FIFA World Cup 2026 ১৬ বছর পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন
deshersamay


নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে যেন ইতিহাস, আবেগ আর প্রজন্ম বদলের এক মহাকাব্য রচিত হলো। এক দিকে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নেমেছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্তিনা, অন্য দিকে ছিল লামিনে ইয়ামালদের হাত ধরে নতুন স্বপ্ন বোনা স্পেন। এটি শুধু দুই দলের লড়াই ছিল না, ছিল দুই যুগের মুখোমুখি সংঘর্ষ। এক পাশে অভিজ্ঞতার ভার, অন্য পাশে তারুণ্যের নির্ভীক উড়ান। প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি মুহূর্তে জমাট বেঁধেছিল উত্তেজনা।

১২০ মিনিটের অসম লড়াই। স্কোরলাইন বলছে স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ফলাফল ১-০। কিন্তু এই অঙ্ক দিয়ে নিউ জার্সির যুদ্ধের আসল গণিত বোঝানো সম্ভব নয়।
এদিনের মেগা ফাইনালে বলের দখল থেকে শুরু করে আক্রমণের ঝড়—সব বিভাগেই কার্যত একচ্ছত্র দাপট স্প্যানিশ আর্মাডার। পাসের ফুলঝুরিতে আর্জেন্তিনার মিডফিল্ড অসহায়, রক্ষণের চোখে ঝিঁঝি ধরে গেল! এমন অসহায় আত্মসমর্পণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর কবে দেখা গিয়েছে, বলা মুশকিল। শেষ পর্যন্ত সেই আধিপত্যেরই যোগ্য পুরস্কার মিলল অতিরিক্ত সময়ে। বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেসের নিখুঁত ফিনিশে বিশ্বজয়ের আনন্দে মাতল স্পেন। অন্যদিকে, টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হতেই খালি হাতে মাঠ ছাড়লেন লিওনেল মেসি।

শুরু থেকেই ম্যাচের রাশ নিজেদের হাতে তুলে নেয় স্পেন। প্রথম পাঁচ মিনিটে লামিন ইয়ামালের সামনে বড় সুযোগ আসে। এরপর দানি ওলমো, মিকেল ওয়ারজাবাল, মার্ক কুকুরেয়া, অ্যালেক্স বায়েনারা বারবার আর্জেন্তিনার রক্ষণে একের পর এক আক্রমণের ঢেউ তোলেন৷ বলের দখল প্রায় সব সময়েই ছিল স্প্যানিশদের পায়ে। এমন আগ্রাসী ফুটবলের সামনে কার্যত খাঁচাবন্দি হয়ে পড়েন মেসি। প্রথমার্ধে একটি শটও নিতে পারেনি গেলবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন পরিসংখ্যান রীতিমতো লজ্জার।

তবু নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত লড়াই যে গোলশূন্য ছিল, তার একমাত্র কৃতিত্ব এমিলিয়ানো মার্তিনেজের। স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডদের সামনে কার্যত চিনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অ্যাস্টন ভিলার কিপার৷ নির্ধারিত সময়ে ১০টি সেভ করে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েন এই গোলরক্ষক।
ম্যাচের বেশ কয়েকটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, প্রথমার্ধের শেষ দিকে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। তাঁর জায়গায় নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি। তাতে কিছুটা হলেও তাল কাটে৷ দ্বিতীয়ার্ধেও আর্জেন্তিনাকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখে স্পেন। ৫০ মিনিটের মাথায় দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিও হয়। তবে মেসিদের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত আসে নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ দিকে। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। ফলে ১০ জনের দলে দাঁড়ায় লিওনেল স্কালোনির টিম।
গোলশূন্য অবস্থায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেও আক্রমণের ধার কমায়নি স্পেন। প্রথমে মিকেল মেরিনোর ফাউলের কারণে ভিএআর চেকে স্পেনের একটি গোল বাতিল হয়।

এতকিছুর পরেও স্প্যানিশ আর্মাডাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যায়নি। (Spain vs Argentina) ১০৬ মিনিটে ডান দিক থেকে পেদ্রো পোরোর একটি চমৎকার ক্রস বাঁ-দিকের পোস্টে থাকা নিকো উইলিয়ামস মাথা ছুঁইয়ে বক্সের মাঝখানে পাঠান। আর ঠিক সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় পৌঁছে বাঁ-পায়ের জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে দেন সুপার সাব ফেরান তোরেস।
এই একটি গোলই যথেষ্ট৷ যা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। পিছিয়ে পড়তেই মরিয়া মেসি একটি দর্শনীয় শট নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তা বারের সামান্য উপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। গোটা ম্যাচে সেটাই আর্জেন্তিনার প্রথম ও একমাত্র শট। শেষ পর্যন্ত ১-০ ব্যবধানে জিতে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ নিজেদের ঘরে তুলল লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন। অন্যদিকে, টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল লিওনেল মেসির৷

শেষে কর্নার থেকেও কিছু করতে পারেনি আর্জেন্তিনা। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন স্পেনের ফুটবলাররা। কেউ আনন্দে কাঁদছেন, কেউ সতীর্থকে জড়িয়ে ধরছেন। গ্যালারিতে তখন উৎসবের বিস্ফোরণ। ১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপ স্পেনের। আর এই জয় শুধু একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এটি ছিল নতুন এক প্রজন্মের উত্থানের ঘোষণা।
