নেপালে প্রকৃতির ধ্বংসলীলা, নিখোঁজ ৩০০ ভারতীয়, জানালেন সেখানকার বিদেশমন্ত্রী
deshersamay

নেপালের হড়পা বানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম! তেমনই একটি গ্রামের ভয়াবহ পরিণতির দৃশ্য ধরা পড়ল হেলিকপ্টার থেকে ক্যামেরাবন্দি করা ভিডিয়োয়। সেই ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। ভাইরাল হয়েছে ভিডিয়োটি। যদিও সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি দেশের সময় ডট কম।

“কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুছে গেছে একের পর এক শহর,” নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের (flash flood) প্রাথমিক পরিস্থিতি তুলে ধরে এমনই জানালেন সে দেশের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল। কাঠমান্ডুতে আয়োজিত এক বেসরকারি সংস্থার সামিটে তিনি বলেন, ‘রসুয়া অঞ্চলের বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ।’ যদিও ১৬৫ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত।

বৃহস্পতিবারের বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। নেপাল সরকারের প্রাথমিক হিসাবে কয়েক হাজার পরিবার ঘর হারিয়েছে। বহু মানুষের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। খানাল জানান, বিপর্যয়ের পূর্ণ মাত্রা এখনও নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে কাজ করছে প্রশাসনের পাশাপাশি উদ্ধারকারী দল। তবে ধ্বংসস্তূপ, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে উদ্ধারকাজে বেগ পেতে হচ্ছে।

এই বিপর্যয়ে ভারতীয় নাগরিকদের নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। নেপালের বিদেশমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ ভারতীয় (Indian nationals) এখনও নিখোঁজ। তাঁদের অধিকাংশই কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় (Mansarovar Yatra) গিয়েছিলেন।

BREAKING: At least 380 people missing after flash flood hits near Nepal-Tibet border pic.twitter.com/iCRpXJaBAe
— BNO News Live (@BNODesk) August 26, 2026
রসুয়া দিয়ে কৈলাস-মানস সরোবরের পথে বহু বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী যাতায়াত করেন। হড়পা বানের সময় সেই পথেই ছিলেন ভারতীয়রা। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছে নেপাল সরকার।

খানাল বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার জন্য বিদেশি নাগরিকেরা নিয়মিত যাতায়াত করেন। তাঁদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যাই বেশি। নিখোঁজ ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।’
বানের জেরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে রসুয়া-সহ সীমান্তবর্তী এলাকায়। নদীর জল এবং ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ভেসে গিয়েছে বসতি, সেতু ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বহু এলাকার চেহারা বদলে গিয়েছে।

প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, নিখোঁজদের খুঁজে বের করা। একই সঙ্গে দুর্গত পরিবারগুলির কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে।
নেপাল সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব রকমের সরকারি সম্পদ কাজে লাগানো হচ্ছে। তবে বিপর্যয়ের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির ছবি এখনও পুরোপুরি সামনে আসেনি। উদ্ধারকাজ এগোলে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য মিলতে পারে।
🚨 Nepal’s devastating floods are a warning the world cannot ignore.#WATCH Aerial footage shows the horrific aftermath as entire roads, bridges and buildings have been swallowed by floodwaters.
— War Updates FC (@k_c_shivansh) August 26, 2026
At least 97 people have been killed, while 403 people from 27 countries remain… pic.twitter.com/TAZ3cAtQRR
হড়পা বানে বিপর্যস্ত এভারেস্টের দেশ। চিন এবং নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্দে নদীর তীর থেকে বিশাল আকারের কাদা এবং ধ্বংসস্তূপ খসে পড়ার ফলে এই ভয়াবহ হড়পা বানের সৃষ্টি হয়। তীব্র স্রোত ভোটকোশী এবং ত্রিশূলী নদীর গতিপথের গ্রাম এবং শহরগুলোর ওপর আছড়ে পড়ে। বহু ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে যায় নিমেষে। নেপাল এবং তিব্বতের হিমালয়-সংলগ্ন সীমান্ত অঞ্চলে সেই হ়ড়পা বানে অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর। ২৯১ বিদেশি-সহ অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটকের কোনও খোঁজ মিলছে না। তাঁদের মধ্যে ১৪১ জন ভারতীয় (৩৭ অনাবাসী-সহ)।
নেপালের পর্যটন মন্ত্রকের মতে, নিখোঁজ হওয়া অন্যদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকার নাগরিকেরাও রয়েছেন। তাঁদের খোঁজে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। ভারতের কিছু এলাকাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সীমান্তের উভয় প্রান্তের কর্মকর্তারা বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এবং উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের বিভিন্ন জেলায় বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

নেপালে উদ্ধারকাজ চলাকালীন আকাশ থেকে ক্যামেরাবন্দি একটি ভিডিয়োয় ভয়াবহ পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে। সেখানে দেখা গিয়েছে, হড়পা বানে নেপালের একাধিক গ্রাম এখন কেবল কাদামাখা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেই ভিডিয়োই প্রকাশ্যে এসেছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রেসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)’-এর নেপাল শাখার প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘‘অনেক গ্রাম এবং বাজার এলাকা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।’’

আকাশপথে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে অনেককে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে নেপালি সেনাবাহিনী। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নদীর তীরে বসবাসরত বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগকবলিত এলাকায় বন্যার জলে বহুতল ভবনগুলিও তলিয়ে যাওয়ার কারণে উদ্ধারকর্মীরা বেঁচে যাওয়া মানুষদের সন্ধানে কাদা ও পলি ঘেঁটে চলেছেন।
নেপালে হড়পা বানের ভয়াবহতা ফুটে ওঠে বেশি কিছু ছবি এবং ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। নেপালি পুলিশের শেয়ার করা ছবিতে দেখা গিয়েছে, নদীর প্রবল স্রোত ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত চলা মৌসুমি বৃষ্টিপাত দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে প্রায়শই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির ঘটনাগুলোর হার এবং তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঠমান্ডু-ভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি)’-এর জলবায়ু এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বিষয়ের প্রধান কিয়াংগং ঝাং দ্বিতীয় বার বন্যা হওয়ার আশঙ্কার বিষয়েও সতর্ক করেছেন।

অন্য দিকে, চিনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তিব্বত সীমান্তের গিরং এলাকাতেও ভূমিধসের ঘটনায় প্রাণহানির খবর জানিয়েছে। ভূমিধসের কারণে তিন জন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
