সৃজিতা শীল

দেশের সময় টানা প্রায় দেড় মাস নির্বাচনী প্রচারে রয়েছে তিনি। ছুটে যাচ্ছেন একের পর এক জেলায়। পরনে সেই চেনা সাজ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। নীল বা সবুজ পাড়ের সাদা শাড়ি, পায়ে হাওয়াই চটি। এই চেনা বেশেই আপামোর জনগণ দেখে এসেছেন তাঁকে। শুক্রবার, ঝাড়গ্রামের জনসভাতেও তার অন্যথা হয়নি। তবে মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বিপত্তি। হঠাৎ, তাঁর হাওয়াই চটি ছিঁড়ে যায়। সভার মাঝেই নিজেই চটিতে সেফটি পিন লাগিয়ে ফের সভা চালিয়ে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

শুক্রবার দুপুরে ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুর বিধানসভার অন্তর্গত গজাশিমুলে জনসভা করেন মুখ্যমন্ত্রী । ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী কালিপদ সোরেনের সমর্থনে জনসভা করেন তিনি। সেখানেই সভার মাঝে হাওয়াই চটি ছিঁড়ে যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। নিজেই সেফটি পিন দিয়ে সেলাই করলেন জুতো।

একসময় বোমা-গুলি বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে থাকত জঙ্গলমহলের বাতাস। দিনে রাতে পড়ত লাশ। অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল লালগড়-সহ সমগ্র জঙ্গলমহল। পালা বদলের বাংলায় সেই জঙ্গলমহলে শান্তি ফিরেছে।

শুক্রবার ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুরের গজাশিমূল ময়দানে তৃণমূল প্রার্থী কালীপদ সরেনের সমর্থনে নির্বাচনী সভা থেকে সেই প্রসঙ্গ টেনে এনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “একসময যারা সিপিএমের হার্মাদ ছিল, তারাই এখন বিজেপি। জঙ্গলমহলে ওদের ঢুকতে দেবেন না। ওরা এলে আবার মা-বোনেদের কাঁদাবে। আবার গুলি ছুটবে। সব কিছু অশান্ত করে দেবে।”
মনে করিয়েছেন, “মনে আছে জঙ্গলমহলের গল্প, পিঁপড়ের ঝোল খেয়ে মানুষ বেঁচে থাকত। আমি গিয়েছিলাম বেলপাহাড়ির জো গ্রামে। লুকিয়ে একটা স্কুটারে করে গিয়ে দেখেছিলাম, মানুষ কত কষ্টে জীবন নির্বাহ করেন।”

মুখ্য়মন্ত্রী এও বলেন, “যতদিন আমি রয়েছি ততদিন আদিবাসীদের কোনও অধিকার কেড়ে নিতে দেব না। জঙ্গলমহলের শান্তিও কাউকে নষ্ট করতে দেব না।”

কীভাবে, কার হাত ধরে তাঁর জঙ্গল মহলে প্রবেশ এদিন সেকথাও জানান তৃণমূল নেত্রী।

মমতা বলেন, “সেটা ২০০৮ সাল। বাম জমানা। তখন ভয়ে কেউ জঙ্গলমহলে আসত না, তখন কিন্তু আমি এসেছি। ছত্রধর মাহাতোর হাত ধরে আমি প্রথম জঙ্গলমহলে ঢুকছিলাম। পিড়াকাটা, ভাদুতলায় আমাকে বহুবার আটকানো হয়েছে। তবু আমি থামিনি।”

দেড় দশক আগের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “লালগড়ে ছিতামনি মুর্মুর কান কেটে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় গুলিতে তিনজন মারা গিয়েছিল। তখন থেকেই আমার জঙ্গলমহলে আসা।”

কৈফিয়তের সুরে মমতা এও বলেন, “তাই অন্য অনেকের থেকে জঙ্গলমহল আমি অনেক ভাল বুঝি। তাই সরকার গড়ার পর প্রথম মিটিংটাও এই জঙ্গলমহলে করেছিলাম। ওই মঞ্চ থেকেই মাওবাদীদের অস্ত্র ছেড়ে সমাজের মূলস্রোতে ফেরার আহ্বান জানিয়েছিলাম।”

ঝাড়গ্রামে এবারে যিনি বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন তিনি পেশায় সরকারি চিকিৎসক। চাইলে প্রশাসনিক ক্ষমতা বলে তাঁর ছাড়পত্র আটকে দিতে পারতেন, একথা জানিয়ে মমতা বলেন, “সেটা করিনি। কারণ, যার বেশি লোভ সে টাকা করে আসুক।”

এরপরই জঙ্গলমহলের মানুষের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়েছেন, “এলাকায় ডাক্তার নেই। উনি ভোটে লড়লে ডাক্তারি কে করবে? মানুষ পরিষেবা কোথায় পাবেন?’’ 

মঞ্চে তাঁর বক্তৃতা শেষের পর একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় প্রতিটি সভাতেই। বক্তব্য শেষের পর তিনি লক্ষ্য করেন, তাঁর পায়ের চটি ছিঁড়ে গিয়েছে। মঞ্চ থেকেই অন্যান্য সহকর্মীদের তিনি বলেন, ‘এবার খালি পায়ে যাব নাকি? একটা সেফটি পিন জোগাড় করো।’ মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা প্রথমে তোড়জোড় শুরু করেন নতুন জুতো আনার। কিন্তু সেটাতেও সময় লাগবে।

এরপর তিনি নিজেই বলেন, ‘ইন্দ্রনীল তুমি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু করো। আমি জুতোতে সেফটি পিন লাগিয়ে নিচ্ছি। আসলে ওর দোষ কিছু নেই। জুতোর যা আয়ু তার থেকে বেশি হেঁটে ফেলেছি।’ এরপর তাঁকে মঞ্চতেই দেখা যায় নিজের জুতো খুলে সেফটি পিন লাগিয়ে নিতে। মঞ্চের মাঝেই চেয়ারে বসে জুতো ঠিক করে নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।

এদিনের সভায় হাজির ছিলেন মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করেই দেখলাম, ওঁর চটি ছিঁড়ে গিয়েছে। তারপর উনি নিজেই সেফটি পিন দিয়ে সেটা সেলাই করে নিলেন। আমরা গর্বিত, যে ওঁর মতো মানুষের সৈনিক হতে পেরেছি। আমি অনেক মন্ত্রী, নেতাদের দেখেছি, আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর মতো মানুষ আর হয় না।’ উনি অতি সাধারণ একজন মানুষ, সাধারণ মানুষের মতোই চালচলন তাঁর, আজকের ঘটনাতেই সেটা প্রমাণ পেল আরেকবার, বলে জানান বীরবাহা ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here