সিন্দ্রাণী গ্রামের প্রতিবন্ধী যুবক রিপণের তৈরী রথ এক অনন্য জীবনদর্শন : দেখুন ভিডিও
deshersamay

অর্পিতা বনিক ও নিবেদিতা সাহা : হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে এই রথযাত্রা এক অনন্য বার্তা বহন করে। এখানে ঈশ্বর অপেক্ষা করেন না যে সবাই তাঁর কাছে আসবে; বরং তিনি নিজেই মানুষের দুয়ারে পৌঁছে যাওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
কিন্তু এই রথ কি নিজে নিজে চলে? না।

সারা বছর জগন্নাথদেব পুরীর মন্দিরের গর্ভগৃহে অধিষ্ঠিত থাকেন। ভক্তরা তাঁর দর্শনের জন্য মন্দিরে যান। কিন্তু বছরে একবার, রথযাত্রার দিনে, তিনি নিজেই গর্ভগৃহ ছেড়ে রথে আরোহণ করে মানুষের পথে নেমে আসেন। তিনি যেন নিজেই তাঁর সন্তানদের কাছে চলে আসেন।
সম্মিলিত ভালোবাসা ও সহযোগিতার শক্তিই পারে অচলকে সচল করতে, হতাশাকে আশায় রূপ দিতে, আর একজন মানুষকে আবার সমাজের শক্তিতে পরিণত করতে। তারই প্রমাণ মিলল উত্তর ২৪ পরগনার বাগদার সিন্দ্রাণীগ্রামের রথ যাত্রায় ।

শারীরিকভাবে অক্ষম ৷ দু’ পা হারিয়ে জীবনের মানে ভুলে গিয়েছিল সিন্দ্রাণীর রিপন বালা ৷ জগন্নাথ ঠাকুরের জীবন কাহিনী তাকে একদিন নতুন করে বাঁচতে শেখায়৷ তারপর থেকে নিজের হাতে রথ তৈরী করে রথযাত্রা পালন করে আসছেন তিনি৷ সোজা রথ উল্টো রথ ৷ কয়েক হাজার মানুষ৷ প্রসাদ ৷ পূজার্চনা- বাগদার সিন্দ্রাণী এলাকার এক অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ৷ আর সেই রথকে ঘিরেই মেতে থাকেন এলাকার বহু মানুষ ৷
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রিপন বালা নিজের হাতে রথ তৈরী করেন ৷ ভক্তরা দলে দলে এসে জগন্নাথদেবের ভোগ রান্না করেন৷ জগন্নাথের পুজো সেরে প্রসাদ গ্রহণ করেন সবাই মিলে ৷দেখুন ভিডিও
রিপন বালা বলেন , এবারও রথ যাত্রার সোজা রথে- বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন ৷ রথের দড়ি টেন ঠাকুরের আশীর্বাদ নিয়েছেন ভক্তরা ।উল্টো রথেও ভিড় করবেন পুণ্যার্থীরা ।

ভক্তদের কথায়,রথ আসে রথ যায় জগন্নাথ দেব মাসির বাড়ি থেকে ফের বাড়িতে ফেরেন। আর তাকে সাক্ষী রেখেই জীবনের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নতুন সূর্য দেখার অপেক্ষায় জগন্নাথ ঠাকুরের সাধনা করে চলেছেন রিপন ও তার পরিবার৷ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন তারা ৷
রথযাত্রা আমাদের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবতার, সহযোগিতার, সহমর্মিতার এবং সম্মিলিত শক্তির উৎসব। আসুন, আজ আমরা শুধু রথের দড়ি না টানি; একজন অসহায় মানুষের হাতও ধরি। শুধু জগন্নাথকে পথে না আনি; একজন থেমে যাওয়া মানুষকেও জীবনের পথে ফিরিয়ে আনি।একটি সহানুভূতির স্পর্শ কিংবা একটি বাড়িয়ে দেওয়া হাত—অনেক সময় একজন মানুষের জীবনকেই নতুন করে শুরু করার শক্তি দেয়।

যেমন মানুষের হাতে জগন্নাথের রথ এগিয়ে চলে, তেমনি মানুষের হাত ধরেই একজন মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। তিনি আবার পরিবার, সমাজ ও দেশের সম্পদ হয়ে উঠতে পারেন।
এই সিন্ত্রাণীগ্রাম্য রথের মেলায় এখানে জাত, বর্ণ, ধনী-গরিব, উচ্চ-নীচ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ একসঙ্গে দাঁড়ায়। একই রথ, একই দড়ি, একই আনন্দ, একই প্রার্থনা। বিভেদের পরিবর্তে সৃষ্টি হয় ঐক্যের এক অনন্য বন্ধন।
অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত শক্তি, ভালোবাসা, বিশ্বাস, শ্রম ও সহযোগিতায় রথ এগিয়ে চলে। হাজার হাজার মানুষের হাতে ধরা একটি দড়ি—সেই দড়িই অচল জগন্নাথকে সচল করে মানুষের মাঝে নিয়ে আসে।

আমাদের সমাজেও কত মানুষ আছেন—অসুস্থ, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র, হতাশ, একাকী অথবা জীবনের কোনো কঠিন আঘাতে থেমে গেছেন। আমরা অনেক সময় তাঁদের অক্ষম বলে দূরে সরিয়ে রাখি। অথচ একটু সহযোগিতা, একটু সহমর্মিতা, একটু ভালোবাসা, একটু বিশ্বাস—একজন মানুষের জীবনকে আবার সচল করে তুলতে পারে। রিপণের রথযাত্রার এক অনন্য জীবনদর্শন।
