‘আপনাদের অনুরোধে UCC-র বাইরে কুড়মি সমাজকে রেখেছি’, আর বঞ্চিত হবে না বাঁকুড়া- পুরুলিয়া: শুভেন্দু
deshersamay
পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী এলাকায় কুড়মালি এবং রাজবংশী ভাষায় কথা বলা মানুষের বাস। এই এলাকার মানুষের মন পেতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দু’টি ভাষাকে রাজ্যে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিয়েছিলেন। দীর্ঘ দিনের আন্দোলন, বহু চড়াই-উতরাই, বহু বন্ধ-বিক্ষোভের পথ পেরিয়ে সেই স্বীকৃতি মিলেছিল। কিন্তু কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে লড়াই এখন চলছে।
তৃণমূল সরকার কুড়মি তথা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে গোটা জঙ্গলমহলকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। পুরুলিয়া সফরে গিয়ে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। করম মহাসমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, কুড়মি আন্দোলনের জন্য সরকার তথা প্রশাসন যাঁদের বিরুদ্ধে যত মামলা করেছে, সব প্রত্যাহার করা হবে। পাশাপাশি কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করাবেন বলে ঘোষণা করলেন তিনি।
রবিবার পুরুলিয়ায় কুড়মিদের করম পরবে যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা অষ্টম তফসিলে কুড়মালি ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে কথা বলেছেন, তাকে আমরা সমর্থন করব। শুধু কুড়মালি নয়, রাজবংশী ভাষাকেও অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। দ্রুত সেই প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং দ্রুত শেষও হবে।’
গত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বিজেপি কুড়মি সম্প্রদায়ের জাতিসত্তার স্বীকৃতি ও কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি মেটানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। অনেকের মতে, সেই আশ্বাসে বিশ্বাস করে বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে সমর্থন জুগিয়েছে কুড়মি সমাজ। সেই কারণে কুড়মি-অধ্যুষিত পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ায় পদ্মশিবিরের আশাতীত ফলাফলের নেপথ্যে তাদের সমর্থন রয়েছে। তা নজরে রেখেই মুখ্যমন্ত্রী কুড়মিদের দাবি পূরণে উদ্যোগী হয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
শুভেন্দু বলেন, ‘আগের সরকার কোনও প্রতিশ্রুতিই পূরণ করেনি। উল্টে আন্দোলনের সময়ে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছে। মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। ছাড় পায়নি শিশু-বৃদ্ধরাও। আমরা কুড়মালি ও রাজবংশী ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করব। সাঁওতালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে জায়গা দেয়নি কংগ্রেস। অটল বিহারী বাজপেয়ীজি দিয়েছিলেন।
আপনাদের ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যকে যদি কেউ স্বীকৃতি দিয়ে থাকে, তা হলে সেটা বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রীর উপরে ভরসা রাখুন। সংকল্পপত্রের প্রতিশ্রুতি রাখব।’ পাশাপাশিই মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি, কুড়মিদের বিরুদ্ধে যত মামলা হয়েছে, সব প্রত্যাহার করা হবে।
কুড়মিদের যে অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী যোগ দেন, তাতে উপস্থিত ছিলেন ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী, আজসু প্রধান সুদেশ মাহাতোও। অনুষ্ঠানে শুভেন্দু করম গাছ রোপণে সাহায্য করেন আদিবাসী কুড়মি সমাজের অন্যতম নেতা অজিত মাহাতো। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি)-র জন্য কমিশন গড়েছি। অজিতবাবুরা ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন, যেন তাঁদের ইউসিসি-র বাইরে রাখা হয়। সেই মতো ইউসিসির বাইরেই রাখা হয়েছে কুড়মি সমাজকে। ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য এবং অধিকার আপনারা আমার কাছ থেকে বুঝে নেবেন।’
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দপ্তর তাঁর হাতেই রয়েছে। সেই দপ্তরের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে, সেই ১৬০০ কোটি টাকা পুরোপুরিই খরচ করা হবে পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য। কুড়মি উন্নয়ন পর্ষদ পুনরায় সক্রিয় করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জানিয়েছেন, আগের তৃণমূল সরকার মাত্র ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু তাঁঁর সরকার ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। প্রয়োজনে বরাদ্দের অঙ্ক আরও বাড়ানো হতে পারে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
সম্প্রতি কুড়মি সম্প্রদায়কে তফসিলি জনজাতি(এসটি) তালিকাভুক্ত করতে কেন্দ্রকে ‘ফারদার কমন জাস্টিফিকেশন রিপোর্ট’ পাঠাবে বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার। রবিবার পুরুলিয়ায় আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিত মাহাতোদের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগের সুরে বলেন পূর্বতন সরকার নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য গোটা জঙ্গলমহলকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু তাঁর সরকারের আমলে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলার মানুষ আর নিজেদের কোনও অবস্থাতেই আলাদা ভাববেন না।
শুভেন্দু বলেন, ‘‘বারেবারে মিথ্যাচার, জঙ্গলমহলে মূলবাসীদের মধ্যে বিরোধ লাগানো, গ্রামে গ্রামে, ভাইয়ে ভাইয়ে, বোনে বোনে, বিভিন্ন সমাজের মধ্যে নানা মিথ্যা বলে একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে গোটা জঙ্গলমহলকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা করেছে… শুধু মুখে নয়, কাগজে লিখে। অন্য একদিন সে সব বলব। পরবের দিনে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাব না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বিগত সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। আপনারা যখন আন্দোলন করেছেন, তখন অত্যাচার করা হয়েছে। পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছে। মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। শিশু-বৃদ্ধও ছাড় পায়নি।’’
আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নবান্নে অজিতদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক রয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অজিতবাবু বলছিলেন, ভূমি দপ্তরে রেকর্ড নেওয়ার জন্য ১০ টাকা নেওয়া হয়। আমি এটা জানতাম না। জানার পরেই এই প্রথা বন্ধ করেছি।’
কুড়মি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করার ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, ‘‘ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং অধিকারের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। আগের সরকার পাহাড়ও বেচে দিচ্ছিল! কথা দিয়ে গেলাম কোনওটায় হাত দিতে দেব না। প্রকৃতির দানে কাউকে হাত দিতে দেব না। কোনও পাহাড় নিলাম করা যাবে না।’’ মমতাকে শুভেন্দুর কটাক্ষ, ‘‘আগের মুখ্যমন্ত্রী এই সমাজের সঙ্গে অন্তর দিয়ে মেশেননি। উল্টে মিথ্যা মামলা করেছেন।
রবিবার পুরুলিয়া-১ ব্লকে কড়াডি ময়দানে ওই করম পরবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হওয়া শুভেন্দু জানান, কোনও মুখ্যমন্ত্রী প্রথম বার এমন আমন্ত্রণ পেলেন। এ জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। তার পর কুড়মি উন্নয়ন বোর্ডের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করেছেন। এবং জানিয়েছেন, প্রয়োজনে ওই আর্থিক বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে। শীঘ্রই পুরুলিয়ায় যাতে বিমান ওঠা-নামা চালু করা যায় তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও পুরুলিয়ার চিড়িয়াখানাটি ঢেলে সাজা হবে। পুরুলিয়ায় চিতা নিয়ে আসার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
