বরুণ বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডে এবার মমতার নাম জড়াতেই অভিযোগ ওড়াল কালীঘাট–তৃণমূল
deshersamay

সুটিয়ার প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের খুনের মামলায় এ বার ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে জড়াল রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। বুধবার ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে মমতার নামে বনগাঁর পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন নিহতের সহযোদ্ধা নন্দদুলাল দাস। যদিও পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ওই অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করা হবে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নামে অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে চাননি নিহত বরুণের পরিবারের সদস্যরা।

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার পাঁচপোতা গ্রামে বাড়ি ছিল কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের বাংলার শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের। এলাকার অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন তিনি। বাম জমানা থেকে শুরু হয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরেও গাইঘাটার সুটিয়ায় একের পর এক ধর্ষণের ঘটনায় সামনে থেকে প্রতিবাদ করেছিলেন বরুণ। গড়ে তুলেছিলেন ‘সুটিয়া প্রতিবাদী মঞ্চ’। নদী সংস্কারের সরকারি টাকা নয়ছয় হওয়া নিয়ে তৎকালীন শাসকদলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন তিনি।

২০১২ সালের আলোচিত সুটিয়ার প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। দীর্ঘ ১৪ বছর পর এই হত্যাকাণ্ডে ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে নাম জড়াল রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের । বুধবার বরুণের আন্দোলন-সঙ্গী নন্দদুলাল দাস বনগাঁর পুলিশ সুপার বিদিশা কলিতা দাশগুপ্তর কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম অভিযোগপত্রে যুক্ত করার আর্জি জানিয়েছেন। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়বস্তু ও তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার বাসিন্দা এবং কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সুটিয়ায় ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গঠন করেছিলেন ‘সুটিয়া প্রতিবাদী মঞ্চ’। পাশাপাশি নদী সংস্কারের সরকারি অর্থ তছরুপের বিরুদ্ধে তৎকালীন শাসকদলের বিরুদ্ধেও তিনি সরব হন। ২০১২ সালের ৫ জুলাই গোবরডাঙা স্টেশনের বাইরে মোটরবাইকে ওঠার সময় আততায়ীদের গুলিতে খুন হন তিনি। নিহতের পরিবার এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সাবেক মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু গত ১৪ বছরেও বিচার না মেলায়, রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর বরুণের পরিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দ্বারস্থ হয়। শুভেন্দুর নির্দেশে সিআইডি নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে এবং বনগাঁ আদালতে পুনরায় ট্রায়াল চলছে, যেখানে আগামী ৩১ আগস্ট বরুণের বাবার সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

পুলিশের কাছে জমা দেওয়া অভিযোগে নন্দদুলাল দাসের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের কারণেই এই খুনের প্রকৃত তদন্ত এত দিন আলোর মুখ দেখেনি। সিবিআই তদন্ত না করিয়ে এই ঘটনার দায় সিপিএমের ওপর চাপিয়ে দিয়ে মূল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। এই আবেদনকে এফআইআর (FIR) হিসেবে গণ্য করার দাবি জানান তিনি। তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নাম জড়ানোর বিষয়ে বরুণের দিদি প্রমীলা বিশ্বাস জানান, যে কেউ অভিযোগ করতেই পারেন এবং নন্দদুলাল তাঁর আইনি অধিকার প্রয়োগ করেছেন। এটি পুরোপুরি তদন্তসাপেক্ষ বিষয় হওয়ায় পরিবার এর ওপর আলাদা করে কোনও মন্তব্য করতে চায় না।
এদিকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগকে পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, “গোটা বিশ্ব জানে বরুণ বিশ্বাসের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূরতম কোনও সম্পর্ক নেই। বিচার চাওয়ার অধিকার সবার আছে, কিন্তু এভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম টেনে এনে তদন্তকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে, যা এখন স্পষ্ট।”

বনগাঁর পুলিশ সুপার বিদিশা কলিতা দাশগুপ্ত বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। সেই অভিযোগে অনেক কিছু রয়েছে। তথ্য প্রমাণ খতিয়ে দেখে আইনি পদক্ষেপ করা হবে।’ কালীঘাট–তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘গোটা পৃথিবী জানে, ওই ঘটনার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও সম্পর্ক নেই। ন্যায়বিচার কেউ চাইতেই পারেন। কিন্তু এই ভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে দেওয়ায় ন্যায়বিচারের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সে প্রশ্ন উঠেই যায়। কারণ, এর পিছনে যে রাজনীতি আছে, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।’
