তৃণমূলের অ্যাকাউন্টে ৭ কোটি জমা , শেষমেশ বলেই ফেললেন অভিষেকের নাম ,শালবনি জমি কেলেঙ্কারির তদন্তে জেরায় সুমিত জানিয়েছে, দাবি সিআইডির
deshersamay

পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনী জমি কেলেঙ্কারি মামলায় এবার জুড়ল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নাম। সূত্রের খবর, আট দিনের সিআইডি হেফাজতে থাকাকালীন সুমিত রায়কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন গোয়েন্দারা। তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। সূত্রের খবর, সেখানে সুমিত রায় দাবি করেছেন, তিনি যা করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে। বিএনএসএস ১৮০ ধারায় জবান বন্দিতে সুমিত রায় বলেছেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর কোষাধ্যক্ষের নির্দেশে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়েছেন তিনি।”

সরকারি জমির ভুয়ো নথি তৈরি করে বিক্রি করার অভিযোগে ইতিমধ্যেই এই মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে সুমিত, প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা-সহ তাঁর কয়েক জন শাগরেদকে।

সিআইডি হেফাজতে থাকা সুমিতকে শনিবার মেদিনীপুর আদালতে হাজির করানো হয়। সূত্রের খবর, শনিবার আদালতে সিআইডির পক্ষ থেকে যে নথি পেশ করা হয়, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, জেরায় সুমিত তদন্তকারী আধিকারিকদের কাছে জানিয়েছেন, অভিষেকের নির্দেশে সাংসদের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে পরিচিত ‘টি ঘোষ’ নামে এক ব্যক্তি তাঁকে টাকা দিয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় তহবিলে জমা করার জন্য। সুমিত দাবি করেছেন, সেই টাকাই তিনি জমা করেছিলেন ব্যাঙ্কে। তিনি জমি জালিয়াতির কোনও টাকা পাননি বলে দাবি সুমিতের। তবে দলের নির্দেশে বেশ কয়েক বার শালবনি গিয়েছিলেন। এমনটাই তদন্তকারীদের কাছে জানিয়েছেন বলে দাবি সিআইডির।

চলতি মাসের গোড়ায় মেদিনীপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয়ের বিরুদ্ধে জমা পড়া চার্জশিটে সিআইডি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নম্বর উল্লেখ করে আদালতে জানায়, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ওই নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে প্রায় ৭ কোটি টাকা দফায় দফায় জমা করেছিলেন সুমিত। সেই সংক্রান্ত নথিও চার্জশিটের সঙ্গে আদালতে জমা দেয় সিআইডি।
তদন্তে উঠে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোড শাখায় ওই অ্যাকাউন্টটি পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল যুব কংগ্রেসের নামে নথিভুক্ত। সেই অ্যাকাউন্টে কেন সুমিত ওই বিপুল পরিমাণ টাকা জমা করেছিলেন? সিআইডি শনিবার আদালতে জানিয়েছে, সেই প্রশ্ন করাতেই সুমিতের দাবি, তিনি সাংসদ অভিষেকের নির্দেশে ওই টাকা ‘পার্টি ফান্ডে’ জমা করেছিলেন। টাকা দিয়েছিলেন ‘টি ঘোষ’।

সিআইডি আধিকারিকদের দাবি, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যেই শালবনির এই জমি জালিয়াতি হয়েছিল। মেদিনীপুরের প্রাক্তন বিধায়কের বিরুদ্ধে জমা দেওয়া চার্জশিটে অভিষেকের দুই দেহরক্ষী এবং সুজয়ের গাড়িচালকদের বয়ান হাতিয়ার করে সিআইডি জানিয়েছিল, ওই সাক্ষীরা সুজয়ের সঙ্গে সুমিতের টাকার লেনদেন দেখেছেন। এমনকি, সুজয় কলকাতায় সুমিতের অফিসে এসে টাকা দিয়ে গিয়েছেন এমনটাও সাক্ষীরা জানিয়েছেন। সিআইডির দাবি, সুমিতের নিজস্ব কোনও অফিস নেই। হয় ক্যমাক স্ট্রিট, নয় তো কালীঘাটে সাংসদ অভিষেকের কার্যালয়ই তাঁর অফিস হিসেবে পরিচিত।
তদন্তকারীদের দাবি, সুমিত তাঁর বয়ানে সাত কোটির ওই লেনদেনের দায় পুরোটাই সাংসদের ঘাড়ে চাপিয়েছেন। তবে তাঁর বয়ান কতটা ঠিক, সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিআইডির এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘সুমিত নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা না দিয়ে পার্টির অ্যাকাউন্টে যখন জমা করেছেন, সেটা তাঁর নিজের সিদ্ধান্তে হতে পারে না।’’ সেই কারণেই সিআইডি আধিকারিকেরা সুমিতের উল্লেখ করা ‘টি ঘোষ’-এর বয়ান বয়ান রেকর্ড করতে চলেছেন। সূত্রের খবর, ওই টাকার উৎস জানাতে পারেননি সুমিত। তার বয়ান সঠিক প্রমাণিত হলে, ওই টাকার উৎস জানতে এই মামলায় সাংসদ অভিষেককেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত সিআইডি আধিকারিকদের।

শনিবার সুমিত ছাড়াও, এই মামলায় ধৃত লক্ষ্মী ভুঁইয়া, নিত্য রায় এবং অমিত ঘোষকে আদালতে হাজির করানো হয়। সরকারি আইনজীবী সৈয়দ নাজিম হাবিব, তদন্তের এই অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে ফের সুমিত-সহ বাকিদের জেরা করা দরকার বলে জানান। তাঁরা সাত দিনের সিআইডি হেফাজতের আবেদন জানিয়েছেন। সুমিতের আইনজীবী প্রথমে জামিনের আবেদন করলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেন। আদালত সুমিত-সহ ধৃতদের পাঁচ দিনের সিআইডি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। ধৃতদের কাছ থেকে পাঁচটি মোবাইল সহ একাধিক নথি উদ্ধার হয়েছে বলে আদালতে জানিয়েছে সিআইডি। ফের ২৪ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির করানো হবে সুমিত-সহ ধৃতদের।

তবে সিআইডি আধিকারিকদের ইঙ্গিত, সুমিতের এই বয়ান গোটা তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করে দিয়েছে।
