হুমায়ুনের বিরুদ্ধে ২টি FIR,‘এ রকম লাগামছাড়া কথা বলতে দেবো না, দেবো না, দেবো না,ধরে নিন এটাই আপনার শেষ বক্তব্য!’ চরম হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর
deshersamay

বিধানসভার কক্ষে দাঁড়িয়ে নওদার আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে নজিরবিহীন ভাষায় হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । উস্কানিমূলক ও আইন অমান্য করার বার্তা দেওয়ার অভিযোগে বিধায়কের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “ধরে রাখতে পারেন, এটাই ওঁর শেষ বক্তব্য।”

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কোনও রকম উস্কানিমূলক কথা এই সরকার বরদাস্ত করবে না। হুমায়ুনের বিরুদ্ধে ২টি FIR দায়ের করা হয়েছে, সোমবার বিধানসভায় জানান শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘এ রকম লাগামছাড়া কথা বলতে দেবো না, দেবো না, দেবো না। সময় এসেছে এই ধরনের লোককে সবক শেখানোর।’
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাকে পরিষ্কার বলছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী নন। আপনি দুর্বল মুখ্যমন্ত্রী পেয়ে যা খুশি করেছেন, যা খুশি বলেছেন। আমি আপনাকে বলে গেলাম, আমরা ২টো FIR করেছি। একটা রেজিনগর থানায়, একটা শক্তিপুর থানায়।’

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে মুর্শিদাবাদের নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর এই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন। শুভেন্দুর দাবি, ভরতপুর, রেজিনগর ও নওদায় সমস্ত নির্বাচিত পঞ্চায়েত (যে দলেরই বোর্ড থাকুক) ভেঙে সেই সদস্যদের হুমায়ুন তাঁর দল AJUP-এ নিয়ে যেতে চান। সেটা করতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, হুমায়ুন দু’টি সিটে জিতেছেন। নিয়ম মেনে রেজিনগর থেকে রিজ়াইন করেছেন। আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে উপনির্বাচন হবে সেখানে। সেখানে ছেলেকে জেতাতে চাইছেন। ৭২ শতাংশ মুসলিম ভোট আছে সেখানে। সেই ভোট পেতেই এই ‘খেলা’ খেলছেন।
পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের সঙ্গে আলোচনার পর, স্পিকারের অনুমতি নিয়ে সোমবার হাউসের সামনে হুমায়ুন কবীরের দুটি বিতর্কিত ভাষণের হুবহু খতিয়ান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। এর পরেই কড়া ভাষায় তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, রাজ্যে আর গুন্ডারাজ বরদাস্ত করা হবে না।

এদিন মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় হুমায়ুন কবীরের দু’টি নির্দিষ্ট ভাষণের উল্লেখ করেন ..
প্রথম ঘটনা (রেজিনগর):
গত ২৬ জুন বিকেলে রেজিনগরের কাশিপুরে একটি দলীয় সভায় বিজেপি নেত্রী অনামিকা ঘোষ ও বিজেপির নির্বাচনী সাফল্যকে কটাক্ষ করেন হুমায়ুন। শুভেন্দু অধিকারীর উদ্দেশে সেখানে নওদার বিধায়ককে বলতে শোনা যায়, “মুর্শিদাবাদে আস্ফালনটা একটু কম করবেন। আমি যেদিন ময়দানে মুসলমানদের নিয়ে নেমে যাব না, সেদিন এমন সাটা ভাঙা মার শুরু করবে যে আপনাদের পতাকা বহন করার লোক থাকবে না।” বহরমপুর সেন্ট্রাল জেলের ধারণক্ষমতার তোয়াক্কা না করে লাখে লাখে মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে জেল ভরার ও আইন নিজের হাতে নেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। এমনকি মাথা গরম হলে এসপি বা চিফ মিনিস্টার— কাউকেই তোয়াক্কা না করার বার্তা দেন হুমায়ুন।
দ্বিতীয় ঘটনা (শক্তিপুর):
গত ৮ তারিখ শক্তিপুরের দুয়ারা ঘাটে নিজের ভাইপোর গ্রেফতারির প্রসঙ্গে স্থানীয় ওসির বিরুদ্ধে চরম আক্রমণাত্মক ও অশালীন ভাষা প্রয়োগ করেন বিধায়ক। ওসির চোদ্দো পুরুষের নাম ভুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি ১০ হাজার লোক নিয়ে থানা ঘেরাও করে ওসিকে কলার ধরে বার করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
হুমায়ুন কবীরের এই দুই বয়ান পেশ করার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কড়া সুরে বলেন, “এনাফ ইজ এনাফ। এই ধরনের লোককে সবক শিখানোর সময় এসে গেছে।” প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আপনাকে পরিষ্কার বলছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন মুখ্যমন্ত্রী নন। আপনি দুর্বল মুখ্যমন্ত্রী পেয়ে এতদিন যা খুশি করেছেন, যা খুশি বলেছেন। কিন্তু এখন আর তা চলবে না।”
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ইতিমধ্যেই হুমায়ুনের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র একাধিক ধারা মিলিয়ে দু’টি সুনির্দিষ্ট এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে।
হুমায়ুন কবীর কেন এমন বেপরোয়া আচরণ করছেন, তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, এর নেপথ্যে দুটি সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা রয়েছে। প্রথমত, ভরতপুর, রেজিনগর ও নওদার নির্বাচিত পঞ্চায়েতগুলি ভেঙে গায়ের জোরে নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বিধায়ক। দ্বিতীয়ত, রেজিনগর আসনটিতে আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে উপনির্বাচন হতে চলেছে, যেখানে হুমায়ুন তাঁর ছেলেকে জেতাতে মরিয়া। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ওই অঞ্চলের ৭২ শতাংশ মুসলিম ভোটকে নিজেদের সপক্ষে মেরুকরণ (Consolidate) করার জন্যই এই বিপজ্জনক খেলা খেলছেন নওদার বিধায়ক।

অতীতে আইন অমান্য করা তিন প্রভাবশালী ‘বাহুবলী’র পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে হুমায়ুনকে ২৫ বার ভেবে কথা বলার পরামর্শ দেন শুভেন্দু। তিনি নাম না করে উদাহরণ দেন, সন্দেশখালির এক নেতার, যে ২০২৪-এর শুরুতে তৎকালীন বিরোধী দলনেতার হাত-পা কেটে চামড়া ছাড়ানোর হুমকি দিয়ে আজ শ্রীঘরে। জীবনতলা, ক্যানিং ও ভাঙড়ের এক কুখ্যাত গুন্ডার, যার দাপট আজ তলানিতে। ‘পুষ্পা ঝুঁকেগা নেহি’ সংলাপ আওড়ানো অন্য এক বাহুবলীর, যে আজ খালি পায়ে, ছোট প্যান্ট পরে কান ধরে ওঠবোস করতে করতে যাচ্ছে।
বক্তব্যের শেষে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, “কারও বাপের লাল শেষ কথা বলে না, শেষ কথা বলে ভারতবর্ষের সংবিধান ও আইন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আমি নিজে মুর্শিদাবাদ যাচ্ছি এবং সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে দেখাব। যাঁরা আপনাকে ডেকেছিলেন, আগে তাদের তুলব। তারপর আপনার কাছে যাব।”

