অরুণাচলে ভারতের জমি দখল করেছে চিন? সীমান্তে আতঙ্ক, ভয়াবহ অভিযোগ জনজাতিদের
deshersamay

উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচলপ্রদেশে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) সংলগ্ন তাকসিং সেক্টর ঘিরে নতুন করে তৈরি হল উদ্বেগ। আপার সুবানসিরি জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী ‘নাহ’ সম্প্রদায়ের জনজাতিদের সংগঠন ‘নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ (এনডব্লিউএস) অভিযোগ করেছে, গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে তাদের জমি দখল করে নিয়েছে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)। সংগঠনের দাবি, ভারতের জমির ভিতরেই চিনা সেনা রাস্তা, সেতু, সেনা শিবির-সহ স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই।

যদিও এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে কেউ যাচাই করেনি এখনও। জেলা প্রশাসন বা কেন্দ্রীয় সরকারের তরফেও এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি
২৬ জুন আপার সুবানসিরি জেলার ডেপুটি কমিশনারের কাছে একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি জমা দেয় নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। সংগঠনের সভাপতি কেরু চাদর ওই স্মারকলিপিতে জানান, গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে তাকসিং সেক্টরে চিনের গতিবিধি ক্রমশ বেড়েছে। তবে ২০২০ সালের পর সেই তৎপরতা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংগঠনের অভিযোগ, যে সব এলাকা একসময় স্থানীয় মানুষ শিকার, গবাদি পশু চরানো, বনজ সম্পদ সংগ্রহ এবং ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করতেন, সেগুলি এখন চিনা সেনার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই এলাকাগুলিতে পিএলএ স্থায়ী রাস্তা, সেতু, সেনা শিবির এবং অন্যান্য সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

পাঁচটি নির্দিষ্ট এলাকার উল্লেখ
স্মারকলিপিতে পাঁচটি নির্দিষ্ট এলাকার নাম উল্লেখ করেছে নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। সেগুলি হল— আসাফিলা এলাকার ওয়িং (Oying), চুজারতা এলাকার পানিয়ার (Paniar), মারনাফে এলাকার মারপান (Marpan), পোট্রাং হ্রদ (Potrang Lake) এবং টিনডিংটাং (Tindingtang-TG)।
সংগঠনের দাবি, এই এলাকাগুলির কয়েকটি তাকসিং সদর দফতরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। আবার পোট্রাং হ্রদ-সহ কিছু অঞ্চল স্থানীয়দের কাছে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সেগুলিৎসারি (Tsari) অঞ্চলের তীর্থস্থানের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। স্থানীয়দের দাবি, ২০২০ সাল পর্যন্ত এই সমস্ত এলাকাই ভারতের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর থেকে সেখানে চিনা সেনার উপস্থিতি দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

‘প্রতিদিন ইঞ্চি ইঞ্চি করে জমি হারাচ্ছি’
স্মারকলিপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে কেরু চাদর লিখেছেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের কেনা জমি ধীরে ধীরে চিনা সেনার দখলে চলে গিয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, “ভারতীয় সেনার উপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। বহু বছর ধরে তাঁরা আমাদের ভূমি রক্ষা করে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে তাঁদের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। তাকসিং এলাকায় পিএলএ-র উদ্দেশ্য এবং যেভাবে তারা দ্রুত এগোচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা প্রতিদিন ইঞ্চি ইঞ্চি করে নিজেদের জমি হারাচ্ছি।”
এই পরিস্থিতিতে অরুণাচলপ্রদেশ সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অবিলম্বে সীমান্ত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার আবেদন জানিয়েছে সংগঠনটি।
প্রাক্তন বিধায়কের উদ্বেগ
এমন অভিযোগ সামনে আসতেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অরুণাচলপ্রদেশের প্রাক্তন বিধায়ক তথা ন্যাশনাল পিপলস পার্টির নেতা পাকঙ্গা বাগে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে গোটা বিষয়টা। ফিরিয়ে এনেছে ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের স্মৃতি।’
স্মারকলিপির সঙ্গে জমা দেওয়া ছবিগুলির উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ওয়িং, পানিয়ার, মারপান, পোট্রাং হ্রদ এবং টিনডিংটাং এলাকায় চিনা সেনা স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডুকে দ্রুত অভিযোগগুলির সত্যতা যাচাই করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় কৌশলগত পদক্ষেপেরও আবেদন করেন।

একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, অরুণাচলের সাংসদ এবং রাজ্য সরকারের কাছে তাকসিং সেক্টরের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নাচো বিধায়কেরও একই দাবি
নাচো কেন্দ্রের বিধায়ক নাকাপ নালোও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত এই ধরনের অভিযোগ প্রশাসনের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলি সত্যি হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে ফের বিতর্ক
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর ফের অরুণাচলপ্রদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মাত্র এক মাস আগে পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত তেচি গুবিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, চিনের তুলনায় ধর্মান্তরকরণই অরুণাচলপ্রদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির এই অভিযোগ এবং সীমান্ত এলাকায় চিনা পরিকাঠামোর দাবি সামনে আসার পর জনপরিসরে আবারও সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভূখণ্ড রক্ষার প্রশ্নই প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তাপির গাওয়ের পুরনো বক্তব্যও ফের আলোচনায়
এই বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে অরুণাচলপ্রদেশের লোকসভা সাংসদ তাপির গাওয়ের কয়েক বছর আগের সংসদীয় বক্তব্য। প্রায় ছয় বছর আগে সংসদে তিনি দাবি করেছিলেন, চিন অরুণাচলপ্রদেশে প্রায় ৫০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে। সেই বক্তব্যের ভিডিও আবারও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সম্প্রতি এবং নতুন বিতর্কে তা ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এখনও সরকারিভাবে কিছু জানানো হয়নি
এত গুরুতর অভিযোগ সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত আপার সুবানসিরির ডেপুটি কমিশনারের দফতর, অরুণাচলপ্রদেশ সরকার, ভারতীয় সেনা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বা বিদেশ মন্ত্রকের তরফে কোনও সরকারিভাবে কোনও বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি যে ছবিগুলি জমা দিয়েছে, সেগুলিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ফলে আপাতত বিষয়টি স্থানীয় একটি জনজাতি সংগঠনের গুরুতর অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। তবে সীমান্তের স্পর্শকাতর পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে অভিযোগগুলির দ্রুত সরকারি তদন্ত, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং সীমান্ত সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

