Bengal Ration Corruption Crackdown: ‘দুর্নীতির মৌচাকে ঢিল মেরেছি, প্রাণহানির আশঙ্কা তো থাকছেই,রেশনে আর আটা নয়, প্রাণ গেলেও দুর্নীতি রুখব’, বলে দিলেন নতুন খাদ্যমন্ত্রী
deshersamay


“দুর্নীতির মস্ত বড় এক মৌচাকে সরাসরি ঢিল মেরেছি। যারা বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে কামাই করেছে, তারা আমায় ছেড়ে কথা বলবে না। ফলে এখন যে কোনও মুহূর্তে আমার প্রাণহানির আশঙ্কা তো থাকছেই!” রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর খাদ্য দফতরের দুর্নীতি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ঠিক এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করলেন রাজ্যের নতুন খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া (Ashok Kirtania)।

শুক্রবার এক সাংবাদিক বৈঠকে একদিকে যেমন পূর্বতন তৃণমূল সরকারের একাধিক রেশন নীতি নিয়ে বড়সড় কড়া পদক্ষেপের বার্তা দিলেন তিনি, ঠিক তেমনই বিদায়ী জমানার স্বপ্নের ‘দুয়ারে রেশন’ (Duare Ration Scheme) প্রকল্প আগামী দিনে রাজ্যে আদৌ বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের দিকেই বল ঠেলে দিলেন খাদ্যমন্ত্রী।
আগের সরকারে রেশনে ভূরি ভূরি দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। নতুন সরকারের খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েই অশোক কীর্তনিয়া বলেছিলেন, দুর্নীতির ঘুঘুর বাসা ভাঙবেন তিনি। আর শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে তাঁর হুঁশিয়ারি, দুর্নীতিতে যুক্তদের খুঁজে বের করা হবে।
একইসঙ্গে বললেন, “আমার প্রাণ গেলেও দুর্নীতি রুখব।” এবার থেকে রেশনে আটার বদলে গম দেওয়া হবে বলেও স্পষ্ট করে দিলেন।

এদিন খাদ্যমন্ত্রী বলেন, “রেশনে এখন আর আটা পাওয়া যাবে না। কারণ আটায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে। এবার রেশন দোকান থেকে পাওয়া যাবে গম। একমাস আমাকে সময় দিন। কারণ আটায় যে দুর্নীতি হয়েছে, তা খুঁজে বার করতে হবে। আটার পরিবর্তে গম পাওয়া যাবে রেশন দোকান থেকে। কেন্দ্রীয় সরকার যে গম পাঠাবে, সেটাই পাবেন মানুষ। রেশনে যে সমস্ত খাদ্য সামগ্রী দেওয়া হয়, তার গুণগত মানের উন্নতি করা হবে।”
পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে রেশনে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বারবার সরব হয়েছিল বিজেপি। প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক গ্রেফতারও হয়েছিল। রেশনে দুর্নীতি নিয়ে এদিন খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া বলেন, “আমার প্রাণ চলে গেলেও আমি দুর্নীতি রুখব।” প্রাণনাশের কোনও আশঙ্কা করছেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি তো দুর্নীতির মৌচাকে ঢিল মেরেছি। তাই এ কথা বললাম।”

এরপরই তিনি বলেন, “খাদ্যের সঙ্গে কোনও দুর্নীতি নয়। মুখ্যমন্ত্রী আমাকে ডেকে বলে দিয়েছেন। আমি দুর্নীতি রুখবই।” সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, “দুর্নীতির খবর থাকলে আমাকে জানান। আমার পার্সোনাল মোবাইল নম্বরে মেসেজ করুন।”
রেশন ডিলারদের বার্তা দিয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, রেশনে দুর্নীতি করলে ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যখন খুশি তিনি গোডাউন পরিদর্শনে যাবেন বলে জানিয়ে দিলেন। নতুন সরকার দুয়ারে রেশন ব্যবস্থা চালু রাখবে কি না, তা নিয়ে তিনি বলেন, এটা আদালতে বিচারাধীন। তাই এই নিয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করবেন না তিনি।
সাংবাদিক বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, রাজ্যে তৈরি হওয়া নতুন ডাবল ইঞ্জিন সরকার দুর্নীতির প্রশ্নে বিন্দুমাত্র কোনও আপস বা রেয়াত করবে না। নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা আমজনতার সামনে এনে অত্যন্ত আবেগী ও দৃঢ় সুরে অশোক বলেন, “এই রাজ্যের গরিব মানুষের রেশন ও খাদ্য নিয়ে চলা দুর্নীতি রোধ করতে গিয়ে যদি আমার নিজের জীবনও চলে যায়, আমি মরতে রাজি। তবু আমি সাধারণ মানুষের স্বার্থে এই দফতর থেকে দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ করবই। মুখ্যমন্ত্রী নিজে আমায় পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছেন, খাদ্য দফতরে যেন কোনও স্তরেই বিন্দুমাত্র কালিমালিপ্ত কারবার না থাকে।”
বিগত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকল্প ‘দুয়ারে রেশন’ নিয়ে রাজ্যে নতুন সরকার কী ভাবছে, তা নিয়ে আমজনতা ও রেশন ডিলারদের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌতূহল ছিল। সেই ধোঁয়াশা কাটানোর চেষ্টা করে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, “দুয়ারে রেশন বিষয়টি এই মুহূর্তে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। এই নিয়ে আইনি জট এখনও কাটেনি। ফলে শীর্ষ আদালত আগামী দিনে কী আইনি সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের নতুন সরকার এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরবর্তী চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”

এদিকে দফতরের অন্দরে থাকা ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ অর্থাৎ দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও ফুড ইন্সপেক্টরদের (Food Inspector) উদ্দেশে একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন নতুন খাদ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসাররা যদি কালোবাজারি ও দুর্নীতিগ্রস্থ মানুষদের সঙ্গে জড়িত না থাকেন, তবে একা ডিলার বা মিল মালিকদের পক্ষে এই বিপুল দুর্নীতি করা কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। এবার এদের কাউকেই ছেড়ে কথা বলা হবে না।” ফুড ইন্সপেক্টরদের কড়া বার্তা দিয়ে মন্ত্রী সাফ বলেন, “এনাফ ইজ এনাফ (Enough is Enough)!
বিগত দিনে কার আমলে কী করেছেন না করেছেন, সেসব ভুলে যান। ওইসব দিন আর চলবে না।”
দুর্নীতির এক সুনির্দিষ্ট খতিয়ান তুলে ধরে এদিন বীরভূম জেলার এক চাল কলের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন খাদ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, “তদন্তে জানা গিয়েছে, বীরভূমের একটি নির্দিষ্ট রাইস মিল সরকারি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ২২ কোটি টাকার সমপরিমাণ ধান তুলে নিয়েছে, অথচ তার পরিবর্তে সরকারকে এক টাকার চালও ফেরত দেয়নি! পুরোটাই সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই পুরো জালিয়াতির কেস অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে।”

এছাড়া খাদ্যমন্ত্রী এদিন পরিষ্কার করে দেন, রেশনে আটা বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নতুন সরকার ইতিমধ্যেই গ্রহণ করেছে, তা এখনই বদলাচ্ছে না। যতদিন না এই বিষয়ে রাজ্য মন্ত্রিসভার (Cabinet Meeting) পরবর্তী বৈঠকে নতুন করে কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, ততদিন এই নির্দেশিকা বহাল থাকবে।

Leave a Reply