সরকারি ব্যাঙ্কগুলি গত ১০ বছরে কত টাকা ঋণ মকুব করেছে? যদি করে থাকে, তাহলে সামনে আনা হোক অন্তত গত পাঁচ বছরের তথ্য। কোন সরকারি ব্যাঙ্ক কোন বছরে কত টাকা ঋণ মকুব করেছে? কেন এ ভাবে মকুব করা হয়েছে ঋণ? এমনই একগুচ্ছ প্রশ্ন সরকারের কাছে রেখেছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ২২ জুলাই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধরী।
গত ১০ বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি মিলিয়ে মোট ১২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি ঋণ মকুব করেছে ।
রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্নের উত্তরে এই তথ্য জানিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক।
এই বিপুল অঙ্কের পরিসংখ্যান ঘিরে শুরু হয়েছে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত।
সরকারি হিসেব বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি মোট ১২ লক্ষ ৮ হাজার ৮২৮ কোটি টাকার ঋণ বাতিল করেছে। যদিও কেন্দ্র স্পষ্ট জানিয়েছে, এই ঋণ মকুব মানে ঋণগ্রহীতার দায় শেষ হয়ে যাওয়া নয়। অর্থাৎ, টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া থেমে যায়নি।
অর্থমন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত পাঁচ অর্থবর্ষেই মোট ঋণ মকুব করা হয়েছে প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বাতিল করেছে দেশের বৃহত্তম ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। তারা পাঁচ বছরে ১ লক্ষ ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ মাফ করেছে। চলতি অর্থবর্ষের (২০২৪-২৫) মকুব হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যদিও এই অঙ্কের হিসাব নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
এই তালিকায় পরের দিকে রয়েছে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক (৮১,২৪৩ কোটি), ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (৮৫,৫৪০ কোটি), ব্যাঙ্ক অফ বরোডা (৭০,০৬১ কোটি) এবং ক্যানারা ব্যাঙ্ক। ক্যানারা ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে ঋণ মকুবের অঙ্ক ২০২১-২২ সালের ৮,৪২২ কোটি থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫-এ দাঁড়িয়েছে ১৪,৩৫০ কোটি টাকায়।
এই বিপুল ঋণ মকুব নিয়ে বিরোধীরা বারবার প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের প্রকল্পের টাকা আটকে রেখে পুঁজিপতি বন্ধুদের স্বার্থ রক্ষায় এই টাকা ছাড়ছে মোদী সরকার। পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্য ১০০ দিনের কাজ বা আবাস যোজনার টাকা এখনও আটকে রয়েছে, অথচ লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মাফ হচ্ছে, এই ‘বৈষম্যমূলক আচরণ’-এর তীব্র সমালোচনা করছে পশ্চিমবঙ্গের সরকার।
কত টাকা ঋণ মকুব করেছে সরকারি ব্যাঙ্কগুলি?
কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ব্যাঙ্কগুলি (PSB) গত ১০ অর্থবর্ষে (২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত) মোট ১২ লক্ষ ৮ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা ঋণ মকুব করেছে।
কেন ঋণ মকুব করা হয়েছে?
নন পারফর্মিং অ্যাসেট বা অনুৎপাদক সম্পদ রাইট-অফ বা মকুব করা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন। মন্ত্রী জানিয়েছেন, আরবিআই-এর নিয়ম ও ব্যাঙ্ক বোর্ডের নিয়ম মেনেই এই কাজ হয়েছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, ঋণ মকুবের ফলে ঋণগ্রহীতার দায় মকুব হয় না। ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ করার জন্য দায়বদ্ধ থাকে। অনাদায়ী ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলি আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয় বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। নানা ট্রাইবুনালের মাধ্যমে এবং আইনি মেনে অনাদায়ী ঋণ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের কাঠামো কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। জনগণের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি আদতে কতটা চাপের মুখে রয়েছে, তা বোঝা যাচ্ছে এই পরিসংখ্যানেই।



