তিলোত্তমা খুন ধর্ষণের এক বছর। সুবিচারের অপেক্ষায় আজও বসে পরিবার। রাজপথে ফের গর্জন। আজ, শুক্রবার আরও একবার রাতদখলে নামলেন WBJDF। কলেজ স্কোয়ার থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত মশাল হাতে মিছিল করলেন তাঁরা। শহরতলি জেলাতেও প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
রাত যত গড়িয়েছে, ততই জমাট বেঁধেছে শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড়ে মানুষের ভিড়। হাতে মশাল, গলায় প্ল্যাকার্ড, চোখে জেগে থাকা ক্ষোভ আর দুঃখ— এক বছরের অপেক্ষা আর ন্যায়বিচারের আশাভঙ্গই যেন এ রাতের প্রধান প্রেরণা ।
গত বছরের মতো, এবারও মিছিলে পা মেলাতে দেখা গেল অভিনেত্রী দেবলীনা। কেন গত বছরের মতো এবছর বিনোদন জগতের সেভাবে কাউকে রাতজাগাতে দেখা গেল না, এই প্রশ্নের উত্তরে দেবলীনা বলেন, “আমাদের বহু সতীর্থ কেন আজ মিছিলে পা মেলালেন না, সেটা একেবারেই তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু বহু সতীর্থের সঙ্গে আমারও ব্যক্তিগতভাবে কথা হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, তাঁরা কর্মক্ষেত্রে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন, সেটাই মূলত কারণ।”
ঠিক এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ৮ অগস্টের রাতে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের চার তলার সেমিনার হলে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় এক তরুণী চিকিৎসক ছাত্রীর দেহ। ময়নাতদন্তে উঠে আসে ভয়ঙ্কর তথ্য— ধর্ষণের পর খুন। সেই রাতের পর কেটে গিয়েছে বারোটি মাস। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, ‘সঞ্জয় রায় ছাড়া বাকি অভিযুক্তরা এখনও অধরা, ফলে বিচারের কোনও স্পষ্ট আলোকপাত হয়নি এখনও’।
এই ন্যায়বিচারের দাবিতেই শনিবার রাতে কলেজ স্কোয়ার থেকে মশাল মিছিল শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্ট (WBJDF)। শেষ গন্তব্য— শ্যামবাজার মোড়। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা গলা মেলাচ্ছেন প্রতিবাদের স্লোগানে— “তিলোত্তমার বিচার চাই”, “ধামাচাপা নয়, বিচার হোক”, “নিরাপত্তাহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানি না, মানব না!”
শুধু চিকিৎসকরাই নন, সেই মিছিলে পা মিলিয়েছেন ছাত্র, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সবার মুখে এক রা, “আর চুপ করে থাকা নয়। ন্যায়ের দাবিতে শহরকে জাগতেই হবে।”
চিকিৎসক অনিকেত মাহাত বলেন, “এক বছর কেটে গিয়েছে, সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, আজও পরিষ্কার নয়। তদন্ত চলছে— এই কথা বলে আর কতদিন চালানো যাবে?”
তার সহকর্মী আসফাকুল্লা নাইয়ারের স্পষ্ট বক্তব্য, “এই লড়াই কোনও রাজনৈতিক দলের নয়। এটা তিলোত্তমার, এটা সমাজের, এটা আমাদের সকলের। খুন-ধর্ষণের প্রতিবাদে একসঙ্গে রাস্তায় না নামলে, আগামী প্রজন্মও সুরক্ষিত থাকবে না।”
রাতভর চলবে এই অবস্থান কর্মসূচি। রয়েছে প্রতিবাদী গান, আলোচনাসভা এবং রবিবার সকাল থেকে রাখীবন্ধন কর্মসূচির প্রস্তুতিও। আন্দোলনকারীরা জানাচ্ছেন, “তাঁদের দাবি যতদিন পূরণ না হচ্ছে, ততদিন এই আন্দোলন চলবেই”।
সব মিলিয়ে, ৮ অগস্টের এই রাত যেন শুধু একটা ঘটনার বার্ষিকী নয়— এটা এক অসমাপ্ত বিচারের বিরুদ্ধে সমবেত চিৎকার, এক বছরের জমে ওঠা ক্ষোভের মশাল। অন্যদিকে শ্যামবাজার মোড়ে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ।
এদিকে, আগামীকাল নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছে নবান্ন অভিযান। তাতে উপস্থিত থাকবেন নিহত চিকিৎসকের মা-বাবাও। এদিন রাতে অভয়ার বাবা বলেন, “আগামীকাল পতাকাবিহীন নবান্ন অভিযানকে ভয় পাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাই পুলিশ দিয়ে অভিযান ঠেকানোর চেষ্টা হচ্ছে।” তৃণমূল বাদে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই অভিযানে সামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তবে এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর হুঁশিয়ারি, “নবান্ন অভিযানে কারও গায়ে পুলিশ হাত তুললে, গোটা রাজ্য ৭২ ঘণ্টার জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া হবে।”
পাল্টা হিসেবে বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এই আন্দোলনের (নবান্ন অভিযানের) পিছনে স্পষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে। বিজেপির পরিচালিত এক কর্মসূচি।”
এদিকে পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, তাদের কাছে কোনও সংস্থা বা সংগঠন নবান্ন অভিযানের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেনি। তবু পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৈরি রয়েছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই নবান্নের আশপাশে কড়া নিরাপত্তা ও ব্যারিকেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।



