

দ্বিতীয় দফার ভোটের তিন দিন আগে ফের অ্যাকশনে ইডি। রেশন দুর্নীতি মামলায় ফের জোরদার তদন্ত। হাবড়ায় চার জায়গায় ইডির হানা। দক্ষিণ হাবড়ার সুভাষ রোডে চাল ব্যবসায়ী রাজীব সাহা ও পার্থ সাহার বাড়িতে হানা দেন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের আধিকারিকরা। অন্যদিকে আরও দুই জায়গাতেও হানা দিয়েছে ইডি। জয়গাজির নেতাজি রোডে চাল ব্যবসায়ী সমীর চন্দ্রের বাড়িতেও হানা দেয় ইডি। পাশাপাশি হাবরার শ্রীনগরে আর এক চাল ব্যবসায়ীর সাগর সাহার বাড়িতেও হানা দেয় ইডি। হাবড়া-সহ মোট ৯ ব্যবসীয়র বাড়িতে চলছে তদন্ত। এছাড়াও একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অফিস, সংস্থা সহ মোট ১৭ জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি।

সূত্রের খবর, কোভিডকালে ১৭১ ট্রাক গম ধরা পড়েছিল তার রেশ ধরেই নতুন করে তদন্তে গতি এসেছে। অভিযোগ, পাচার করা হচ্ছিল ৫ হাজার টনের বেশি গম। সেই সময় শুল্ক দফতর প্রত্যেকটি ট্রাককে আটক করে। পরবর্তীতে রাজ্য পুলিশের থেকে তদন্তভার নেয় ইডি। সূত্রের খবর, ওই সময় ধরা পড়ে প্রায় ১৬ কোটি টাকার গম। অভিযোগ এফসিআই থেকে যে গম পাঠানো হয় সেই গম হিসাবে কারচুপি করে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল বাংলাদেশে। ওই কেসে এক্সপোর্টার হিসাবে যাঁদের নাম উঠে এসেছিল তাতেই এই চার ব্যক্তির নাম ছিল বলে জানা যাচ্ছে। পুরো কাণ্ডে প্রত্যেকেই মোটা টাকা কামিয়েছে বলে অভিযোগ। সেই এক্সপোর্টারদের চিহ্নিত করেই তাঁদের বাড়ি অফিস, বিভিন্ন সংস্থায় তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, এই অভিযানের যোগসূত্র রয়েছে কোভিডকালের এক বিশাল গম পাচার কেলেঙ্কারির সঙ্গে। ১৭৫ ট্রাক গম আটক করার সেই পুরনো ঘটনার রেশ ধরেই এবার তদন্তের গতি বাড়াল কেন্দ্রীয় সংস্থা। নজরে সেই সময়কার এক ১৬ কোটি টাকার ‘রেশন দুর্নীতি’।

কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে এদিন ভোররাতেই অভিযানে (Enforcement Directorate Raid Habra) নামেন গোয়েন্দারা, যা ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
প্রসঙ্গত, এই হাবড়াতেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছেন প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (Jyotipriya Mallick TMC)। রেশন দুর্নীতি মামলায় নাম জড়ানোয় আগে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি। এখন তিনি জামিনে মুক্ত রয়েছেন।

২৯ এপ্রিল ভোট রয়েছে হাবড়ায়। এবারও হাবড়ার প্রার্থী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। অতীতে রেশন দুর্নীতি মামলায় তাঁর গ্রেফতারি নিয়ে বিস্তর চাপানউতোর হয়েছে রাজনৈতিক আঙিনায়। যদিও শেষ পর্যন্ত এবারও তাঁর উপরেই ভরসা রেখেছে দল। এদিকে তিনি মন্ত্রী থাকাকালীন সময়েই এই এই গম এক্সপোর্টের জল গড়িয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। ফলে ভোটের মুখে ফের এই কেসের তদন্ত যে বিশেষভাবে তাৎপর্যন্তপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে কারণেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আঙিনাতেও চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
৫ হাজার টন গম ও পাচার চক্র
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা যাচ্ছে, অতিমারি চলাকালীন এফসিআই (FCI) থেকে বরাদ্দ হওয়া প্রায় ৫ হাজার টনেরও বেশি গম হিসেবে কারচুপি করে বাংলাদেশে পাচার করার ছক কষা হয়েছিল। সেই সময় শুল্ক দফতর তৎপর হয়ে ১৭১টি গম বোঝাই ট্রাক আটক করে। হিসাব বহির্ভূতভাবে এই বিপুল পরিমাণ সামগ্রী সীমান্ত পার করানোর অভিযোগ উঠেছিল। যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১৬ কোটি টাকা। প্রথমে রাজ্য পুলিশ এই ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও, পরবর্তীতে দুর্নীতির গভীরতা বুঝে তদন্তভার হাতে নেয় ইডি।
এক্সপোর্টারদের ডেরায় হানা
ইডির দাবি, সরকারি নথি জাল করে যে সমস্ত ‘এক্সপোর্টার’ বা রফতানিকারকদের মাধ্যমে এই গম বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যেই অন্যতম হলেন হাবড়ার এই ব্যবসায়ীরা।
শনিবার সকাল থেকে সমীর চন্দ এবং সাগর সাহার মতো ব্যবসায়ীদের বাড়ি ও অফিসে যে তল্লাশি চলছে, তার মূল উদ্দেশ্যই হল সেই সময়ের আর্থিক লেনদেনের নথি উদ্ধার করা। অভিযোগ, গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ গম বিদেশে পাচার করে এই ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। সেই কালো টাকাই বর্তমানে প্রভাবশালী ও রাজনীতিকদের মাধ্যমে সাদা করা হয়েছে কি না, গোয়েন্দারা এখন সেটাই খতিয়ে দেখছেন।
তদন্তের নিশানায় কালো টাকা

রেশন বণ্টন দুর্নীতির তদন্তে এর আগেও রাজ্যজুড়ে তল্লাশি চালিয়েছে ইডি ও সিবিআই। মূলত রেশনের সামগ্রী খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করা, কালোবাজারি এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক তছরুপের অভিযোগ রয়েছে এই মামলায়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের নজরে এখন চালের উৎস এবং তার লেনদেনের গতিপ্রকৃতি। ব্যবসায়ীরা কোথা থেকে চাল কিনতেন, সরকারি মান্ডিতে কী দামে তা সরবরাহ করা হতো এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী যোগসূত্র ঠিক কোথায় – তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। অভিযোগ উঠেছে, এই চাল ব্যবসার আড়ালেই দুর্নীতির কালো টাকা সাদা করা হয়েছে।
এদিন তল্লাশি চলাকালীন কোনওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ব্যবসায়ীদের বাড়ির গেট ও আশপাশের এলাকা মুড়ে ফেলা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের দিয়ে। বাড়ির ভেতরে ব্যবসায়ীদের নথিপত্র পরীক্ষা করার পাশাপাশি বয়ান রেকর্ড করছেন ইডি আধিকারিকরা। এই অভিযানে নতুন কোনও তথ্য বা প্রভাবশালী যোগসূত্র বেরিয়ে আসে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে ওয়াকিবহাল মহল।

গত ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় রাজ্যের ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়ে গিয়েছে। ২৯ এপ্রিল, বুধবার রয়েছে দ্বিতীয় দফায় বাকি ১৪২টি আসনের ভোটগ্রহণ। হাবড়াতেও ভোট দ্বিতীয় দফাতেই। ভোটের ফল জানা যাবে ৪ মে।



