দেশের সময়, কলকাতা: রেশন দুর্নীতিতে গ্রেফতার তৃণমূল নেতা শঙ্কর আঢ্যর সংস্থা ‘আঢ্য ফরেক্স প্রাইভেট লিমিটেডে ‘র বিরুদ্ধে ফরেন এক্সচেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট অর্থাৎ ‘FEMA’ আইনে মামলা রুজু করেছে ইডি।

তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন,  নগদে সংস্থার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে রয়েছে ২৭০০ কোটি টাকা। এবং সেই টাকা গত ২-৩ বছরে নগদে অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে।  মারকুইস স্ট্রিটে এই সংস্থার অফিসের ব্যাঙ্ক ডিটেইলস খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন,  আঢ্য ফরেক্সের অ্যাকাউন্টে যে নগদ টাকার হদিশ মিলছে,  সেটা বিদেশি মুদ্রা। মূলত ডলার এবং ইউরোতে পরিবর্তন করা হয়েছে।

আঢ্য ফরেক্সের খাতায় কলমে ডিরেক্টর হচ্ছেন দু’জন। মলয় আঢ্য যিনি শঙ্করের ভাই, ও বছর আশির মা শিবানি আঢ্য।  তবে সংস্থার কর্মীদের বয়ান অনুযায়ী, এই কোম্পানি চালান শঙ্কর আঢ্যই। ইডি আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, এই টাকার উৎস কী, তা নিয়ে কিছু স্পষ্ট জানাতে পারেননি শঙ্কর আঢ্য।

FEMA আইন অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রা কনভার্ট করলে, পাসপোর্টের ডিটেল বা ভ্রমণকারীর ডিটেইল জমা করতে হয়। অভিযোগ, শঙ্কর আঢ্য আইনের তোয়াক্কা না করে এই সব কিছু না উল্লেখ করেই বিদেশি মুদ্রায় পরিবর্তন করেন। পারিপার্শ্বিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই গোটা টাকাটাই রেশন দুর্নীতির টাকা। সেই টাকায় রূপান্তরিত করা হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রায়। তা পাচার করা হয়েছে বিদেশে।

রেশন দুর্নীতিতে শঙ্কর আঢ্যকে গ্রেফতার করার পর তাঁর স্ত্রী দাবি করেছিলেন, এক ইডি আধিকারিক নিয়ে ব্যাগ থেকে কাগজ বার করে দেখিয়েছিলেন, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক শঙ্করের নাম করেছেন। যদিও শঙ্কর আঢ্য দাবি করেছেন, “জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের কাছ থেকে ১০০ টাকাও নিই নি। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের সঙ্গে যদি এতই ভাল সম্পর্ক থাকত, তাহলে আমাকে পৌরসভায় টিকিট দিলেন না কেন?”

অন্যদিকে, রেশন দুর্নীতির তদন্ত যত এগিয়েছে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে আসছে। ইডি-র দাবি, শুধু সরকারের ধান কেনার টাকা থেকেই কমিশন নিয়ে প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কোটি-কোটি টাকা লাভ করেছেন। ৫ বছরে কমিশন বাবদ ১৩৭ কোটি টাকা ঢুকেছে বালুর পকেটে। এমনটাই বলছে এজেন্সি।

শুক্রবার মধ্যরাতে গ্রেফতার হন বনগাঁ পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান শঙ্কর আঢ্য। শনিবার তাঁকে নগর দায়রা আদালতে পেশ করে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। ইডির দাবি, রেশনে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, প্রাথমিক তদন্তে ইডি জানতে পেরেছে সরকারি ন্যায্য মূল্যে ধান কেনার কমিশন হিসাবে প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রীর পকেটে ঢুকেছে কয়েকশো কোটি টাকা।

সরকারি তথ্য বলছে, পাঁচ বছরে (২০১৬-২০২১) সরকার ৬ কোটি ৮২ লক্ষ ৯০ হাজার ৪৪০ কুইন্টাল ধান কিনেছে। ইডি সূত্রে খবর,কুইন্টাল প্রতি ২০ টাকা কমিশন নিতেন প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী। হিসাব বলছে, কুড়ি টাকা হিসাবে কমিশনের অঙ্ক ১৩৭ কোটি টাকা। ইডির অভিযোগ, সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি ধান কেনা হয়েছে। এখন প্রশ্ন, এই পাঁচ বছরেই যদি ১৩৭ কোটি টাকা বালুর পকেটে ঢোকে তাহলে গত দশ থেকে বারো বছরে কমিশনের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি।

উল্লেখ্য, রেশন বণ্টন দুর্নীতি মামলায় জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক গ্রেফতারের পর নাম জড়ায় এই শঙ্কর আঢ্যর। ইডির দাবি, এসএসকেএম এ বসে বালু তাঁর মেয়ে প্রিয়দর্শিনী মল্লিককে চিঠি লিখেছিলেন টাকা সংক্রান্ত বিষয়ে। সেই চিঠিতেই নাম ছিল শঙ্করের বলে দাবি এজেন্সির। এরপরই শুক্রবার মধ্যরাতে গ্রেফতার হন শঙ্কর আঢ্য ওরফে ডাকু।

ইডি-র তদন্তেশঙ্কর এবং তাঁর আত্মীয়দের সূত্রে ছ’টি সংস্থার নাম উঠে এসেছে ইডির সামনে। তার মধ্যে রয়েছে একটি আইসক্রিমের কারখানাও। শঙ্করের পরিবারের সদস্যদের নামে ওই সংস্থা রয়েছে।

বনগাঁর প্রাক্তন পুরপ্রধান শঙ্কর আঢ্যকে আদালতে হাজির করিয়ে ইডি জানিয়েছে ফরেক্স সংস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিদেশি মুদ্রায় পরিবর্তন করে দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে। তাদের দাবি, প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাঠানো হয়েছে। ইডির নজরে রয়েছেন শঙ্করের আত্মীয়েরাও। কেন্দ্রীয় সংস্থা সূত্রে খবর, শঙ্কর ছাড়াও তাঁর আট জন আত্মীয়ের নামে বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে, যেগুলি টাকা পাচারের সঙ্গে যুক্ত।

শঙ্কর এবং তাঁর আত্মীয়দের সূত্রে ছ’টি সংস্থার নাম উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে ইডি সূত্রে। তার মধ্যে শঙ্করের নামে একটিমাত্র সংস্থা রয়েছে, যার নাম ‘এসআর আঢ্য ফিন্যান্স প্রাইভেট লিমিটেড’। তাঁর স্ত্রীর নামও রয়েছে ওই সংস্থায়। এ ছাড়া শঙ্করের স্ত্রী জ্যোৎস্নার নামে রয়েছে ‘অর্পণ ফরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে আরও এক সংস্থা। শঙ্করের পুত্র শুভ আঢ্যের নামে সংস্থাটির নাম ‘শঙ্কর ফরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড’।

শঙ্করের কন্যার নাম ঋতুপর্ণা আঢ্য। তাঁর নাম রয়েছে ‘অর্পণ ফরেক্স’-এ।

শঙ্করের ভাই মলয় আঢ্যের নামে ফরেক্স সংস্থা ছাড়াও রয়েছে একটি আইসক্রিম কারখানা। যার নাম ‘অঞ্জলি আইসক্রিম প্রাইভেট লিমিটেড’। ওই সংস্থায় নাম রয়েছে মলয়ের স্ত্রী তানিয়া আঢ্যেরও। ইডি যখন বনগাঁয় শঙ্করের বাড়িতে তল্লাশি চালাতে গিয়েছিল, আধিকারিকেরা মলয়ের এই আইসক্রিম কারখানাতেও তল্লাশি চালান।

মলয়ের নামে যে ফরেক্স সংস্থাটি রয়েছে, তার নাম ‘আঢ্য ফরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড’। সেখানে শঙ্করের মা শিবানী আঢ্যও রয়েছেন।

শঙ্করের শ্যালক অমিত ঘোষ। তিনি যুক্ত আছেন ‘শঙ্কর ফরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সঙ্গে। এ ছাড়া, মলয়ের স্ত্রী তানিয়ার নামে ‘ত্রিনয়নী ফরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে আরও একটি সংস্থার কথা জানা গিয়েছে।

ইডির দাবি, রেশন ‘দুর্নীতি’র টাকা ধৃত মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের কাছ থেকে শঙ্করের এই সমস্ত সংস্থায় আসত এবং সেখান থেকে বিদেশি মুদ্রায় পরিবর্তন করে ওই টাকা দুবাইতে পাঠানো হত। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সরাসরি, কখনও আবার বাংলাদেশের মাধ্যমে টাকা দুবাই পৌঁছত। জ্যোতিপ্রিয়ের গ্রেফতারির পর শঙ্কর তাঁর সঙ্গে হাসপাতালে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগও করেছেন বলে দাবি ইডির। ওই চিঠি কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে এসেছে। সেখানে একাধিক নাম রয়েছে বলে আদালতে জানিয়েছেন আধিকারিকেরা। চিঠির বয়ান বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায়।

ইডি সূত্রে খবর, মলয় এবং শিবানীর ‘আঢ্য ফরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড’-এর একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এই সংস্থা তাই বিশেষ ভাবে ইডির নজরে রয়েছে। এই সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারী আধিকারিকেরা। আদালতে শঙ্করের ৯০টি ফরেক্স সংস্থার কথা জানিয়েছে ইডি। যদিও তাঁর আইনজীবীর দাবি, শঙ্কর বিদেশি মুদ্রা কেনাবেচার বৈধ ব্যবসা করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here