

রথযাত্রা,লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
পথ ভাবে ,’আমি দেব’ রথ ভাবে ‘আমি’,
মূর্তি ভাবে ‘আমি দেব’–হাসে অন্তর্যামী।

রবীন্দ্রনাথ নাথ ঠাকুরের কবিতা যেন আজও খুবই প্রাসঙ্গিক। অন্যান্য বছরের মতো চলতি বছরেও পুরীর বাহুড়া যাত্রায় ভক্তের ঢল দেখা গেল শ্রীক্ষেত্রে। শনিবার গুন্ডিচা মাসির বাড়ি থেকে পুরী মন্দিরে ফিরলেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। তিনজনের রথই সজ্জিত ছিল ফুল – মালা দিয়ে। রথযাত্রার দিন থেকে এই ক’দিন জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রা অধিষ্ঠিত ছিলেন গুন্ডিচা মন্দিরে। এখানেও নিয়মিত ভক্তরা জগন্নাথদেবের দর্শনে আসতেন।
বৃহস্পতিবার সারা রাত গুন্ডিচা মন্দির খোলা ছিল ভক্তদের জন্য। উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায় সেখানে। তবে শুক্রবার সন্ধ্যার পর মন্দির দ্বার বন্ধ হয়ে যায় পরদিন উৎসবের প্রস্তুতির জন্য। জগন্নাথদেবের রথের নাম নন্দীঘোষ। বলরামের রথের নাম তালধ্বজ এবং সুভদ্রার রথ হলো দর্পদলন। তিনটে রথের উচ্চতা আলাদা। তিনটি রথের রঙও আলাদা।

ভগবান জগন্নাথদেবের রথের রঙ লাল- হলুদ, বলরামের লাল- সবুজ এবং সুভদ্রার রথ লাল- কালো। গুন্ডিচা মন্দির থেকে পুরী মন্দির পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। এই সময় বিশেষ কিছু গাড়ি ছাড়া সবরকম যানবাহনই বন্ধ থাকে। রাস্তায় মানুষের ঢল নামে।কোথাও মঞ্চ বেঁধে নানারকম অনুষ্ঠান। আবার কোথাও দল বেঁধে মানুষ জগন্নাথদেবের আরাধনায় মেতে ওঠেন। রাস্তার দুই পাশে অস্থায়ী দোকান বসে যায়। সেখান পুজোর সামগ্রী থেকে শুরু করে খাবার, খেলনাসহ রকমারী জিনিস বিক্রি হয়।
গুন্ডিচা থেকে প্রথমে বলভদ্রের রথ বের হয় তার একটু পেছনে সুভদ্রার রথ থাকে। ভক্তের দল রথের দড়ি টেনে নিয়ে আসেন। সবার শেষে চতুর্গুন ভিড়ের সঙ্গে আসেন জগন্নাথদেব। রাস্তার দুই পাশে অগনিত মানুষ এই রথগুলো দেখবার জন্য জড়ো হন। কেউ আবার রথের দড়ি ছোঁয়ারও চেষ্টা করেন। এই ভাবে রথগুলো খুব ধীর গতিতে পুরী মন্দিরের সামনে গিয়ে পৌঁছোয়। উল্টোরথের পরের দিন জগন্নাথদেবকে রাজবেশ পড়ানো হয়। এই রূপ দেখতেও অগনিত মানুষ ভিড় করেন।
তবে মাসির বাড়ি থেকে শ্রীমন্দিরে ফিরে এলেও পুরীর মন্দিরের প্রথা অনুসারে এখন তিন দিন মন্দিরের বাইরেই থাকবেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। কী হয় এই তিন দিন? এই সময় কোথায় থাকেন জগন্নাথ দেব? জেনে নিন পুরীতে কেন এই প্রথা প্রচলিত !
রথে করে জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রার মাসির বাড়ি যাওয়ার ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় হীরা পঞ্চমী প্রথা অনুষ্ঠিত হয়।Heera Panchami হল জগন্নাথদেবের রথযাত্রার যে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
এদিন পালকি করে মহালক্ষ্মীর একটি মূর্তিকে গুণ্ডিচা মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিশেষ ভোগ ও বৈদিক নাম-গান করে পালিত হয় হীরা পঞ্চমী নামে প্রচলিত এই প্রথা। জগন্নাথ ও মহালক্ষ্মীর মধ্যে সাধারণ স্বামী-স্ত্রীর মতো যে প্রেম ভালোবাসা ও মান-অভিমান, তারই প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে এই প্রথার মধ্যে দিয়ে।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রার সঙ্গে রথে করে মাসির বাড়ি যাওয়ার আগের দিন জগন্নাথদেব মহালক্ষ্মীকে বলে যান যে পরের দিনই তিনি ফিরে আসবেন। কিন্তু চার দিন পরেও তিনি না ফিরলে স্বমী কেমন আছেন, সেই চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন মহালক্ষ্মী । পাঁচ দিনের দিন দেবী বিমলার পরামর্শে জগন্নাথের মাসির বাড়ি গুণ্ডিচা মন্দিরে পালকি করে উপস্থিত হন তিনি। মহালক্ষ্মী আসছেন এই খবর পেয়েই গুণ্ডিচা মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেন জগন্নাথ। এর ফলে মহালক্ষ্মী অত্যন্ত রেগে যান।
পত্নীকে ছেড়ে জগন্নাথ দাদা ও বোনের সঙ্গে সুখে দিন কাটাচ্ছেন বুঝতে পেরে প্রচণ্ড অভিমান ও রাগ হয় তাঁর। রাগের চোটে অনুচরদের নির্দেশ দিয়ে জগন্নাথের রথ নান্দীঘোষের কিছুটা অংশ ভেঙে দেন তিনি। এই প্রথা আজও স্বাড়ম্বরে পালিত হয় পুরীতে মহালক্ষ্মীর দ্বারা নান্দীঘোষ ভাঙার প্রথা পরিচিত রথভঙ্গ নামে।

কিন্তু রথ ভাঙার পরেই নিজের ভুল বুঝতে পারেন মহালক্ষ্মী। অনুতপ্ত ও ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে তিনি মূল রাস্তা দিয়ে না ফিরে অন্য একটি ভেতরের রাস্তা দিয়ে ফিরে আসেন। তখন তাঁর সঙ্গে কোনও লোক লস্কর থাকে না। জগন্নাথদেব ও মহালক্ষ্মীর এই সাধারণ পতি-পত্নীর মতো মান-অভিমানের পালা দেখতে প্রতি বছর ভিড় করেন অসংখ্য ভক্ত।
এরপর দেবতারা মূল দরজার বাইরে রথের মধ্যেই ৩ দিন থাকেন।
সেখানেই একাদশী তিথিতে পালিত হয় সোনাবেশ। এদিন জগন্নাথ সহ সুভদ্রা বলরাম সেজে ওঠেন নানা সোনার গয়নার সাজে।
দ্বাদশীর সন্ধ্যায় পালিত হয় অধরপনা। রীতি মেনে, এইদিন জগন্নাথদেবকে শরবত খাওয়ানো হয়।
ত্রয়োদশীর দিন পালিত হয় রসগোল্লা উৎসব। এদিন মিষ্টি মুখ করেন জগন্নাথদেব। কয়েকশ হাড়ি রসগোল্লা, ভোগ খান তিনি।
সবশেষে নীলাদ্রিবিজয় উৎসবের মাধ্যমে এই সমস্ত রীতি রেওয়াজ সম্পন্ন হয়। এরপরেই তিন দিন পেরিয়ে, জগন্নাথ সুভদ্রা ও বলরামকে পুরীর মন্দিরের মূল রত্নবেদিতে ফের স্থাপন করা হয়।
পুরাণ থেকে জানাযায়, প্রায় ২০০০ বছর আগে রথযাত্রা ও উল্টোরথ যাত্রার প্রচলন হয়েছিল। ওড়িশার প্রাচীন পুঁথি, ‘উৎকলখণ্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’তে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস সম্পর্কে অনেক তথ্য রয়েছে। বলা হয়েছে যে, এই রথযাত্রার প্রচলন সত্যযুগে। তখন ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেখানকার অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে এক সূর্যবংশীয় রাজা ছিলেন। পরম বিষ্ণুভক্ত ছিলেন তিনি। একবার ভগবান বিষ্ণুর দশম অবতার জগন্নাথ দেবের মূর্তি গড়ে রথযাত্রা শুরু করার আদেশ পেয়েছিলেন তিনি। স্বপ্নেই নাকি এ আদেশ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। এরপর থেকেই ইন্দ্রদ্যুম্ন রথযাত্রার প্রচলন করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, রথযাত্রার দিনের মতোই উল্টোরথেও পুরীতে কড়া সর্তকতা জারি করা হয়। ভিড় সামলানোর জন্য ভক্তদের সমাবেশেও কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ওড়িশা সরকার।



