অভিষেকের আপ্তসহায়ক সুমিতকে জেরা ,তারপরই মমতার তৃণমূলের পার্টি অফিস থেকে উদ্ধার কোটি টাকা
deshersamay

জেলে রয়েছেন ডায়মন্ড-হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় -র আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়। আর তার মধ্যেই বড় সাফল্য পেল ডায়মন্ড হারবার জেলার পুলিশ। মমতা তৃণমূলের পার্টি অফিস থেকে উদ্ধার হল ১ কোটি ২ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা।

পুলিশ সূত্রে খবর, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিএ সুমিত রায়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই তথ্যের কথা তারা জানতে পেরেছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সরিষার একটি তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস থেকে উদ্ধার হয়েছে ১ কোটির বেশি টাকা বলে খবর। পার্টি অফিসটি মগরাহাট পশ্চিমের তৃণমূল বিধায়ক শামিম আহমেদের বলে জানা গিয়েছে।

বুধবার এই ঘটনায় সাংবাদিক বৈঠক করেন ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অভিষেক মজুমদার। সেখানেই উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ টাকা এবং তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন তিনি। কী কারণে ওই পার্টি অফিসে এত বিপুল পরিমাণ টাকা রাখা হয়েছিল, তার উৎস কী এবং এই ঘটনায় আর কারা জড়িত রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সুমিত রায়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই ঘটনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ডায়মন্ড হারবার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, “গতকাল রাতে এই তল্লাশি হয়। SDPO-র নেতৃত্বে এটা হয়। তবে এর বেশি আর কিছু বলতে পারব না, যেহেতু এটা তদন্ত সাপেক্ষ বিষয়।” বিজেপি নেতা উত্তম বাগ বলেন, “সুমিত রায় কিন্তু অভিষেকের ৫০ শতাংশ টাকার মালিক। ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা থেকে ওঁর জন্য তোলা যেত। দুর্নীতির টাকায় বহু জমি কেনা হয়েছে।”

শামিম মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অশিক্ষক কর্মচারী। ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সূত্রে খবর, শামিমের সঙ্গে সুমিতের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। শামিমের পরিবারের একজনকে বজবজ এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও হীরকবন্দরে আলোচনা রয়েছে।
সূত্রের খবর, বজবজের যে হাসপাতালে শামিমের পরিবারের ওই মহিলা সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তার কর্ণধারের সঙ্গে অভিষেকের ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত। এমনকি ওই প্রতিষ্ঠানের নতুন একটি ক্যাম্পাস উদ্বোধনেও অভিষেক সশরীরে হাজির ছিলেন। আরও জানা যাচ্ছে, এই ব্যবসায়ী একটা সময়ে কাটা তেলের ব্যবসা করতেন। বাম জমানাতে তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কিছু করতে চান। সেই পর্বেই বজবজ এলাকার জমি পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তৃণমূল জমানায় এই ব্যবসায়ী ক্রমশ প্রভাবশালীতে পরিণত হন। জনশ্রুতি: জোড়া খুঁটি হয়ে উঠেছিলেন সুমিত এবং শামিম। পরোক্ষভাবে জুড়েছিলেন ফলতার নেতা জাহাঙ্গির খানও।
বস্তুত, ক’দিন আগেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিষেককে কটাক্ষ করে রসিকতার ছলে বলেছিলেন, অতিরিক্ত আতঙ্কে ওই নেতার ‘সোডিয়াম-পটাশিয়ামের সমস্যা’ দেখা দিয়েছে। নিজের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের গ্রেফতারির বিষয় তুলে ধরে অভিষেক অভিযোগ করেছিলেন যে, মিথ্যে মামলার ফাঁদে ফেলে আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে সুমিতকে হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং এই কাজের বিনিময়ে দু-তিনজন পুলিশ অফিসারকে পুরস্কার দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। অভিষেকের এই বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পালটা তোপ দেগে বলেন, “আমার যা মনে হচ্ছে, ওঁর যে পিএ টাকা তুলত, সে জেরায় সব সত্য উগরে দিয়েছে। ডায়মন্ড হারবার পুলিশ তাঁকে পুলিশ হেফাজতে (পিসি) নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করায় সব সত্য সামনে চলে এসেছে।” বুধবার শামিমের কার্যালয় থেকে টাকা উদ্ধারের পর অনেকেই মুখ্যমন্ত্রীর ওই মন্তব্য ধরে দুইয়ে দুইয়ে চার করার চেষ্টা করছে।
মমতা তৃণমূলের পালটা দাবি, বিজেপি সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ যোগসাজশ করে কোনও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি ছাড়াই মিথ্যা মামলা সাজানোর জন্য অত্যন্ত নীচ ও মরিয়া কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। দলীয় নেতৃত্ব অভিযোগ করেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটাতে রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশের এই অপব্যবহার এক গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
তৃণমূলের জানানো হয়েছে, তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধি মাইদুল ইসলাম আগেই একটি লিখিত পুলিশ অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পুলিশ ও বর্তমান বিজেপি প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় দুষ্কৃতীরা উক্ত দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। সেই এফআইআর-এ তৃণমূল স্পষ্টভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে, মামলা সাজানোর উদ্দেশ্যে দুষ্কৃতীরা অফিসের ভেতরে বেআইনি ও আপত্তিকর জিনিসপত্র রেখে (প্ল্যান্ট করে) চক্রান্ত করতে পারে। সম্প্রতি ঘটা ঘটনাপ্রবাহ তাঁদের সেই আশঙ্কাকেই সত্যি প্রমাণ করছে।

তৃণমূলের দাবি, গত ২১ মে-র হিংসাত্মক ঘটনার তদন্তে পুলিশ বিন্দুমাত্র অগ্রগতি দেখায়নি। আজ পর্যন্ত একজন দুষ্কৃতীকেও শনাক্ত বা গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি এবং বিষয়টি এখনও বিচারাধীন (সাব-জুডিস)। তাদের দাবি, এই দ্বিচারিতা অত্যন্ত স্পষ্ট— যখন দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর হয়েছিল, তখন পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল, আর এখন চক্রান্ত করে প্রমাণ প্ল্যান্টের অভিযোগ উঠতেই পুরো রাজ্য প্রশাসন অতি সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
পুলিশ প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মমতা তৃণমূল লিখেছে, যে সমস্ত পুলিশ কর্মকর্তা এই বেআইনি কাজে অংশ নিয়েছেন বা মদত দিয়েছেন, আইনি উপায়ে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদালতের যাবতীয় নথিতে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের নাম ও ভূমিকা চিহ্নিত করে রেকর্ডভুক্ত করা হচ্ছে।

তাদের বক্তব্য, “বিজেপি আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করতে পারে, পুলিশকে ব্যবহার করে নিশানা করতে পারে, কিন্তু এই রাজনৈতিক ক্ষমতা বা সাজানো অভিযোগ দিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করা যাবে না। সত্য সামনে না আসা এবং বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা রাজনৈতিক, আইনি ও গণতান্ত্রিকভাবে এই লড়াই চালবে।”
