প্রচ্ছদলেটেস্ট নিউজদেশপশ্চিমবঙ্গকলকাতাউত্তরবঙ্গজেলাব্যবসাবিনোদনখেলাআন্তর্জাতিকবাংলাদেশফটো গ্যালারিভ্রমণকাহিনীসম্পাদকের পছন্দসরাসরিইউটিউবই-পেপার
Breaking News

তিন দিন পরে স্বাধীন হয়েছিল সীমান্ত শহর বনগাঁ ,ইতিহাস জানুন: দেখুন ভিডিও

deshersamay

Share article:
অর্পিতা বনিক

১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভারতের স্বাধীনতার দিন বনগাঁ শহর কিন্তু ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে।

প্রবীণ আইনজীবীরা জানালেন,বনগাঁ পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়ায় সে সময়ে মুসলিম লিগের পক্ষ থেকে শহরে উত্‌সব করা হয়েছিল। যদিও তার তিন দিন পরে, ১৮ অগস্ট বনগাঁ মহকুমার বনগাঁ ও গাইঘাটাকে এ দেশের তত্‌কালীন অবিভক্ত ২৪ পরগনা জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

গত কয়েক বছর ধরেই ১৮ অগস্ট দিনটিকে স্মরণ করে বনগাঁ মহকুমা আদালতের আইনজীবীরা আদালত চত্বরে জাতীয় পতাকা তুলে আসছেন। বনগাঁ আদালতটিও বহু ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।

বনগাঁ ল’ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক  প্রবীণ আইনজ জীবি সমীর দাস বলেন, “আদালতের বয়স দেড়শো ছাড়িয়েছে। মূলত নীল চাষিদের বিচারের জন্য আদালতটি তৈরি হয়েছিল। তখন ছিল খড়ের ছাউনি। গরুর গাড়িতে চড়ে আসতেন বিচারপ্রার্থীরা। রাতে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। গরু রাখার ও খাওয়ানোরও ব্যবস্থা ছিল আদালত চত্বরে।

দেশভাগের সময়ে ও পার বাংলা থেকে বহু মানুষ বনগাঁ শহরে চলে এসেছিলেন। বহু প্রবীণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে ও স্থানীয় ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেল, ১৯৪৯ সালে বাংলাদেশের বাগেরহাটে দাঙ্গার সময়েও দলে দলে মানুষ এখানে আসেন। তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ও পার বাংলা থেকে শরণার্থী হিসাবে সব থেকে বেশি মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্থানীয় বার্মা কলোনি, বিচুলিহাটা, মতিগঞ্জে তাঁদের জন্য শিবির করা হয়েছিল।

প্রবীণ বলেন, “যুদ্ধের পরে অবশ্য শরণার্থী হিসাবে শহরে আশ্রয় নেওয়া সব মানুষ আর ফিরে যাননি। যাঁরা টাকা-পয়সা কিছু আনতে পেরেছিলেন, তাঁরা এখানেই সম্পত্তি কিনে পাকাপাকি বসবাস শুরু করেন।” তিনি জানালেন, অতীতে বনগাঁ দিয়ে কলকাতা-খুলনা রেল চলাচল করত। ট্রেনের নাম ছিল বড়িশাল এক্সপ্রেস। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে তা বন্ধ হয়ে যায়।

দেখুন ভিডিও

’৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালীন বনগাঁ শহরে ভারতীয় সেনারা ক্যাম্প করেছিল। বনগাঁ স্টেডিয়ামে কামান এনে রাখা হয়েছিল। সাঁজোয়া গাড়ি যাতায়াত করত শহরের পথ দিয়ে। আর আকাশ পথে গোঁ গোঁ করে উড়ত যুদ্ধবিমান। তা নিয়ে আতঙ্কে ভুগতেন গাঁয়ের মানুষ। উড়োজাহাজ গেলেই সকলে নিচু হয়ে বসে পড়তেন। সন্ধ্যার পরে কোনও বাড়িতে আলো জ্বালানোর নিয়ম ছিল না।

আইনজীবী দীপাঞ্জয় দত্ত জানান,বনগাঁ শহরের প্রথম হাইস্কুল ছিল বনগাঁ হাইস্কুল। সেটি তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। শহরের একমাত্র কলেজ দীনবন্ধু মহাবিদ্যালয়টিও প্রথমে শুরু হয়েছিল বনগাঁ হাইস্কুলেই। শহরের ঐতিহ্য পাবলিক লাইব্রেরি তৈরি হয়েছিল ১৯১৭ সালে। আজও তা চলছে।

ঐতিহাসিক এই শহর বরাবরই শিল্পচর্চায় উত্‌সাহী। নীলদর্পণ নাটকের স্রষ্টা দীনবন্ধু মিত্র থেকে শুরু করে কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্যচর্চায় বনগাঁর নামকে দেশবাসীর কাছে পরিচিত করেছেন। সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন হাল আমলের শিল্পী-সাহিত্যিকেরাও।

এই শহরের মানুষ আজও গর্ববোধ করেন দীনবন্ধু, বিভূতিভূষণ কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে।” স্থানীয় বাসিন্দা কার্তিক চক্রবর্তী জানান, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই শহরে জন্মগ্রহণ করেননি বা এখানে বসবাসও করতেন না। কিন্তু শহর-সংলগ্ন ছয়ঘড়িয়া এলাকায় রাখালদাসের ছোট ঠাকুরদাদা গৌরহরি বন্দ্যোপাধায়ের বাড়ি ছিল। দুর্গাপুজোর সময়ে রাখালদাস শহরের উপর দিয়েই আসতেন। তা সত্ত্বেও শহরবাসী রাখালদাসকে নিজেদের লোক বলেই মনে করেন।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম কাঁচরাপাড়ার কাছে মামার বাড়িতে। তাঁর পৈতৃক ভিটে ছিল অধুনা গোপালনগরের বারাকপুর গ্রামে। বিভূতিভূষণ বনগাঁ হাইস্কুলে লেখাপড়া করেছেন। প্রথমে পায়ে হেঁটে স্কুলে এলেও পরে স্থানীয় খেলাঘর মাঠের কাছে ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করতেন। শহরে মন্মথনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে তিনি সাহিত্যপাঠের আসরে আসতেন। যা খ্যাত ছিল লিচুতলা ক্লাব নামে। ইছামতী নদীর নামে তিনি উপন্যাসও লিখেছেন। পথের পাঁচালি উপন্যাসের কিছুটা অংশ তিনি ইছামতীর পাড়ে বসেই লিখেছিলেন বলে জানা যায়। দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম বনগাঁ মহকুমার চৌবেড়িয়া গ্রামে। তাঁর লেখা ‘নীলদর্পণ’ তো গোটা দেশে শোরগোল ফেলেছিল। তা ছাড়াও বিয়ে পাগলা বুড়ো, লীলাবতী-সহ বহু নাটক লিখেছেন দীনবন্ধু। সাহিত্যিক মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, শঙ্কর নামেই যিনি বাংলা সাহিত্যে চিরকালীন জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁরও জন্মভিটে বনগাঁয়।

বনগাঁ শহর থেকে নিয়মিত বহু লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হয় কয়েকটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রও। আর দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে এই শহর থেকে যত পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়, তা সম্ভবত রাজ্যের আরও কোনও প্রান্তে দেখা যায় না। পুজো উদ্যোক্তারাও ভাল মানের স্মরণিকা প্রকাশ করেন, যা সাহিত্য পত্রিকার আকার নেয়।

অতীতে নিয়মিত নাটক ও যাত্রা উত্‌সব হত শহরে। এখন সেই রমরমা নেই। বনগাঁ নাট্যচর্চা কেন্দ্র এখন বছরে একটি করে নাট্য উত্‌সব করে। হারিয়ে গিয়েছে কথক-এর মতো বহু নাট্যদল। রক্তকরবী ও বনগাঁ বিদর্ভ নামে কয়েকটি সংস্থা মাঝে মধ্যে নাটক মঞ্চস্থ করে। অতীতে ট’বাজারের ব্যবসায়ীরা নিয়মিত যাত্রা চর্চা করতেন। এখন তা অনিয়মিত।

বনগাঁর জ্ঞান বিকাশিনী সঙ্ঘের মাঠ, এমএস ক্লাবের মাঠ, ২ নম্বর রেলগেঠ এলাকায় দোলের মাঠে বিখ্যাত যাত্রা দলকে নিয়ে পালা হত। অতীতে পূর্বপাড়াতেও নিয়মিত যাত্রা চর্চা হত। ওই এলাকারই বাসিন্দা কানাই নাথ যাত্রা পালাকার হিসাবে গোটা রাজ্যে নাম করেছিলেন। প্রয়াত হয়েছেন তিনি। মোট ৭২টি যাত্রা পালা লিখেছিলেন কানাইবাবু। ‘আমি মা হতে চাই’ পালার জন্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন। চণ্ডীতলার মন্দির যাত্রার জন্য রাজ্যের শ্রেষ্ঠ পালাকারের সম্মান পেয়েছিলেন।

এক সময়ে বহু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসর বসত বনগাঁয়।
বনগাঁয় আগে নিয়মিত বসত সাহিত্য পাঠের আসর। সাধুজন পাঠাগার ও দৈনন্দিন প্রেসে সাহিত্যের আড্ডায় ভিড় করতেন কত না মানুষ। সে সব আজ অতীত।

বিশ্বনাথ মৈত্রর নাটক ‘শিবের দেহত্যাগ’ এক সময়ে গোটা রাজ্যে সাড়া ফেলেছিল।

কবিতা আশ্রম পত্রিকা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিককে স্মরণ করতে অনুষ্ঠান করা হয়। এবং অন্যকথা পত্রিকা গোষ্ঠী বছরে একটি সাহিত্য সম্মান প্রদান অনুষ্ঠান করে। অতীতে শিস পত্রিকার উদ্যোগে বড় বড় সাহিত্যভিত্তিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত।

বনগাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজ অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন। অথচ নীল বিদ্রোহের অন্যতম নেতা দিগম্বর বিশ্বাসের স্মৃতিবিজড়িত কুঠিবাড়ি, ইছামতী নদীর তীরের প্রাচীন জনপদ এবং দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী আশ্রয়ের বড় ঐতিহাসিক পটভূমি এই শহরে রয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই গৌরবোজ্জ্বল অতীত আজ ম্লান।

Tags: জেলা

একটি মন্তব্য করুন

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলি আবশ্যক *

Home Language Gallery e-Paper
Menu
© 2026 Desher Samay.

Select Language

ভাষা নির্বাচন করুন