পুজোর মুখে দুর্যোগের ভ্রুকুটি, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব! উত্তাল গঙ্গাসাগর, পুণ্যার্থীদের সমুদ্রে নামায় নিষেধাজ্ঞা
deshersamay

পুজোর মুখে ফের আবহাওয়ার ভ্রুকুটি বাংলায়। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপ ইতিমধ্যেই অতি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস, বুধবার রাতেই উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ–দক্ষিণ ওডিশা উপকূলের মধ্যে দিয়ে স্থলভাগে ঢুকতে পারে সেটি। এর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ— রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

উত্তাল গঙ্গাসাগর। সমুদ্রের গর্জনে বাড়ছে উদ্বেগ। আর সেই পরিস্থিতিতে পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের জন্য জারি করা হল কড়া সতর্কতা। গঙ্গাসাগরের সমুদ্র সৈকত থেকে স্নানের ঘাট—সর্বত্র চলছে প্রশাসনের মাইকিং। সমুদ্রে নামতে নিষেধ করা হচ্ছে পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের। একইসঙ্গে মাঝসমুদ্রে থাকা মৎস্যজীবীদের দ্রুত ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৫ তারিখ পর্যন্ত সমুদ্রে যাওয়ার উপর জারি করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
বঙ্গোপসাগরে তৈরি গভীর নিম্নচাপ শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেওয়ার পর থেকেই উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে শুরু হয়েছে সতর্কতা। ঘূর্ণিঝড়ের মূল অভিমুখ অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা উপকূলের দিকে হলেও তার প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের উপকূলবর্তী জেলাগুলিতেও শুরু হয়েছে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া। আকাশের মুখ ভার। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। আর সমুদ্রের ঢেউ ক্রমেই হয়ে উঠছে আরও উত্তাল।
এই পরিস্থিতিতে কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চাইছে না প্রশাসন। গঙ্গাসাগর জুড়ে শুরু হয়েছে বিশেষ নজরদারি। সাগর ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে সকাল থেকেই গঙ্গাসাগরের বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করছেন সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা। সমুদ্র সৈকত, স্নানের ঘাট এবং কপিল মুনির আশ্রম সংলগ্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের সতর্ক করা হচ্ছে।

প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে—উত্তাল সমুদ্রে কোনওভাবেই নামা যাবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সমুদ্রের জল থেকে দূরে থাকতে হবে। অনেকেই গঙ্গাসাগরে এসে সমুদ্রস্নান করেন। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে সেই স্নান’ই বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই আগেভাগেই সতর্ক প্রশাসন।

শুধু পর্যটক কিংবা পুণ্যার্থী নয়, মৎস্যজীবীদের নিয়েও বাড়ানো হয়েছে সতর্কতা। সাগরের ট্রলার ঘাট-সহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে মাঝসমুদ্রে থাকা মৎস্যজীবীদের দ্রুত নিরাপদ জায়গায় ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী ২৫ তারিখ পর্যন্ত সমুদ্রে যাওয়ার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নতুন করে কোনও ট্রলার যাতে সমুদ্রে না যায়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় দমকা হাওয়ার সঙ্গে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঘণ্টায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। ফলে সমুদ্র আরও উত্তাল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে উপকূলবর্তী নিচু এলাকাগুলিতে জল ঢোকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সাগর দ্বীপের নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিয়েও সতর্ক প্রশাসন। বিশেষ করে কাঁচা বাড়িতে বসবাসকারী মানুষদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। দুর্যোগের সময় যাতে কোনওরকম বিপদ না ঘটে, তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সমুদ্রের কাছাকাছি থাকা মানুষদের অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে যাতে কেউ সমুদ্রের ধারে না যান, সেদিকেও নজর রাখছেন পুলিশ ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণকাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী।গঙ্গাসাগর শুধু তীর্থস্থানই নয়, দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রও। ফলে প্রতিদিনই বহু মানুষ এখানে আসেন।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে যাতে পর্যটক কিংবা পুণ্যার্থীদের নিয়ে কোনওরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেই কারণেই আগেভাগে সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপকূলের বাসিন্দাদের আগামী কয়েক দিন আবহাওয়ার আপডেটের দিকে নজর রাখার আবেদন জানানো হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর ও প্রশাসনের তরফে জারি করা সমস্ত নির্দেশিকা মেনে চলার কথাও বলা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই গঙ্গাসাগরের বিভিন্ন প্রান্তে চলছে মাইকিং। সমুদ্রের ঢেউ যতই উত্তাল হচ্ছে, ততই জোরদার হচ্ছে সতর্কবার্তা। পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের সমুদ্রে না নামার আবেদন। মৎস্যজীবীদের দ্রুত নিরাপদে ফিরে আসার নির্দেশ। নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার বার্তা। সব মিলিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গঙ্গাসাগরে এখন সতর্কতার আবহ। প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে কোনওরকম ঝুঁকি নয়—প্রশাসনের একটাই বার্তা, সতর্ক থাকুন, নিরাপদে থাকুন এবং দুর্যোগ না কাটা পর্যন্ত সমুদ্র থেকে দূরে থাকুন।
বুধবার ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা কোন কোন জেলায়?
বুধবার থেকেই বৃষ্টির দাপট বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া-সহ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতেও দুর্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকাতেও দিনভর আকাশ মেঘলা থাকার পাশাপাশি দফায় দফায় বৃষ্টি হতে পারে।
বৃহস্পতিবারেও কড়া সতর্কতা জারি
বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। উপকূলবর্তী এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। অন্ধ্র ও ওডিশা উপকূলে ইতিমধ্যেই সমুদ্র উত্তাল থেকে অতি উত্তাল হওয়ার সতর্কতা রয়েছে।
শুক্রে বৃষ্টি বাড়বে উত্তরেও
এর পরে শুক্রবার উত্তরবঙ্গে বৃষ্টির দাপট বাড়তে পারে। জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে অতি ভারী থেকে প্রবল বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দার্জিলিং, কালিম্পং, কোচবিহার-সহ একাধিক জেলাতেও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। দক্ষিণবঙ্গে অবশ্য বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি চলবে।

কবে থেকে আবহাওয়ার উন্নতি?
তবে শনিবার থেকে দক্ষিণবঙ্গে ধীরে ধীরে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে পারে। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা তখনও থাকবে। রবিবার দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ার উন্নতি হতে পারে। ফলে পুজোর আগে ফের রোদের দেখা মিলতে পারে বলে আশা আবহাওয়াবিদদের।
ওডিশাতেও সতর্কতা
অন্যদিকে, অতি গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে ওডিশারও একাধিক এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীর জলস্তর বাড়া এবং নিচু এলাকায় জল জমার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ওডিশার কয়েকটি জেলায় স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, পুজোর প্রস্তুতির ঠিক আগে আরও এক দফা দুর্যোগের মুখে বাংলা। যা চিন্তা বাড়িয়েছে প্রতিমা শিল্পী থেকে প্যান্ডেল নির্মাতা ও আয়োজকদের। বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টির দাপট থাকলেও সপ্তাহান্তে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

