার সেই চেনা ছবির সঙ্গে যোগ হয়েছে শহরকে সাজিয়ে তোলার একটি বিস্তৃত সরকারি পরিকল্পনা। প্রিন্সেপ ঘাট, ডালহৌসি, রেড রোড, কুমোরটুলি ঘাটের মতো জায়গাগুলিকে একই উৎসবের আবহে বেঁধে দেওয়ার ভাবনা এই আয়োজনকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
শুধু কোনও একটি মঞ্চ বা অনুষ্ঠানস্থল সাজানো নয়, শহরের ঐতিহ্যবাহী এলাকা থেকে নদীর ঘাট পর্যন্ত পুজোর অনুভূতি ছড়িয়ে দেওয়াই এই উদ্যোগের বিশেষত্ব। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কলকাতাকে এমন সমন্বিত পুজোর সাজে তুলে ধরার ভাবনা এবার প্রথম বলেই আয়োজনে জোর দেওয়া হয়েছে। ইডেনের অনুষ্ঠান তার কেন্দ্রবিন্দু হলেও উৎসবের ক্যানভাস ছিল আরও বড়।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, আয়োজনকে ইডেনের প্রায় ৪০ হাজার আমন্ত্রিত দর্শকের মধ্যে সীমিত রাখা হয়নি। সংস্কৃতি ও পর্যটন দফতরের উদ্যোগে মহাষষ্ঠীর আগে পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান হবে।

দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি, বিষ্ণুপুর, কোচবিহার, মালদহ, বহরমপুর এবং দিঘার সমুদ্রতটে বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজনের কথা ঘোষণা করেন তিনি। নিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা ও আসনসংখ্যার কথা মাথায় রেখেই ইডেনে দর্শকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলে জানান শুভেন্দু।
উৎসবের মঞ্চ থেকে পুজো কমিটিগুলির জন্য একাধিক ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালে অনুমোদিত দুর্গাপুজোর সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার। এবার আরও ১২,৪০০টি নতুন পুজোর অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
পুজোর অনুমতি পেতে আগে আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন হত বলে মন্তব্য করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, এবার তেমন ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁর জানা নেই।
ইচ্ছুক ও আবেদনকারী পুজো আয়োজকদের এক লক্ষ টাকা করে সাহায্য রবিবার থেকে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। বড় বাজেটের পুজোগুলিকে স্বেচ্ছায় অনুদান না নেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, কলকাতার ২০০-র বেশি পুজো কমিটি জানিয়েছে, তাদের বরাদ্দ অর্থ গ্রামীণ ও মহিলা পরিচালিত পুজোগুলিকে দেওয়া হোক। পুজোর আলোকসজ্জায় ব্যবহৃত বিদ্যুতের খরচ এবং দমকলের অনুমতির ফি মকুবের কথাও জানান শুভেন্দু।

আগের সরকারের কার্নিভাল হত পুজোর পরে। এবার উৎসবের সূচনাতেই ইডেনকে বেছে নিয়েছে রাজ্য। ঢাক, নাচ, গান আর আকাশের আলোকবিন্যাসের সঙ্গে শহরজুড়ে সাজের ভাবনা—এই মিলিত আয়োজনেই শনিবার দুর্গোৎসবের নতুন ছবি দেখল কলকাতা।
