দেশের সময় ঃএবারের ২১ জুলাইয়ের সভা নিয়ে শাসক দলের ভেতরে যেমন তেমনি বিরোধী শিবিরেও প্রবল আগ্রহ ছিল।এই আগ্রহের কারণ একটাই ২০১১তে ক্ষমতায় আসার পর এবারই প্রথম শাসক দলের একাধিপত্য তুমুল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বিরেধীরা,বিশেষ করে বিজেপি একেবারে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে শাসক দলের।উত্তরবঙ্গে কার্যত নিঃশ্চিহ্ন হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস।অন্যান্য জায়গাতেও সিপিএম ঢাল হয়ে না দাঁড়ালে শাসক দল এ রাজ্যে একেবারে মুখ্ থুবরে পড়ত।এই রকম একটা পরিস্থিতিতে এবারের ২১ জুলাইয়ের সভা কত লোক টানতে পারবে,এবং কতটা জোশ ধরে রাখতে পারবে তা নিয়ে সংশয় ছিল খোদ শাসক দলের অন্দর মোহলেই।

লাগাতার প্রচার ও সভা সমাবেশ করে লোক আনার প্রস্তুতি শুরু করা হয়েছিল একমাস আগে থেকেই।তৃণমূলের কাছে এবারের ২১জুলাইয়ের সভা অনেকটা হয়ে উঠেছিল মান বাঁচানোর লড়াই।কেননা এবারের সভাি জমাটি না করতে পারলে বিজেপি প্রচার করার সুযোগ পেয়ে যাবে যে তৃণমূলের বিদায় ঘন্টা বেজে গেছে বুঝতে পেরেই মানুষ আর ২১জুলাই সভা নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

তাই তৃণমূলের শীর্ষ স্তর থেকে নির্দেশ গেছিল জেলায় জেলায়,জেলা থেকে ব্লক অফিস হয়ে একেবারে গ্রাম পঞ্চায়েত পর্যন্ত।তৃণমূল সূত্রের খবর বিপুল অংকের অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল এবারের সভাকে সফল করে তুলতে।স্থানীয় নেতাদের একেবারে টার্গেট ধরে দেওয়া হয়েছিল লোক ধরে আনতে।বলা হযেছিল প্রযোজনে সভার এক সপ্তাহ আগে থেকেই জেলার লোকজনকে কলকাতায হাজির করতে।তাদের খাবার ও থাকার যাবতীয় আয়োজন করার কথাও বলে রাখা হয়েছিল।

সেইমত সর্বাত্মক ভাবেই তৃণমূল নেতৃত্ব ঝাঁপিয়েছিল।দলনেত্রীকে খুশি করতে পারলে নানা প্রলোভনের জালও বুনে রাখা হয়েছিল।তবে সভা শেষ করার পর তৃণমূলের অন্দরমোহলে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, না সভাকে ঠিক সফল বলা যাচ্ছে না।উত্তরবঙ্গে ভোটের ফল খুব খারাপ হওয়ায় সেখান থেকে লোক আনতে বাড়তি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল,দলের যাবতীয় প্রয়াস ছিল উত্তরবঙ্গ থেকে ব্যাপকহারে লোক আনা,ভাবা হয়েছিল দক্ষিণবঙ্গ থেকে স্বঃতস্ফুর্ত ভাবেই লোক আসবে।

বাস্তবে দেখা গেল তৃণমূলের শক্তঘাঁটি বলে পরিচিত ধক্ষিণবঙ্গ থেকেই তুলনায় লোক কম এসেছে।বিষয়টা নিয়ে প্রকাশ্যে কেউই মুখ খুলছেন না,বরং তাঁরা দাবি করছেন এবার নাকি অন্যান্যবারের চেয়েও বেশী লোক এসেছে।তবে মাইকে বার বার চিড়িয়াখানায় না যাওয়ার ঘোষণা,খোদ তৃণমূল সুপ্রিমোর তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই কেউ বক্তব্য চলাকালীন চলে যাবেন না বলা,পরোক্ষে বুঝিয়ে দিয়েছে তৃণমূল এবারের ভিড় নিয়ে খুশি নয়।যদিও তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী মঞ্চে এসেই বলে দেন তিনি রেড রোড থেকে আসার সময় নাকি দেখেছেন অসংখ্য মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়েই বক্তব্য শুনছেন।

এসব কথা কিন্তু প্রমাণ করে তিনি গোটা বিষয়টা সামাল দিতে চাইছেন।সবাই দেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমোর বক্তব্য চলাকালীনই ধর্মতলা চত্ত্বর একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়।ভিড় খুব বেশী হলে যা কোনভাবেই সম্ভব হত না।মঞ্চে সেলিব্রিটিদের সেই তুমুল উপস্থিতিও এবার চোখে পড়ল না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে মঞ্চে সেই উদ্দীপনা তাই বা কোথায় দেখা গেল?নেতাদের বক্তব্যে সেই জোশ শোনা গেল না।মমতা বললেন বটে যে তাঁরাই ২০২১ এ ফিরে আসবেন,কিন্তু তাঁর সেই আশ্বাসবাণী জনমানবকে তেমন ছুঁলো বলে তো মনে হল না।

সভা শেষেও একাধিক নেতার গলায় হতাশা,নিরুচ্চারে মেনে নেওয়া না আগের সেই জোশ ধরে রাখা য়ায় নি।উচ্চ্বাস-উদ্দীপনা সবই কমেছে সভায়।বিজেপি নেতারা কটাক্ষ করে বলে বলতে শুরু করেছেন ডিম ভাতের লোভ দেখিয়েও লোক টানতে পারে নি,ডিম ভাত পাহাড়া দিয়েছে পুলিশ,খাওয়ার লোক ছিল না,বললে নাকি বিজেপির নেতারাই লোক পাঠাতেন।

এসব রাজনৈতিক তরজার পাশে যেটা পরিষ্কার এবার সত্যিই ২১জুলাইয়ের সেই মেজাজ পাওয়া য়ায়নি।যা স্বীকার করছেন একাধিক তৃণমূল নেতা।প্রকাশ্যে না বললেও একান্তে তাঁরা মানছেন কোথাও একটা তাল কেটে যাওয়া সুর শোনা গেছে এবার ২১জুলাই সভায।কেউ কেউ বলছেন ভোটে একটা বিপর্যয় তো হয়েছে তার রেশ এত তাড়াতাড়ি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

মজার কথা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বলছেন লোকসভায় বিজেপি মাত্র কিছু ভোট বেশী পেয়েছে,তখন তাঁর দলেরই নেতারা একান্তে বলছেন লোকসভা ভোটে চাঁদের বিপর্যয় হয়েছে।মুখ ও মনের এই বৈপরিত্যটাই এবার ২১জুলাইয়ের প্রধান বার্তা।যে বার্তা বলাই বাহুল্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য মোটেই সুখপ্রদ নয়। ছবি – কুন্তল চক্রবর্তী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here