‘আমরা হারিনি, হারানো হয়েছে’, ‘জবাব দেবে যুবরা’, দিল্লিতে ‘ভ্যানিশ কুমার’কে তুলোধনা মমতার,সুর চড়ালেন রাহুলও
deshersamay

দিল্লির রামলীলা ময়দানে নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রের শাসক দলকে একাসনে রেখে আক্রমণ শানালেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । জানালেন, দেশের যুবরাই যা উত্তর দেওয়ার দেবে। অভিভাবক হয়ে দরকারে তাঁদের পথ দেখাবেন তিনি।

রবিবার ‘ইন্ডিয়া’র মঞ্চ থেকে সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে তিনি বলেন, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন দেশের গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে। বাংলায় লক্ষ লক্ষ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।
সমাবেশের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান তৃণমূলনেত্রী। তিনি বলেন, তেজস্বী যাদব, কপিল সিব্বল, অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া সুলে থেকে শুরু করে বাম নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এই মঞ্চে উপস্থিত রয়েছেন। নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন ও তরুণ প্রজন্মকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সকলে মিলে যে লড়াই শুরু হয়েছে, তাতে জয় নিশ্চিত।
কেন্দ্রীয় সরকারকে তুলোধনা করে মমতা বলেন, “আমরা হারিনি, আমাদের হারানো হয়েছে। ভোট লুট করেছে বিজেপি, দেশের গণতন্ত্রকে হরণ করেছে।” তাঁর অভিযোগ, এসআইআর -এর খাঁড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। এই প্রসঙ্গে কটাক্ষের সুরে তিনি বলেন, এসআইআর-এর প্রকৃত অর্থ হল— ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিলিফ টু আ পলিটিক্যাল পার্টি লাইক বিজেপি’। তাঁর দাবি, শুধু ভোট বা গণতন্ত্র নয়, বাংলার মানুষের চাকরি, সম্মান এবং সাংবিধানিক অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে আক্রমণ করে তৃণমূলনেত্রী বলেন, শুধু ভোট নয়, পুরোপুরি সেন্ট্রাল হাইজ্যাকিংয়ের মাধ্যমে গণনার প্রক্রিয়াকেও ভ্যানিশ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বাংলায় এক কোটিরও বেশি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক লড়াই চলবে বলে হুঙ্কার দেন তিনি।
এদিনের সমাবেশে ছড়ার সুরে কেন্দ্রকে আক্রমণ করেন মমতা। বহুশ্রুত ‘জনি জনি ইয়েস পাপা’র প্যারোডি করে তিনি বলেন, “ভোট চুরি? ইয়েস পাপা! লোকতন্ত্র চুরি? ইয়েস পাপা!” মন্দির, মসজিদ, ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে শুরু করে রামজন্মভূমির তহবিলে দুর্নীতি হয়েছে বলেও আক্রমণ শানান তিনি।
পুলিশ ও কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলির একাংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মমতা বলেন, এদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে বিজেপি। তবে এই পরিস্থিতি বদলাবে। মমতা বলেন, “বিজেপি যাওয়ার জন্য তৈরি, ওরা যাবেই।” রামপ্রসাদ বিসমিলের কবিতার পঙক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “সরফরোশি কি তামান্না আজ হামারে দিল মে হ্যায়, দেখনা হ্যায় জোর কিতনা বাজু-এ-কাতিল মে হ্যায়।”
তরুণ প্রজন্ম ও জেন-জি (Gen-Z)-র আন্দোলনকে কুর্নিশ জানিয়ে মমতা বলেন, দেশ বাঁচাতে দলমত নির্বিশেষে সকলকে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে। বিচারব্যবস্থার কাছে নিরপেক্ষ ভূমিকার আর্জি জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র রক্ষায় বিচার বিভাগকেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে আর চোখের জল ফেলতে না হয়।
এদিন দিল্লির রামলীলা ময়দানের সমাবেশ থেকে কেন্দ্র সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুর চড়ালেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। রবিবার ‘ইন্ডিয়া’র ঐতিহাসিক সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি আক্রমণ করেন তিনি। একইসঙ্গে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহকে হুশিয়ারি দিয়ে রাহুল বলেন, “জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর পর আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য আপনারা।”

রামলীলার মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংবিধানকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়ার কথা ফের মনে করিয়ে দেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, “নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহকে স্পষ্ট বার্তা দিতে আপনারা এখানে এসেছেন। তারা যতই ধনী হোন বা নিজেদের শক্তিশালী মনে করুন না কেন, আপনারা সংবিধানের চেয়ে বড় নন।”
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে তীব্র আক্রমণ করে রাহুল গান্ধী দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সাহায্য ছাড়া নরেন্দ্র মোদী কখনও প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না এবং অমিত শাহও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারতেন না। ভোটার তালিকা থেকে ১৫ শতাংশ ভোটারকে বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে রাহুল একে সাধারণ চুরি নয়, বরং ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ এবং ‘বিরল থেকে বিরলতম অপরাধ’ বলে তোপ দাগেন। তাঁর অভিযোগ, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ছাড়াও মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকের মতো একাধিক নির্বাচনে পরিকল্পিতভাবে ভোট চুরি করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মন্তব্যের পাল্টা দিয়ে রাহুল বলেন, “অমিত শাহ বলছেন নরেন্দ্র মোদী কোথাও যাচ্ছেন না। আমি বলতে চাই, তাঁকে কোথাও যেতে দেওয়া হবে না। দেশবাসীর অধিকার রক্ষা করতে সবার আগে জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরিয়ে জেলে পাঠানো হবে। আর তারপর আমরা আপনাদের (মোদী-শাহ) কাছে আসছি।” আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুশিয়ারি দেন তিনি।

শিল্পপতি গৌতম আদানি এবং দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে খোঁচা দিতে গিয়ে কংগ্রেস নেতা বলেন, “শিবের যাত্রায় যেমন যে কেউ যেতে পারে, আমরা তেমন ভারতই দেখতে চাই। যেখানে কৃষক তাঁর পরিশ্রমের ফল পাবেন, শিক্ষার্থীরা তাঁদের যোগ্যতার বিচার পাবেন। কিন্তু আমরা এমন একটা দেশ চাই না, যেখানে সমস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আদানিদের হাতে চলে যাবে। দেশের সবকিছু আদানিদের হতে পারে না।”

সবশেষে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ ও ধর্মের কথা বলতে গিয়ে রাহুল গান্ধী জানান, তাঁর কাছে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরই একমাত্র ধর্ম। বিরোধী শিবির ঘৃণা বা হিংসা ছড়াতে বিশ্বাস করে না, তবে দেশের সংবিধানকে কোনওভাবেই ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন তিনি।
