পাখির চোখ ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন। সেই লক্ষ্যে তৃণমূলের ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির ঠিক আগে বঙ্গ সফরে নরেন্দ্র মোদী। পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরে জনসভা করলেন প্রধানমন্ত্রী।
‘জয় শ্রীরাম’ নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এ দিন দুর্গাপুরের জনসভায় বক্তৃতা শুরু করলেন সম্পূর্ণ বাংলায়, ‘‘বড়দের প্রণাম, ছোটদের ভালবাসা, জয় মা কালী, জয় মা দুর্গা’’ উচ্চারণ করে।
এর পর রাজ্যের দুর্নীতি, অনুন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও তথাকথিত ‘গুন্ডা ট্যাক্স’ প্রসঙ্গে রাজ্যের তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন মোদী। প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, “বাংলার সংস্কৃতির এত ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও, তৃণমূল সরকারের শাসনে দুর্নীতিই দিশা দেখাচ্ছে। এই বাংলা তো এমন ছিল না। বাংলার যুবসমাজ শান্তি, কাজ, সুশাসন চায়।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এক সময় বাংলা দেশের বাণিজ্যে দিশা দেখাত। অথচ আজ এখানকার ছেলেমেয়েদের ছোট ছোট চাকরির জন্যও বাইরে যেতে হচ্ছে। তৃণমূল সরকার যত দিন থাকবে, তত দিন শিল্প আসবে না, কর্মসংস্থান হবে না।”
‘মা-মাটি-মানুষের সরকার মা-বেটির সঙ্গে যা করছে তা বলার নয়। যে রাজ্য থেকে ভারতের প্রথম মহিলা ডাক্তারি পাশ করেছেন, সেখানেই এক মহিলা চিকিৎসকের কী পরিণতি হয়েছে তা সবাই দেখেছে। আরজি কর কাণ্ডে সবাই দেখেছে কী ভাবে তৃণমূল অপরাধীদের আড়াল করেছে। সেই কাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই আরও এক কলেজে আরও এক মেয়ের সঙ্গে একই কাণ্ড। সেখানেও মূল অভিযুক্তর সঙ্গে তৃণমূলেরই যোগ বেরিয়েছে।’ শাসকদলকে কটাক্ষ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর।
তিনি জানান, দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট-সহ একাধিক শিল্প ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো হবে। বাংলায় স্লোগান তোলেন, “তৃণমূল হঠাও, বাংলা বাঁচাও”। মোদীর বার্তা, “পশ্চিমবঙ্গকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে এখানে নতুন বিনিয়োগ আসে, নতুন উদ্যোগ তৈরি হয়। বাংলার যুবকদের ভবিষ্যতের জন্য এখনই তৃণমূলকে সরানো জরুরি। তাঁর দাবি, “বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলা দেশের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ রাজ্যে পরিণত হবে।”
শুধু শিল্প নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও রাজ্যের তীব্র অবনতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মোদী। তাঁর অভিযোগ, ‘‘তৃণমূলের জমানায় প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা—সব রসাতলে যাচ্ছে।’’
রাজ্য থেকে তৃণমূলকে সরানোই একমাত্র বিকল্প বলে দাবি করে মোদী বলেন, ‘‘বাঙালির ভবিষ্যৎ, বাংলার উন্নয়নের জন্য এই সরকারকে বিদায় জানাতেই হবে।’’
মুর্শিদাবাদের সাম্প্রতিক অশান্তি নিয়েও এদিনের সভা থেকে ফের রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পুলিশ ও প্রশাসনকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “সেখানে পুলিশ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। বাংলায় আজ আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। তৃণমূলের গুন্ডাগিরির জন্য বিনিয়োগকারীরা ভয় পান। সিন্ডিকেটরাজ, কাটমানি—এই সবই বাংলাকে পিছিয়ে দিচ্ছে।”
এদিনের সভা থেকে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও কসবাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে মোদী বলেন, “বাংলার হাসপাতালও মেয়েদের জন্য সুরক্ষিত নয়। সেই সময়ও দেখা গিয়েছে কীভাবে তৃণমূল অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। এরপর কলেজেও একটি মেয়ের উপর চরম অত্যাচার চলে। তাতেও দেখা গিয়েছে তৃণমূলের লোকজন জড়িত।”
প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজ্যে অপরাধ ও নারী-নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে এবং প্রশাসন রাজনৈতিক স্বার্থে নীরব দর্শকের ভূমিকা নিচ্ছে।
এর পাশাপাশি অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গও টেনে আনেন মোদী। কড়া ভাষায় বলেন, “তৃণমূল সরাসরি অনুপ্রবেশকারীদের হয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। কান খুলে শুনে রাখুন, সংবিধান অনুযায়ী অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।”
৩৪ মিনিটের ভাষণে এবারে একাধিকবার ‘মোদী গ্যারান্টি’র কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ছাব্বিশের ভোটে বাংলায় পরিবর্তন আনতেই হবে। তবেই বাংলার বিকাশ সম্ভব।”
দুর্গাপুরে মোদী: বাংলায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের বার্তা, সাত প্রকল্পের শিলান্যাস-উদ্বোধন
ফের বাংলার মাটি থেকে উন্নয়নের বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী । বৃহস্পতিবার দুর্গাপুরের সভা থেকে তিনি প্রায় ৫৪০০ কোটি টাকার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো এবং জ্বালানি সংক্রান্ত প্রকল্পর উদ্বোধন ও শিলান্যাস করলেন।
মোদীর দাবি, এই প্রকল্পগুলি শুধু কর্মসংস্থানই নয়, শিল্পোন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
সভামঞ্চ থেকে মোদী বলেন, “ভারতের বিকাশে দুর্গাপুরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দুর্গাপুর ভারতের শ্রমশক্তির বড় কেন্দ্র। এই প্রকল্পগুলি বাংলার পরিকাঠামো শক্তিশালী করবে, বিনিয়োগ টানবে, আর যুব সমাজের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। পূর্ব ভারতের উন্নয়নে এই ধরনের প্রকল্প অপরিহার্য।”
তিনি আরও জানান, “গত দশ বছরে গ্যাস সংযোগে যে কাজ হয়েছে, তা অভাবনীয়। আজ ২৫-৩০ লক্ষ ঘরে পাইপলাইনে গ্যাস পৌঁছেছে। কলকাতা মেট্রোর সম্প্রসারণ চলছে, রেল পরিকাঠামোও দ্রুত উন্নত হচ্ছে।”
মোদীর ঘোষণা অনুযায়ী মূল প্রকল্পগুলি:
সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন (সিডিজি) – ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেডের এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় প্রায় ১৯৫০ কোটি টাকার গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
দুর্গাপুর-কলকাতা গ্যাস পাইপলাইন – ১৩২ কিমি দীর্ঘ এই পাইপলাইন ‘উরজা গঙ্গা’ প্রকল্পের অন্তর্গত, যা পূর্ব ভারতের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
পরিবেশবান্ধব তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প – দুর্গাপুর ইস্পাত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রঘুনাথপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি বসাতে খরচ হবে প্রায় ১৪৫৭ কোটি টাকা।
রেল প্রকল্প – পুরুলিয়া থেকে কলকাতা পর্যন্ত ৩৬ কিমি রেললাইন ডাবলিং-এর জন্য ৩৯০ কোটি টাকার বাজেট।
মোদীর সভাকে কেন্দ্র করে দুপুর থেকেই দুর্গাপুরের সভাস্থলে জনজোয়ার। বিহারের সভা সেরে অন্ডাল বিমানবন্দর থেকে সড়ক পথে বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে সভাস্থলে পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী। প্রশাসনিক সভার পর পাশের ময়দানে রাজনৈতিক জনসভা করেন ।
সভামঞ্চে প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরীয় পরিয়ে, দুর্গা ও কালীমূর্তি, বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা ঘোড়া এবং গণেশমূর্তি উপহার দিয়ে স্বাগত জানান শুভেন্দু অধিকারী ও রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারও।
এদিন দুর্গাপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভা ঘিরে সকাল থেকেই সাজো সাজো রব। সুকান্ত মজুমদাররা স্থানীয়দের সভায় উপস্থিত থাকার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। এই অবধি সব ঠিকই ছিল, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল সভার আমন্ত্রণ পত্রে বিজেপির চিরাচারিত ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান ছিল না। বদলে ‘ভারত মাতা কি জয়’-এর নীচে লেখা হয়েছিল ‘জয় মা দুর্গা, জয় মা কালী’ স্লোগান। তখন থেকেই খানিকটা আন্দাজ করা গিয়েছিল, বঙ্গ বিজেপি পুরোপুরি শুক্রবারের সভায় বঙ্গীয়করণের চেষ্টায় রয়েছে। সেই বিষয়টা আরও স্পষ্ট হল যখন খান ছয়েক দুর্গা উপহার পেলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
শমীক ভট্টাচার্য সভাপতি হওয়ার পরই এহেন পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। ‘অবাঙালি’র দল তকমা ঝেড়ে ফেলতে মরিয়া শমীক নিজের অভিষেক মঞ্চেই বড় করে মা কালীর ছবি সাঁটিয়ে দিয়েছিলেন। আজ যখন ঠিক ৫০ দিন পর দুর্গাপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভাষণ শুরু করলেন, তখনও জয় শ্রী রামের কোনও উচ্চবাচ্যই শোনা গেল না। বরং বেছে নিলেন ‘জয় মা কালী’, ‘জয় মা দুর্গা’ স্লোগান।
বাংলার রাজনৈতিক পরিসরে একাংশ বাঙালির মনে বিজেপি সম্পর্কে যে নেতিবাচক, উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও বাঙালি-বিরোধী ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে, তা ভাঙার চেষ্টায় নেমেছে বিজেপি। রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব পেয়েই শমীকেরও প্রচেষ্টা দলের সামগ্রিক ভাবমূর্তির সংস্কার ঘটানো।
রাজ্যের একাংশ মনে করেন, বিজেপির বিভিন্ন নেতৃত্ব বিশেষ করে দিলীপ ঘোষ বা শুভেন্দু অধিকারীদের প্রকাশ্যে আক্রমণাত্মক ভাষণ ওই নেতিবাচক ছাপকে আরও গভীর করেছে। ফলে রামনবমী উদ্যাপন বা সভা-সমাবেশে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান যতই উঠুক না কেন, অনেক বাঙালি নিজেদের তার সঙ্গে একাত্ম করতে পারছেন না। বিগত নির্বাচনের ফলাফলও সেই মনোভাবের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
ছাব্বিশেই বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে। রামনামে আর যা-ই হোক, তৃণমূল তাড়ানো মুশকিল বুঝেই দলকে বাঙালি সংস্কৃতি এবং ধর্মাচরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে পদ্মশিবির। সেকারণেই শুক্রবার মোদীর সভার আমন্ত্রণ পত্র থেকে শুরু করে উপহার, ভাষণ, সবটাই দুর্গা-কালীর নামে।



