বিদ্রোহীদের জন্য দরজা বন্ধ, জেলায় সংগঠন গুছোতে নামছেন তৃণমূল নেত্রী, ‘পাশবালিশ না হয়ে তারকাটা বিজেপি পার্টিতেই যান’, ২১-এর মঞ্চ থেকে ঋত-শিবিরকে খোঁচা মমতার
deshersamay


কলকাতা : দলের স্ট্যাটাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের শহিদ সমাবেশের ঠিকানা বদলে গিয়েছে ক্যাথিড্রাল রোডে। সেই সভামঞ্চ থেকে মঙ্গলবার বক্তব্যের ছত্রে ছত্রে তৃণমূল নেত্রী বুঝিয়ে দিলেন, তিনি এবং তাঁরাই ‘আসল তৃণমূল’। ক্যাথিড্রালের অনতিদূরে সভার আয়োজন করা ঋতব্রত গোষ্ঠীর সঙ্গে সঙ্গে মমতার নিশানায় বিজেপি সরকারও। দলত্যাগী বা বিদ্রোহীরা যে চাইলেও আর তিনি ফেরাবেন না, তাও এ দিন স্পষ্ট করে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের রাশ কড়া হাতে ধরতে খুব শীঘ্রই জেলায় জেলায় ঘর গুছোতে নামবেন নেত্রী, সেই ঘোষণা একুশের সভা থেকেই করে দিলেন তিনি।


দল ভাঙার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম একুশে জুলাই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মসূচি থেকে বিরোধী বিজেপির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আক্রমণের মুখে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যাওয়া শিবির। বিড়লা তারামণ্ডল চত্বরে আয়োজিত সমাবেশ থেকে একের পর এক তোপ দাগলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কখনও তাঁদের বিজেপির ‘বি-টিম’ বলে কটাক্ষ করলেন, কখনও সরাসরি বিজেপিতেই যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। একই সঙ্গে দলের প্রতীক, দলীয় সম্পদ এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা আইনি লড়াই নিয়েও কড়া বার্তা দিলেন তৃণমূল নেত্রী।

এ দিন সভায় আসা কর্মীদের তিনি জানিয়ে দেন, শীঘ্রই জেলায় জেলায় কর্মসূচি করবেন। অনুমতি না পেলেও রাস্তায় নেমে লড়াইয়ের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তৃণমূল সুপ্রিমো। তিনি বলেন, ‘এর পরে আমি জেলায় জেলায় বের হব। কত ক্ষমতা আছে দেখতে চাই। আপনারা তো বালিশের কোলে লুকিয়ে থাকেন ইঁদুরের মতো লড়াই করেন। আর আমরা সুন্দরবনের বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই করি, এটাই তফাৎ।’

ভাষণের শুরুতেই বিজেপিকে নিশানা করে মমতা অভিযোগ করেন, তাঁদের একুশে জুলাইয়ের কর্মসূচি বানচাল করার একাধিক চেষ্টা হয়েছে। তাঁর দাবি, বিড়লা তারামণ্ডলের সভাস্থলে ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং শব্দ সম্প্রচারের সংযোগও কেটে দেওয়া হয়েছে। মমতার অভিযোগ, ‘‘ওরা তারকাটা পার্টি। গুন্ডা পাঠিয়ে ভাঙচুর করেছে। সভা ভেস্তে দেওয়ার অনেক চেষ্টা হয়েছে। সারারাত পাহারা দিতে হয়েছে। এমনকি মঙ্গলবার সকালেও আমাকে আটকানোর চেষ্টা হয়েছিল। বিজেপির লুম্পেনরা আমার বাড়ির সামনে মিছিল করেছে।’’ তবে সেই সব চেষ্টায় কোনও লাভ হয়নি বলেই দাবি করেন তিনি। নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মমতা বলেন, ‘‘ওরা জানে না, আমার শুধু একটি প্ল্যান থাকে না। আমার প্ল্যান ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ – সবই তৈরি থাকে।’’

এরপরই তাঁর আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির। নাম না করেই তিনি বলেন, এই নতুন শিবির আদতে বিজেপির ‘বি-টিম’ ছাড়া আর কিছু নয়। দলত্যাগীদের উদ্দেশে তাঁর কটাক্ষ, ‘‘আমরা বেঁচে গেছি, চোরগুলো বিজেপিতে চলে যাচ্ছে। তাঁদের বলব, এ ভাবে বিজেপির পাশবালিশ হয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। সরাসরি বিজেপিতেই যোগ দিন। আপনাদের জায়গা দলের ছাত্র-যুবরাই নিয়ে নেবে।’’

শুধু তাই নয়, দল ভেঙে নতুন শিবির তৈরি করলেই আসল তৃণমূল হওয়া যায় না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘ভয় দেখিয়ে কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য চুপ করানো যায়। কিন্তু আসল তৃণমূল আমরা। শুধু সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিলেই দল হয়ে যায় না। ওটা বিজেপির সাইনবোর্ড। কয়েকজন নেতা চলে গিয়েছেন, কিন্তু কর্মীরা এখনও আমাদের সঙ্গেই আছেন।’’

দুই শিবিরের মধ্যে ইতিমধ্যেই দলীয় প্রতীক, অর্থ এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে বিরোধ শুরু হয়েছে এবং যা কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে, সেই প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির নিজেদেরই প্রকৃত তৃণমূল বলে দাবি করছে। সেই দাবির জবাবও সভামঞ্চ থেকেই দেন মমতা।

তৃণমূল নেত্রীর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, ‘‘প্রতীক কেড়ে নেবেন? টাকা কেড়ে নেবেন? সম্মান কেড়ে নেবেন? আমি গদ্দারদের ছেড়ে কথা বলব না। ব্যাট-বলের খেলা হবে। আমার প্রতীক কেড়ে নিলে আমি চুপ করে বসে থাকব না। প্রয়োজন হলে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাব। আর তোমাদেরও সবকিছু কেড়ে নেব।’’ দলত্যাগীদের উদ্দেশে আরও একবার কটাক্ষ ছুড়ে তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের আর প্রয়োজন নেই। ধনে, মানে, প্রাণে ভাল থাকুন। নতুনদের নিয়েই নতুন করে লড়াই হবে।’’

সভায় উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশেও বার্তা দেন মমতা। তাঁর কথায়, রাজনৈতিক লড়াইয়ে ভয় পেলে চলবে না। কেউ গ্রেফতার হলেও মনোবল হারানোর প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, ‘‘কারও যদি গ্রেফতারও করা হয়, ভয় পাবেন না। কিছুদিন না হয় জেলেই থাকবেন। বিজেপির ভাত খাওয়ার থেকে জেলের ভাত খাওয়া অনেক ভাল।’’

মমতার কথায়, ‘‘বহু চক্রান্ত করেও আমাদের আটকানো যায়নি। দরকার হলে আমরা আবার ১৯৯৭ সালে ফিরে যাব। আর যতক্ষণ না আপনাদের হারাতে পারছি, ততক্ষণ থামব না। আমার কণ্ঠরোধ করে দিলেও ব্যাকআউট করব না, আপনাদের ব্ল্যাকআউট করব।’’
দল ভাঙার পর প্রথম একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আক্রমণাত্মক বার্তা স্পষ্ট করে দিল, আগামী দিনে বিজেপির পাশাপাশি দল ছেড়ে যাওয়া নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও সমান তীব্র রাজনৈতিক লড়াই চালাতে প্রস্তুত তাঁর শিবির।
