অসুখে স্ত্রীর হাসি ম্লান , বউয়ের টোল পড়া গালের স্মৃতি আঁকড়ে মূর্তি গড়লেন মধ্যমগ্রামের ৮৮ বছরের শিক্ষক
deshersamay

‘‘তার ঘর পুড়ে গেছে অকাল অনলে/তার মন ভেসে গেছে প্রলয়ের জলে/তবু সে এখনো মুখ দেখে চমকায়/
এখনো সে মাটি পেলে মূর্তি বানায়।’’

কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা জীবনসত্য হয়ে ফুটে উঠেছে অশীতিপর ভূপতিরঞ্জন দেবনাথের নিভৃতবাসে। প্রায় ছয় দশকের যৌথ জীবনগাথা, সংসার সামলানো আর জীবনের নানা ওঠাপড়ার সমান্তরালে স্ত্রীর ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা অমলিন হাসিটুকুতেই বেঁচে থাকার পরম আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কালগ্রাসে সত্তর পেরোনো অঞ্জলি দেবনাথ আজ দীর্ঘ দিন ধরে জরাগ্রস্ত ও রোগশয্যায় শায়িত। যে সময় ও ব্যাধি স্ত্রীর সেই চেনা স্মিতহাস্য কেড়ে নিয়েছে, ঠিক তখনই সেই রূপকে চিরন্তন রূপ দিতে মাটি দিয়ে অর্ধাঙ্গিনীর প্রতিমা গড়ে তুললেন ৮৮ বছর বয়সের প্রবীণ শিল্পপ্রেমী।

স্ত্রী হাসলে তাঁর ঠোঁটের দু’পাশে ছোট্ট দুটো টোল ফুটে উঠত। প্রায় ৬০ বছরের বছরের দাম্পত্য, সংসার সামলানো, সন্তানদের বড় করা, হাজারও ওঠাপড়ার মধ্যে অঞ্জলির ওই হাসিটুকু আজও অমলিন ভূপতিরঞ্জনের মনে। কিন্তু সত্তর পার করা অঞ্জলির মুখে আর হাসি নেই। দীর্ঘ দিন ধরে তিনি রোগশয্যায়। স্ত্রীর স্মিত মুখকে অমরত্ব দিতে তাঁর হাসিমাখা মুখের মূর্তি তৈরি করলেন ৮৮ বছরের বৃদ্ধ।

উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা এবং মধ্যমগ্রাম হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ নিছক পেশাগত জীবনের বাইরেও দীর্ঘ চার দশক ধরে একমনে শিল্পচর্চা করে গিয়েছেন। কাঠ, মাটি, নারকেলের মালা কিংবা গাছের ডালের মতো অতি সাধারণ গৃহস্থালি উপকরণেই তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নানাবিধ মডেল ও ভাস্কর্য। ক্যানভাসে তাঁর তুলির সোপানে জীবন্ত হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খান, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান এবং মান্না দে-র মতো ব্যক্তিত্বরা। বহু প্রদর্শনীতে প্রশংসিত হয়েছে তাঁর কাজ।

প্রতিবেশীদের কথায়, দীর্ঘ জীবনে নানা ব্যক্তিগত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন ভূপতিরঞ্জন। করোনার সময় পুত্রকে হারিয়েছেন। পুত্রবধূ, নাতি-নাতনি তাঁর কাছেই থাকেন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সমস্ত কিছুর মধ্যে দেবনাথ দম্পতির মিল দেখার মতো। কিন্তু সেই স্ত্রী যখন শয্যাশায়ী হলেন, একাকিত্ব যেন গ্রাস করেছিল বৃদ্ধকে। ‘‘আসলে তখনই তো মানুষ শিল্পের দিকে ঝোঁকেন’’, বলছিলেন এক প্রতিবেশী। তবে জীবনের সায়াহ্নে এসে স্ত্রীর এই আবক্ষ মূর্তি নির্মাণ তাঁর শিল্পযাত্রার সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও আবেগঘন অধ্যায়।

বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়া প্রবীণের পেনশনের সামান্য টাকায় সংসার চলে। তার ওপর শয্যাশায়ী স্ত্রীর সই নিতে না পারায় যৌথ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে প্রতিদিনের প্রশাসনিক ভোগান্তি তো রয়েছেই। কিন্তু জীবনের এই নিঃসঙ্গতা ও ক্ষয়িষ্ণুতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন নিজের সৃষ্টির কাছে।

রোগাক্রান্ত স্ত্রীর পাশে নিজের হাতে গড়া তাঁর যুবতী বয়সের হাসিমুখের প্রতিমাটি দেখে যখন প্রবীণ শিক্ষকের চোখের কোণে জল নেমে আসে, তখন ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। বাস্তব যেখানে সময়ের নিয়মে সব কিছু কেড়ে নেয়, সেখানে শিল্পের ছোঁয়ায় ভালবাসাকে অমরত্ব দেওয়ার নীরব জয়গাথা লিখে চলেন ভূপতিরঞ্জন।
