

গঙ্গাসাগরের মাহাত্ম্য
কথায় বলে, ‘সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার’। অর্থাত্ সব তীর্থে বারবার গিয়ে যে পূণ্যলাভ হয়, গঙ্গাসাগরে মাত্র একবার সেই পরিমাণ পূণ্য লাভ করা সম্ভব হয়। হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ এই তীর্থস্থান। গঙ্গা নদী এখানে সাগরে এসে মিশেছে। তাই এই স্থানের নাম গঙ্গাসাগর। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় কপিল মুনির আশ্রম প্রাঙ্গনে মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো চলছে গঙ্গাসাগর মেলা।

হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, কুয়াশা আর উত্তাল সমুদ্রের মাঝেও বিশ্বাস আর ভক্তির টানেই গঙ্গাসাগরে চলছে পুণ্যের ডুব। মকর সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে ভোরের অন্ধকার কাটতে না কাটতেই লক্ষ লক্ষ পূণ্যার্থীর ঢল নেমেছে সাগরদ্বীপে।
গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমে স্নান করছেন মানুষ। রাতভর অপেক্ষার পর ভোর হতেই “সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার”—এই মন্ত্র উচ্চারণ করে পুণ্যস্নানে নামছেন সাধু-সন্ন্যাসী থেকে শুরু করে সাধারণ ভক্তরা।
বুধবার মকরসংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে পুণ্যস্নান করবেন প্রায় এক কোটি মানুষ। পুণ্যস্নানের মাহেন্দ্রক্ষণ শুরু হচ্ছে বুধবার দুপুর ১টা ১৯ মিনিট থেকে, চলবে বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ১৯ মিনিট পর্যন্ত। মঙ্গলবার দুপুর তিনটে পর্যন্ত প্রায় ৬০ লক্ষ পুণ্যার্থী মেলায় এসেছেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস।
অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন এই মহাতীর্থে। কনকনে শীত, ঠান্ডা হাওয়া আর ঠান্ডা জলের তোয়াক্কা না করেই গঙ্গাস্নানে অংশ নিচ্ছেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, মহিলা ও শিশুরাও।

সাগরদ্বীপের কপিলমুনির আশ্রম সংলগ্ন এলাকা থেকে সমুদ্রতট—সব জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে মানুষের ভিড়। কেউ স্নান শেষে পুজো দিচ্ছেন, কেউ দান-ধ্যান করছেন, আবার কেউ গঙ্গাজল মাথায় নিয়ে প্রণাম জানাচ্ছেন সূর্যদেবকে।
পুণ্যস্নানকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় এক ধর্মীয় আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে প্রবল শীতের কারণে ভোগান্তির ছবিও ধরা পড়েছে। ভেজা কাপড়ে কাঁপতে কাঁপতে অনেককেই দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
পর্যাপ্ত পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যায় পড়ছেন বহু পূণ্যার্থী, বিশেষ করে মহিলারা। ঠান্ডা বাড়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও সামনে আসছে।

সাগরমেলা জুড়ে চলছে মকর সংক্রান্তির মাহেন্দ্রক্ষণের কাউন্টডাউন। পুণ্যলাভের আশায় পুরোহিত, ভিখারি থেকে শুরু করে পুজোর ডালা বিক্রেতা সকলেই তাকিয়ে মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে। মঙ্গলবার ভোর থেকেই লক্ষাধিক পুণ্যার্থী সাগরস্নানে নেমে পড়েন। কপিলমুনি আশ্রমের সামনে ছিল দীর্ঘ লাইন। সোমবার থেকে শীতের কামড় কিছুটা কমলেও ভোরের সাগরমেলা ছিল হালকা কুয়াশায় মোড়া। চারদিকে ভেসে আসছে হনুমান চালিশা, হরিনাম সংকীর্তন ও ভক্তিগীতির সুর। রাতের রঙিন আলোয় সেজে ওঠা মেলা সকালে ছিল শান্ত।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, গঙ্গাসাগর মেলায় দুর্ঘটনাজনিত বিমার অঙ্ক পাঁচ লক্ষ টাকা। এই বিমার আওতায় পুণ্যার্থী, সরকারি কর্মী, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, সাংবাদিক, পরিবহন কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা রয়েছেন। মেলায় সমস্ত যাত্রিবাহী বাস, ট্রাক, অ্যাম্বুল্যান্স ও সরকারি যানবাহনে জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানো হয়েছে। এ দিন গঙ্গাসাগরে এসেছিলেন পুরীর শঙ্করাচার্জ স্বামী নিশ্চলানন্দ সরস্বতী। সাংবাদিক সম্মেলনে শঙ্করাচার্য বলেন, ‘দিঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরি প্রশংসনীয়, কিন্তু একে জগন্নাথ ধাম বলা উচিত নয়।’ ভিন রাজ্যে বাংলাভাষীদের উপরে অত্যাচারেরও নিন্দা করেন শঙ্করাচার্য।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য শিবির, অ্যাম্বুলেন্স ও স্বেচ্ছাসেবকদের মোতায়েন করা হয়েছে। নজরদারিতে রয়েছে পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। তবুও ভিড়ের চাপে কিছু জায়গায় সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
সব প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করেই বিশ্বাসের জোরে চলছে গঙ্গাসাগরের পুণ্যের ডুব। পূণ্যার্থীদের মতে, কষ্ট যতই হোক, এই পবিত্র স্নানের মাহাত্ম্যই সব দুর্ভোগ ভুলিয়ে দেয়। গঙ্গাসাগর মেলা আবারও প্রমাণ করল—ভক্তির কাছে শীত, কষ্ট সবই তুচ্ছ।

গঙ্গাসারের পৌরাণিক কথা
পুরাণ অনুসারে অযোধ্যার ইক্ষাকু বংশের রাজা ছিলেন সাগর। সাগর রাজার অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া চুরি করে গঙ্গাসাগরে কপিল মুনির আশ্রমের কাছে সেগুলি লুকিয়ে রাখেন দেবরাজ ইন্দ্র। সেই ঘোড়া খুঁজতে গিয়ে কপিল মুনির রোষের মুখে পড়েন সাগর রাজার ৬০ হাজার পুত্র। অভিশাপ দিয়ে তাঁদের ভষ্ম করে দেন কপিল মুনি। সাগর রাজার নাতি তাঁর পূর্বপুরুষদের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ করলে কপিল মুনি তাঁকে বলেন স্বর্গের নদী গঙ্গাকে মর্ত্যে নিয়ে আসতে। গঙ্গার পূণ্যস্পর্শে রাজার ৬০ হাজার পুত্র প্রাণ ফিরে পাবেন। কিন্তু গঙ্গা তীব্র গতিতে মর্ত্যে ঝাঁপিয়ে পড়লে পৃথিবী ভেসে যাবে, এই আশঙ্কায় মহাদেবের দ্বারস্থ হন ভগীরথ। তখন শিব তাঁর জটায় গঙ্গাকে ধারণ করে নেন এবং একটু একটু করে জল ছাড়েন তিনি। সেই কারণে মহাদেবের জটায় গঙ্গার স্থান। মকর সংক্রান্তিতেই গঙ্গাসাগরে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নামেন গঙ্গা।

সূর্যের উত্তরায়ণ
মকর সংক্রান্তিতে ধনু রাশি ছেড়ে মকর রাশিতে প্রবেশ করে সূর্য। এই দিন থেকে শুরু হয় সূর্যের উত্তরায়ন। পুরাণ অনুসারে সূর্যের উত্তরায়ন শুরু হলে ঘুম ভাঙে স্বর্গের দেবতাদের। সারা দেশে বিভিন্ন নামে এই দিনটি উদযাপন করা হয়ে থাকে।



