দেশের সময়: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। অবশেষে বারাসত থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত পেট্রাপোল পর্যন্ত ৩৫ নম্বর জাতীয় সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নিল রাজ্যের পূর্ত দপ্তরের ন্যাশনাল হাইওয়ে বিভাগ। এর জন্য ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে ৪৩ কোটি টাকা। ইতিমধ্যেই কাজের ছাড়পত্র মিলেছে। দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে রাজ্যের জাতীয় সড়ক শাখা।
৩৫ নম্বর জাতীয় সড়ক বারাসতের ডাকবাংলো মোড় থেকে চলে গিয়েছে পেট্রাপোল সীমান্ত পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই রাস্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রাস্তা দিয়েই নিত্যদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত। তার সঙ্গে রয়েছে লরি সহ বড় বড় পণ্যবাহী গাড়ির চাপ। কয়েক বছর আগে এই রাস্তাটি সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন জায়গা ভেঙেচুরে বেহাল হয়ে গিয়েছে। ফলে ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এর জেরেই ঘটছে দুর্ঘটনা।
হাবড়া, অশোকনগর কিংবা গোবরডাঙায় জাতীয় সড়কের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও বারাসত বা দত্তপুকুরে ব্ল্যাকটপের হাল উদ্বেগজনক। সদর শহর বারাসতে এই রাস্তা যেন মারণফাঁদে পরিণত হয়েছে। নিত্য ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছিল।
অবশেষে সেই যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে উদ্যোগী হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। জানা গিয়েছে, অতি দ্রুত এই রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু হবে। দপ্তর সূত্রের খবর, রাস্তার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬২ কিলোমিটার। এটি সংস্কারের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৪৩ কোটি ৩৫ লক্ষ ৮৬ হাজার ৫১৪ টাকা। ইতিমধ্যেই টেন্ডার প্রক্রিয়া হয়ে গিয়েছে।
ইঞ্জিনিয়ারদের কথায়, রাস্তায় জল জমার জন্যই দ্রুত বেহাল হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণেই জাতীয় সড়কে জল জমে থাকে। এর ফলে পিচের আস্তরণের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন নিকাশি ব্যবস্থা উন্নত করতে না পারলে রাস্তা কখনই টেকসই হবে না। এ নিয়ে দপ্তরের এক পদস্থ কর্তা বলেন, এই রাস্তা সংস্কার হবে পিবিএমসি পদ্ধতিতে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মক্ষমতা অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চুক্তি করা হচ্ছে একটি এজেন্সির সঙ্গে। পরবর্তী পাঁচ বছর এই রাস্তা ওই এজেন্সি রক্ষণাবেক্ষণ করবে। পুরো দায়িত্ব ওদের।
এ নিয়ে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সভাধিপতি নারায়ণ গোস্বামী বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে চিঠি দিয়েছিলাম। পাশাপাশি রাজ্যস্তরেও মেরামতের জন্য দরবার করেছিলাম। অবশেষে অনুমোদন মিলেছে। দ্রুত কাজ শুরু হবে। মানুষ দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা থেকেও মুক্তি পাবেন। হাবড়ার বাসিন্দা মৌ বিশ্বাস বলেন, বাসে বা অটোয় চোংদা মোড় থেকে হাবড়া স্টেশনে আসতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। অবশেষে দেরিতে হলেও কাজ হবে জেনে ভালো লাগছে। তবে, এই জাতীয় সড়কের উপর একাধিক রেল গেটের কারণে যানজটে নাকাল হয় মানুষ। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায় । এর জন্য রাস্তা শুধু মেরামত করলেই হবে না । চাই সম্প্রসারণ । এটা নিয়ে প্রশাসনের ভাবা উচিত।
কখনও যশোর রোডের পাশে থাকা গাছের সঙ্গে ট্রাকের ধাক্কায় মৃত্যু হচ্ছে চালকের। কখনও বাস-ট্রাকের ধাক্কায় বাইক, সাইকেল আরোহীর মৃত্যু ও জখমের ঘটনা ঘটেছে। সংকীর্ণ যশোর রোড দুর্ঘটনার সব থেকে বড় কারণ বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ।
বহু বছর ধরেই পথচারী যানচালক এবং এলাকার বড় অংশের মানুষের দাবি, যশোর রোড সম্প্রসারণ করা হোক। অনেকেই জানান, গাছ না কেটে সড়ক সম্প্রসারণ সম্ভব হলে ভাল। না হলে বিকল্প উপায় বের করতেই হবে। রোজ দুর্ঘটনা তো আর চলতে পারে না।
তবে এলাকার বাসিন্দারা মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যেরা নিশ্চয়ই বিকল্প উপায় খুঁজে বের করবেন। যে ভাবেই হোক কাজটা শুরু হোক। তাঁরা পথে বেরিয়ে নরক যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছেন না। অনেকেরই বক্তব্য, কয়েকটি গাছ যদি কাটা পড়েও, তা হলে প্রতি গাছ পিছু ৫০টি গাছ লাগিয়েও দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হোক।
যশোর রোড, ৩৫ নম্বর জাতীয় সড়কের দত্তপুকুর থেকে বনগাঁ পর্যন্ত এতটাই সংকীর্ণ যে দু’টি বড় ট্রাক পাশাপাশি যাতায়াত করতে পারে না। ফলে সড়কে যানবাহনের গতি কমে গিয়েছে। গভীর রাতে ও ভোরের দিকে সড়ক তুলনায় ফাঁকা থাকলে যান চালকেরা গতি বাড়িয়ে দেন। সামনে হঠাৎ গাড়ি চলে এলে চালকেরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। সড়কের পাশে থাকা গাছে ট্রাক ধাক্কা মারে। এমন ভাবে দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।
বাসিন্দারা জানালেন, দু’টি ট্রাক পাশাপাশি যেতে গিয়ে আটকে গিয়েছে। তার ফলে দীর্ঘক্ষণ সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। যানজটও তৈরি হয়। সম্প্রতি হাবড়া-অশোকনগর এলাকায় এমন ঘটনায় তিন-চার ঘণ্টা সড়ক অবরুদ্ধ ছিল।
গাড়ির সঙ্গে ট্রাক বা অন্য গাড়ির ধাক্কা লেগেও জখম হচ্ছেন চালক-খালাসিরা। এমন দৃশ্যও দেখা যায়, দূর থেকে বড় কোনও গাড়ি আসতে দেখলে উল্টো দিকে থাকা ট্রাক বা বাস চালক গাড়ি থামিয়ে দেন। রাতে সরু রাস্তায় ট্রাক চালাতে আরও সমস্যায় পড়েন চালকেরা। বিশেষ করে যাঁরা বাইরের জেলা বা রাজ্য থেকে ট্রাক নিয়ে আসেন, তাঁদের বেশি সমস্যা হয়।
হাবড়া, বনগাঁর যানজটে যানবাহন দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে। যানজট পেরিয়ে চালকেরা গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন, এর ফলেও দুর্ঘটনা ঘটছে। গাছের শুকনো মরা ডাল ভেঙে পথে মানুষ মারা যাচ্ছেন। দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে জীবন হাতে নিয়ে মানুষ যানচালক সকলে যশোর রোড দিয়ে যাতায়াত করছেন।
বারাসত ও বনগাঁর কয়েক লক্ষ মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা যশোর রোড। বারাসত থেকে পেট্রাপোল পর্যন্ত ৬২ কিলোমিটার পথে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। এই রাস্তা দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে স্থলপথে বাণিজ্যের জন্য হাজার হাজার ট্রাক যাতায়াত করে। রোজ লক্ষাধিক যানবাহন চলে। বিদেশি যাত্রীরাও যাতায়াত করেন। বনগাঁর মানুষ জানান, যশোর রোড ধরে কলকাতা যেতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ওই পথেই রয়েছে বনগাঁ ও হাবড়া শহরের যানজট। অনেক মানুষ তাই বাধ্য হয়ে যশোর রোড এড়িয়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে কলকাতায় যাতায়াত করছেন। যদিও এই পথে দূরত্ব কয়েক কিলোমিটার বেশি।
সকলেই চাইছেন, জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত সড়ক সম্প্রসারণে কাজ শুরু হোক।



