বনগাঁ উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের বৈচিত্রময় দেওয়াল লিখন এই মুহূর্তে ‘টক অফ দ্য টাউন: দেখুন ভিডিও

0
40
অর্পিতা বনিক , দেশের সময়

বনগাঁ : ভোটের ঢাকে কাঠি পড়েছে অনেক আগেই। ভোট যুদ্ধ এখন মধ্যগগনে । প্রার্থী থেকে কর্মী-সমর্থক-সবাই ব্যস্ত প্রচারে। হাতে রংয়ের কৌটো, তুলিতে স্লোগান- এই ছবিই এখন ভরাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। কোথাও প্রার্থী নিজেই নিজের নামে দেওয়ালে রং তুলছেন, আবার কোথাও কর্মী-সমর্থকদের ভিড়ে জমে উঠছে প্রচারের আবহ। কিন্তু সেই পুরোনো দিনের ছড়ার লড়াই? তা যেন আর চোখে পড়ে না। 

বনগাঁর তরুণ আইনজীবী দীপাঞ্জয় দত্ত বলছেন, ‘শুধু এ বারের ভোট নয়, গত কয়েক বছর ধরেই এই পরিবর্তন চোখে পড়ছে। আগে পঞ্চায়েত ভোট হোক বা বিধানসভা স্থানীয় ইস্যুকে কেন্দ্র। করে দেওয়ালে মজার ছড়ার লড়াই চলত। এখন সেই সংস্কৃতিটাই হারিয়ে যাচ্ছে।”

বর্তমানে দেওয়াল লিখনে বেশি চোখে পড়ে চেনা স্লোগান- ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’ কিংবা ‘পরিবর্তন দরকার, এ বার চাই বিজেপি সরকার।’ রাজনৈতিক কর্মীদের কথায়, নেতাদের তরফে এর বাইরে নতুন কিন্তু খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। দেখুন ভিডিও

ভোটের মরশুম এলেই একসময়ে গ্রাম-শহরের দেওয়াল জুড়ে ফুটে উঠত মজার ছড়া, তির্যক খোঁচা আর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই ‘ভোটের ছড়া’ এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। দেওয়াল লিখন এখনও রয়েছে, কিন্তু তার রস, তার সৃজনশীলতা যেন অনেকটাই ফিকে এমনই আক্ষেপ রাজনৈতিক মহলের একাংশের।

ভোটের কি কোনও আগমনী গান হয়? সে গান শোনার জন্য কি কান পেতে থাকে দেওয়ালও?

বিতর্ক চলতেই পারে। তবে, দুয়ারে ‘বসন্ত জাগ্রত’ হতে না–হতেই এ বঙ্গে ভোটের দামামা বেজে গিয়েছে। বাসন্তী রঙের পোঁচ তখনও না–পড়লেও দেওয়ালও হয়তো শুনে নিয়েছে, ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে…।’

প্রার্থী ঘোষণা হতেই শুরু হয়েছে দেওয়াল–লিখন। ব্যঙ্গে, স্লোগানে, কার্টুনে, ছড়ায় সেই আটপৌরে দেওয়ালই হয়ে উঠেছে ‘গ্রাফিতি’–র চমৎকার আধার। সেখানেই প্রতিফলিত হচ্ছে সময়, রাজনীতি, ভোগান্তি ও প্রতিশ্রুতি। সে সব দেখে কেউ মুচকি হাসছেন। কেউ প্রশংসা করছেন রসবোধের। কেউ আবার খুঁজে পাচ্ছেন হারানো অতীত।

বনগাঁ উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের বৈচিত্রময় দেওয়াল লিখন এই মুহূর্তে ‘টক অফ দ্য টাউন’। রান্নার গ্যাসের সঙ্কট, মূল্যবৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় এজেন্সির বিরুদ্ধে ছড়ায়–ছড়ায় কটাক্ষ যেমন রয়েছে, তেমনই আছে ঝকঝকে রাস্তা কিংবা ঝলমলে আলো নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত স্লোগান। রয়েছে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও ‘যুবসাথী’র সমর্থনে কবিতাও।

বনগাঁ উত্তরে এ বার তৃণমূলের প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাস। বিজেপির প্রার্থী বিদায়ী বিধায়ক, অশোক কীর্তনিয়া। সিপিএম প্রার্থী করেছে পীযূষকান্তি সাহাকে। রাজনৈতিক মহলের মত, ভোটের অঙ্কে কোন দল এগিয়ে থাকবে আর কোন দল পিছিয়ে তা জানা যাবে আগামী ৪ মে। তবে বনগাঁ উত্তরে দেওয়াল লিখনে এখনও পর্যন্ত তৃণমূলই এগিয়ে।

সে কথা যে কথার কথা নয়, তা জানান দিচ্ছে বনগাঁ পুরসভার ৪, ৯ ,১০, ১৬ ও ২০ নম্বর–সহ বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের দেওয়াল। কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে প্রায়ই হেনস্থার অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে। তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে তৃণমূলের দেওয়ালে— ‘মোদী সরকারের দুই ভাই/ইডি আর সিবিআই’। আবার রান্নার গ্যাসের সঙ্কট ও গ্রাহকদের হয়রানি নিয়ে লেখা হয়েছে, ‘গ্যাসের নামে লুটছে দিনে কিংবা রাতে/প্রাণ বাঁচাতে লড়ছে মানুষ নেত্রী আছে সাথে’।

আরও আছে। বিজেপিকে ভোট না–দেওয়ায় আবেদন জানিয়ে আঁকা হয়েছে কেউটে। নীচে লেখা, ‘পদ্মফুলে দিলে ছাপ/ ঘরে ঢুকবে কেউটে সাপ’। কোথাও শোভা পাচ্ছে, ‘লাফাচ্ছে সব চুনোপুঁটি/ একাই ১০০ হাওয়াই চটি’। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’–এ টাকা বৃদ্ধি নিয়েও ছড়া কেটেছে তৃণমূল, ‘কুমোরপাড়ার গোরুর গাড়ি/বোঝাই করা লক্ষ্মীর হাঁড়ি’।

এ সব ছড়া, কবিতা, কার্টুন কিংবা প্যারোডি তৈরি করেছেন তৃণমূলের যুবকর্মী ও কাউন্সিলাররা। স্থানীয় পুরসভার চেয়ারম্যান দিলীপ মজুমদার বলছেন, ‘রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনে ছড়া কিংবা কবিতার উপরে সাধারন মানুষের বরাবর একটা আগ্রহ রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমাতেও সে আগ্রহে ভাটা পড়েনি। রাজনীতির কূটকচালিতে তাঁদের আগ্রহ না–থাকলেও দেওয়ালে ভালো ছড়া, কবিতা, ব্যঙ্গচিত্র আঁকা থাকলে তাঁরাও দু’দণ্ড রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে সব দেখেন। পথচলতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই দেওয়াল লিখনেও আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছি।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, ‘ভোটের সময়ে দৃশ্য–দূষণের নজিরও কম নেই। তবে সে সবের মাঝে দেওয়ালে অন্যরকম স্লোগান, বুদ্ধিদীপ্ত কার্টুন কিংবা মজার ছড়া লেখা থাকলে সে সব দেখতে ভালোই লাগে। কিছুটা রিলিফও পাওয়া যায়।’

তবে বনগাঁ উত্তরের বিজেপি প্রার্থী অশোক কীর্তনিয়া অবশ্য তৃণমূলের ছড়া–কার্টুন কিংবা দেওয়াল লিখনকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাঁর কথায়, ‘এ সব করে তৃণমূল ভোট বৈতরণী পার হতে পারবে না। এখানে আমরাই জিতব।’ সে কথার উত্তর না দিয়ে তৃণমূলের লোকজন তর্জনি তুলে দেখিয়ে দিচ্ছেন দেওয়াল। সিপিএম, কংগ্রেস ও বিজেপিকে এক আসনে বসিয়ে সেখানে লেখা হয়েছে, ‘হাত–হাতুড়ি–পদ্ম/হাওয়াই চপ্পলেই জব্দ’।

তবে বাম শিবিরের দাবি, এখনও ছড়ার চর্চা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সমকালীন নানা বিষয় তাঁদের দেওয়াল লিখনে উঠে আসছে।

এই মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করছেন বিজেপির এক নেতা রথীন্দ্রনাথ হালদার। তাঁর মতে, ‘এই ধরনের ছড়া লিখতে হলে রাজনৈতিক চর্চা, পড়াশোনা এবং সমকালীন বিষয় সম্পর্কে আন থাকা দরকার। সেই চর্চাতেই ভাটা পড়েছে।’

তরুণ প্রজন্মের একাংশ আবার মনে করছে, এই জায়গাটা দখল করে নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন এআই-নির্ভর ছবি এখন নতুন ট্রেন্ড। রামনবমী উপলক্ষে তৃণমূলের দুই নেতা সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌমেন বেলঘরিয়ার ‘রামভক্ত’ রূপে ছবি তারই উদাহরণ।

ফ্লেক্স ব্যবসায়ীদের কথায়, এ বার অভরি অনেকটাই কম। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি কমে যাওয়াও এর একটি কারণ। অন্য দিকে, রং ব্যবসায়ীদের দাবি দেওয়াল লিখনের জন্য রংয়ের চাহিদা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। বনগাঁর দেওয়াল লিখন শিল্পী অজয় দাস বলছেন, ‘দেওয়ালে ছড়া লিখে প্রচার অনেক বেশি আকর্ষণীয় করা যায়। ফ্লেক্সে সেই সুযোগ নেই। আবার কালবৈশাখীর সময়ে ফ্লেক্স সহজেই নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু দেওয়াল লিখন টিকে থাকে।

সব মিলিয়ে, এক দিকে হারিয়ে যাওয়া ভোটের ছড়ার নস্টালজিয়া, অন্য দিকে দেওয়াল লিখনের নতুন করে ফিরে আসা এই দুইয়ের টানাপড়েনে বদলে যাচ্ছে বাংলার ভোট-সংস্কৃতির চেনা ছবি।

ব্যঙ্গে–স্লোগানে–কার্টুনে ও ছড়ায় দেওয়াল বুনছে ভোটের ভবিষ্যৎ

Previous article‘আমাকে জেলে ঢুকিয়ে দিন, আরও বেশি ভোট পাব , না হলে গুলি করে মেরে দিন’!’এত সাহস, আমার সঙ্গে কথাও বলে না !’ মমতার নিশানায় কে?
Next articleI PAC-Vinesh Chandel: আইপ্যাক-কর্তা বিনেশের ১০ দিনের ইডি হেফাজতের নির্দেশ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here