ইতিহাস গড়ল বঙ্গ বিজেপি !কলকাতা বিমানবন্দরে শ্রমিক সংগঠনের আনুষ্ঠানিক সূচনার পর দেশব্যাপী বিস্তারের পরিকল্পনা
deshersamay

এর আগে বিজেপির কোনও শ্রমিক সংগঠন নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে সরে এসে কলকাতা বিমানবন্দরে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন গড়ল ভারতীয় জনতা পার্টি। ১৯৮০ সালে দল প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম রাজ্যে বিজেপির শ্রমিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটল। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং পর্যবেক্ষক সুনীল বানসালের উপস্থিতিতে গঠিত এই ৯ সদস্যের কমিটি রাজ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দর, ওয়েবেল এবং হরিণঘাটায় কাজ করবে।

দলের রাজ্য সভাপতি নিজেই একসময় জোর গলায় ঘোষণা করেছিলেন, “আমাদের কোনও শ্রমিক সংগঠন নেই, কারখানার গেটে চাঁদা তোলার কোনও সিস্টেম আমাদের দলে নেই!” অথচ সেই অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীতে হেঁটে একেবারে নতুন ইতিহাস গড়ল বঙ্গ বিজেপি। ১৯৮০ সালে দল প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন তৈরি করল ভারতীয় জনতা পার্টি। আর সেই নতুন সংগঠনের সূচনা হল এই বাংলা থেকেই!
কলকাতা বিমানবন্দরে বিজেপির ট্রেড ইউনিয়ন সেলের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের পর্যবেক্ষক ও সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বানসাল সহ দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতৃত্ব। আগামী দিনে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার সুবিধার্থে অন্যান্য রাজ্যেও এই ট্রেড ইউনিয়ন শুরু করার ভাবনা রয়েছে দলের। আপাতত ৯ জনের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংগঠনের খবর অনুযায়ী, রাজ্যের সমস্ত বিমানবন্দর, ওয়েবেল (Webel) এবং হরিণঘাটায় বিজেপির ব্যানারে কাজ করবে এই নতুন শ্রমিক সংগঠনটি।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিজেপির এই নতুন শ্রমিক সংগঠন গড়ার সিদ্ধান্ত বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কিছুদিন আগেই চাঁদাবাজি ও তোলাবাজি নিয়ে অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছিলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। ডানকুনি ও অন্যান্য এলাকার বিভিন্ন ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “আমাদের দলের কোনও ট্রেড ইউনিয়ন নেই। বিজেপিতে এভাবে কারখানা থেকে চাঁদা তোলার কোনও সিস্টেম নেই। একদম সরাসরি গ্রেফতার করবেন।”
তদন্তে সদ্য দলবদল করা কিছু নেতার দিকে আঙুল তুলে শমীকবাবু হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, দলের পতাকা হাতে বা গায়ে আবির মেখে কেউ কারখানায় কুকীর্তি চালাতে গেলে যেন ছাড় দেওয়া না হয়। তাঁর সেই মন্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই খোদ রাজ্য সভাপতির উপস্থিতিতেই বিজেপির প্রথম শ্রমিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটল। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়ে গেছে জোর চর্চা।
এদিকে, চলতি সপ্তাহেই রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা হতে চলেছে। বৃহৎ শিল্প ও নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ইনসেনটিভ , দ্রুত অনুমতির জন্য কার্যকর ‘সিঙ্গল উইন্ডো নীতি’ এবং জমি সংক্রান্ত বিষয়ে বেশ কিছু বড় পদক্ষেপের ঘোষণা করতে পারে নবান্ন। এমন এক শিল্পবান্ধব পরিবেশের গুঞ্জনের মাঝেই বিজেপির এই ট্রেড ইউনিয়ন আত্মপ্রকাশ করায় রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই দিনে ওয়েবেল ভবনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিজেপির সর্বভারতীয় জাতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা রাজ্যের পর্যবেক্ষক সুনীল বানশাল, রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদিকা শশী অগ্নিহোত্রী এবং রাজারহাট নিউটাউনের বিধায়ক পীযূষক কানোডিয়া।

অনুষ্ঠানে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “আমাদের রাজ্যে পরিবর্তন এসেছে। ভারত ভাগ মানতে হবে এমন দাবি উঠেছিল একসময়। গঙ্গার পূর্বদিক থেকে গোটা বাংলাকে পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল কমিউনিস্টরা। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর আনা প্রস্তাবে যদুনাথ সরকাররা এগিয়ে এসেছিল। আমরা যে কথা বারবার বলেছি, বলছি, আমরা এখন ভারতীয় পরিচয় দিতে পারছি, তার অবদান শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর। তাঁকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসকে চেপে রাখা যায়না। আজ এখানে বিজেপির সরকার। শ্রমিক-মালিক সংঘর্ষ নয় শুধু, কর্তব্য সবাই পালন করবেন।”
তিনি জানান, সংগঠনের মূল লক্ষ্য শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা এবং তাঁদের বিভিন্ন দাবি, সমস্যা ও স্বার্থের বিষয়গুলিকে সাংগঠনিকভাবে তুলে ধরা। এই উদ্যোগের সঙ্গে বিকশিত বাংলার লক্ষ্যের কথাও তুলে ধরেন বিজেপি নেতৃত্ব।

এদিন মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তোলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। তাঁর কথায়, “মমতা ব্যানার্জী নিজেই একসময় নিজেকে ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’ বলে উল্লেখ করতেন। কিন্তু সেই বাঘিনী এখন আরশোলার সঙ্গে খেলা করছেন।” এমন দৃশ্য জীবনে দেখেননি বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। রাজনৈতিক মহলের মতে, দিল্লিতে বিরোধী শিবিরের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগের প্রেক্ষাপটেই এই মন্তব্য করেছেন শমীক।

শনিবার শমীকের আক্রমণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল জ্ঞানেশ কুমার। বিজেপির ক্ষমতায় আসার পিছনে জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা রয়েছে বলে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা নিয়েও তৃণমূল নেত্রীকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানান তিনি। শমীকের প্রশ্ন, “পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দাঁড়িয়ে কেন মমতা ব্যানার্জী স্পষ্ট করে বলছেন না যে জ্ঞানেশ কুমারের জন্যই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে?” এই মন্তব্যের মাধ্যমে নির্বাচন এবং বিজেপির ক্ষমতায় আসা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগকেও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন তিনি।
