পালাবদলের পর তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠনের পর প্রাক্তন শাসক দলের নেতৃত্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একের পর এক কাটছাঁট করা হচ্ছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) থেকে শুরু করে প্রাক্তন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim), রাজ্যসভার সাংসদ তথা প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমার (Rajiv Kumar)- বহু শীর্ষনেতার নিরাপত্তা ও কনভয় কমিয়ে দিয়েছে নবান্ন। কিন্তু এর বিপরীত দৃশ্য দেখা গেল বারাসতের তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের (Kakali Ghosh Dastidar) ক্ষেত্রে। নিরাপত্তা বাড়ল কাকলি ঘোষ দস্তিদারের (Kakoli Ghosh Dastidar)। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাড়ল কাকলি ঘোষ দস্তিদারের। ওয়াই প্লাস (Y Plus Category) ক্যাটেগরির নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে কাকলিকে।
আজ বুধবার সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় বাহিনী দেখা গিয়েছে তৃণমূলের সাংসদের বাড়ির সামনে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে ওই নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে।
জানা গিয়েছে, সোমবার থেকেই কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে। মধ্যমগ্রামে তাঁর বাড়িতে নিরাপত্তার দায়িত্বে সিআইএসএফ (CISF) জওয়ানদের দেখা গিয়েছে। বিকেলে মধ্যমগ্রাম-বারাসাত সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের কার্যালয়ে বৈঠক করতে যাওয়ার সময়ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ছিল কাকলির সঙ্গে। যেখানে তৃণমূল গদিচ্যুত হতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ফিরহাদ হাকিমের নিরাপত্তা-কনভয় কমেছে, সেখানে হঠাৎ কেন তৃণমূল সাংসদের নিরাপত্তা বাড়ল, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতিই “চার দশকের আনুগত্য” নিয়ে পোস্ট করেছিলেন তৃণমূল সাংসদ। লোকসভায় দলের মুখ্য সচেতক পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেন দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নয় মাস আগে, গত বছরের অগস্ট মাসে যখন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্তফা দিয়েছিলেন, তখন কাকলিকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। হঠাৎ তাঁকে সরিয়ে আবার কল্যাণকে দায়িত্ব দেওয়ার পরই ক্ষোভ উগরে দেন তিনি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কাকলি ঘোষ দস্তিদার লেখেন, “৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪ থেকে পথচলা শুরু। ৪ দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরষ্কৃত হলাম”।
তার আগে কাকলির ছেলে বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদারও একাধিক ‘বিদ্রোহী’ পোস্ট করেছিলেন।
https://www.facebook.com/share/18msBWhkoY/
কাকলিকে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দেওয়ার কারণ সরকারি ভাবে জানানো হয়নি। সূত্রে খবর, রাজ্য বিজেপির নেতৃত্বের দাবি, “ওঁর দলের ভেতর থেকেই হয়তো হুমকি থাকতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে আগের সরকারে সবচেয়ে বেশি খুন-সন্ত্রাস হয়েছে। বিধায়ক থেকে কাউন্সিলর- বহু তৃণমূল নেতা খুন হয়েছেন। কোনও ধরনের আশঙ্কা থাকলে কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে খবর পৌঁছায়। তিনি সাংসদ, তাই কেন্দ্র নিরাপত্তা দিতেই পারে।”
তবে তৃণমূল শিবিরে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে দলের ভিতরে দায়িত্ব হারানোর ক্ষোভ, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সুরক্ষা, এই দুইয়ের সমন্বয়েই কাকলিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু মন্তব্য করেননি। কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে পালাবদলের পর তৃণমূল নেতাদের নিরাপত্তায় কাটছাঁটের মাঝেই কাকলির জন্য কেন্দ্রীয় ‘ওয়াই প্লাস’ সুরক্ষা নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কাকলির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭৬ সালে ছাত্র রাজনীতির সময়ে তাঁদের পরিচয়। সে সময় মমতা ছিলেন যোগমায়া দেবী কলেজের ছাত্রী এবং ছাত্র পরিষদের নেত্রী। অন্যদিকে, কাকলি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ১৯৮৪ সালে মমতার রাজনৈতিক উত্থানের সময় থেকেও তাঁর পাশে ছিলেন তিনি। দীর্ঘ চার দশকের সেই সম্পর্কের উল্লেখই তিনি সমাজমাধ্যমের পোস্টে করেছেন।
গত বছর অগস্টে সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতক পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কাকলিকে। কিন্তু বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবির পর দলীয় সংগঠনে একাধিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছিল। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, কঠিন সময়ে দলের হয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেওয়ার কারণেই ফের কল্যাণকে গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আদালত থেকে রাজনৈতিক মঞ্চ, সাম্প্রতিক সময়ে বারবার দলীয় অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
লোকসভায় মুখ্য সচেতকের পদ হারিয়ে অভিমানী পোস্টের কয়েকদিন পরই কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাড়ায় জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে।



