নেপাল বিপর্যয়: নিখোঁজ ১০৫ ভারতীয়, আচমকা এই বিপর্যয়ের কারণ কী? জরুরি বৈঠকে সরকার
deshersamay
ভয়াবহ হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপালে নিখোঁজ ১০৫ জন ভারতীয়-সহ বহু বিদেশি পর্যটক। স্থানীয় সংবাদ সংস্থা সূত্রে দাবি, খোঁজ মিলছে না হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষের। নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন ৪১ জন পুলিশ কর্মী ও ১৪ জন শুল্ক দপ্তরের কর্মীও।

হড়পা বানে প্লাবিত একাধিক গ্রাম, ধসে তলিয়ে গিয়েছে রাস্তা ও সেতু। নূয়াকোট এবং ধাদিং জেলা থেকে এ পর্যন্ত অন্তত আট জনের দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা (Nepal Flood) ছড়িয়ে পড়েছে বহু দূরে। জলপ্রবাহের টান ও ধসে নিখোঁজ অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটক, যাঁদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন ।

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বন্যাকবলিত অঞ্চল থেকে নিখোঁজ ৩৮৪ জনের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক (Nepal News) রয়েছেন। নিখোঁজ বিদেশিদের তালিকায় বড় অংশই ভারতীয়। এ দিকে রসুয়া জেলায় উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ দিতে গিয়ে বিপর্যয় মোকাবিলা দল নিজেরাই বিপদে পড়েছে। অন্তত ২৬ জন নেপাল পুলিশ কর্মী এবং আর্মড পুলিশ ফোর্সের (এপিএফ) ৭ জন জওয়ানের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাকে ময়দানে নামানো হয়েছে। আকাশপথে নজরদারি ও নিখোঁজদের উদ্ধারে নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও বিশেষ দুর্যোগ মোকাবিলা দল মোতায়েন করেছে।

উজান থেকে নেমে আসা জলরাশি নেপালের পাহাড়ি এলাকার বিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে ছারখার করে দিয়েছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (এনইএ) জানিয়েছে, বানের ধাক্কায় তাদের অন্তত ছয়টি প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সাবস্টেশন মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলির তালিকায় রয়েছে—

রসুওয়াগড়ি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প
চিলিমে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র
ত্রিশূলী ৩এ
ত্রিশূলী ৩বি হাব ২২০ কেভি সাবস্টেশন
ত্রিশূলী হাইড্রো পাওয়ার স্টেশন
দেবীঘাট হাইড্রো পাওয়ার স্টেশন
বিদ্যুৎ উৎপাদন, বণ্টন ও সঞ্চালন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় বিশাল অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভূমিধস ও জল জমার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে একাধিক জাতীয় সড়ক।

জরুরি বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর, নেপথ্যে আবহাওয়া পরিবর্তন
নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র ডিআইজি অবিনারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের অবিলম্বে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিপর্যয়ের গভীরতা পর্যালোচনা করতে ‘ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’-র জরুরি বৈঠক ডেকেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। সামাজিক মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী জানান, রেড ক্রস, স্কাউট এবং বিশেষ চিকিৎসক দলকে সমন্বিত ভাবে উদ্ধারকাজে নামানো হয়েছে।

কেন ঘটল এই আকস্মিক বন্যা?
স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েকদিনে তেমন বৃষ্টি হয়নি উত্তর নেপালে। এমনকী, রাসুয়ায় এ দিন সকালেও ছিল রোদ ঝলমলে আবহাওয়া। তার মধ্যেই কোনও আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই তিব্বত থেকে নেমে আসা বিপুল জল ও কাদার স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় রাসুয়া-সহ উত্তর নেপালের একাধিক জেলা। প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে রাসুয়া জেলার প্রায় এক ডজন গ্রাম। প্রাথমিক ভাবে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, রাসুয়ায় বড় ধরনের বৃষ্টিপাতের কারণে এই বন্যা হয়নি। স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে তিব্বতের দিকে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছিল। তার জেরে বাঁধ ভেঙে যায়। সেই বাঁধ ভাঙা বিপুল পরিমাণ জল ও কাদামাটির স্রোত হঠাৎ ভোতেকোশি নদীতে ঢুকে পড়ে এবং ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। তবে এ ছাড়া কোনও হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে জল নেমে এসেছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
নেপালে বর্ষাকালে পাহাড়ি এলাকায় হড়পা বান ও ভূমিধস নতুন ঘটনা নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। অতীতে নেপালের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় হড়পা বান ও হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণের জেরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের বর্ষায় প্রতি বছরই বন্যা ও ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। তবে পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অতিপ্রাকৃতিক দুর্যোগ ও হড়পা বানের মাত্রা আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নেপালের বন্যার পূর্বাভাস বিভাগ জানিয়েছে, ধাদিংয়ের গলছি এলাকায় পর্যন্ত নদীর জলস্তর বেড়ে উঠেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্যার জল মুগলিন অতিক্রম করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। তাই ওই এলাকাতেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে পৃথ্বী হাইওয়ে এবং মুগলিন-নারায়ণঘাট সড়কে যাতায়াত এড়িয়ে চলার অনুরোধ করা হয়েছে।
এই ঘটনার খবর আসার পরেই তড়িঘড়ি মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। বর্তমানে উদ্ধারকাজে নামানো হয়েছে নেপাল সেনার হেলিকপ্টার। নেপালের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য নেপালি সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং নেপাল পুলিশকে মোতায়েন করেছে এবং অন্যান্য জেলা থেকেও অতিরিক্ত কর্মী পাঠানো হচ্ছে। এ ছাড়া উদ্ধারকাজে নেমেছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। সহায়তার জন্য চিকিৎসা দল, স্কাউট ও রেড ক্রসকে নেপাল সরকারের তরফে অনুরোধ করা হয়েছে। আরও অ্যাম্বুল্যান্স ও চিকিৎসা কর্মী মোতায়েন করা হচ্ছে। অন্যদিকে, চালু করা হয়েছে জরুরি হেল্পলাইন নম্বর।

নেপালের এই বিপর্যয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখনও অজানা রয়ে গিয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্টে ক্ষয়ক্ষতির ছবি ভয়াবহ হলেও ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে বা কতজন নিখোঁজ, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের পরই হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হবে। আপাতত উদ্ধার ও ত্রাণকাজকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে সরকারের তরফে এখনও কোনও নিশ্চিত কারণ জানানো হয়নি। জনসাধারণের সম্পত্তি ও সরকারি প্রকল্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও অজানা।

