


বনগাঁ: মতুয়াগড় বনগাঁ উত্তর কেন্দ্র বরাবর তৃণমূলের শক্ত মাটি। পালাবদলের আগে থেকেই মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক জোড়াফুলের পক্ষে ছিল। কিন্তু মতুয়াদের নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বনগাঁ উত্তরে বাজিমাত করেছে বিজেপি। মতুয়াদের বিপুল ভোটে বৈতরণী পার হয়ে ২০২১–এর বিধানসভা নির্বাচনে বনগাঁ উত্তরে বিজেপির বিধায়ক হন অশোক কীর্তনিয়া। তিনি এ বারেও বিজেপির প্রার্থী। তাঁর বিপরীতে রয়েছেন তৃণমূলের বিশ্বজিৎ দাস। বনগাঁ উত্তরে এ বার লড়াই মূলত দুই ফুলের। কেন্দ্রে উন্নয়নের ঘাটতি রয়েছে। রয়েছে তৃণমূলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ক্ষোভের চোরাস্রোতও। কিন্তু সে সব ছাপিয়ে ২০২৬–এর নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর সেই মতুয়ারাই। সার–এর ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া বিপুল সংখ্যক মতুয়াদের ক্ষোভই এ বারের নির্বাচনে প্রধান ইস্যু। ফলে বনগাঁ উত্তরের গেরুয়া শিবিরের প্রার্থীকে এ বার গড় উদ্ধার করতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

তৃণমূল, বিজেপি ছাড়াও বনগাঁ উত্তর থেকে সিপিএমের প্রার্থী হয়েছেন পীযূষকান্তি সাহা। পেশায় স্কুল শিক্ষক। তবে খাতায় কলমে ত্রিমুখী লড়াই হলেও মূল লড়াইটা কিন্তু তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির। ইতিমধ্যেই তৃণমূলের প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাসের সমর্থনে বনগাঁয় এসে জনসভা করে গিয়েছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পদ্মপার্থীর হয়ে রবিবার বনগাঁ উত্তরের লাগোয়া গাইঘাটার ঠাকুরনগরে সভা করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দেখুন ভিডিও
বনগাঁ পুরসভার ২২টি ওয়ার্ডের সঙ্গে পঞ্চায়েতও রয়েছে। ২০১১ সাল থেকে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের বিধায়ক ছিলেন বিশ্বজিৎ। ২০২১–এর নির্বাচনের আগেই বিশ্বজিৎ বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। বাগদা থেকে বিজেপির বিধায়কও হয়েছিলেন। কিন্তু অল্পদিনেই মোহভঙ্গ হওয়ায় ফের তৃণমূলে ফিরে আসেন বিশ্বজিৎ। ২০২১–এর নির্বাচনে নাগরিকত্ব দেওয়ার তাস খেলে মতুয়াদের মন জয় করেছিল বিজেপি। তবে পুরসভা এবং পঞ্চায়েত এলাকায় উন্নয়নের ঘাটতি থাকলেও সে সব ছাপিয়ে ২০২৬–এর নির্বাচনে বড় ইস্যু হলো ভোটার তালিকা থেকে মতুয়াদের নাম বাদ পড়া। গত কয়েক মাস ধরেই সার নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে মতুয়াদের ক্ষোভ বেড়েছে।

বনগাঁ উত্তরে মতুয়া ভোট প্রধান ফ্যাক্টর। খসড়া তালিকা থেকে এই কেন্দ্রের ৭,৯২৬ জনের নাম বাদ যায়। বিচারাধীন ছিলেন ১২ হাজার ২৯৬ জন। সেই বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে বাদ গিয়েছে ৮ হাজার ২৮০ জনের নাম। খসড়া এবং বিচারাধীন মিলিয়ে বনগাঁ উত্তর থেকে নাম বাদ গিয়েছে ১৬ হাজার ২০৬ জন। এদের অধিকাংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। ফলে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য লাগাতার কমিশনের লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রানি এবং নাম বাদ যাওয়া নিয়ে এই কেন্দ্রের সাধারণ এবং মতুয়াদের বিস্তর ক্ষোভ রয়েছে বিজেপির বিরুদ্ধে।
সেই ক্ষোভের প্রভাবও দেখা গিয়েছে বিজেপি প্রার্থী অশোক কীর্তনিয়ার প্রচারে। বিধায়ক হওয়ার পরেও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখা, উন্নয়ন না করা এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে বারবার ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে পদ্মপ্রার্থীকে। ফলে নিজের দুর্গ রক্ষা করাটাই এ বারের নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও প্রচারে খামতি রাখতে চাইছেন না বিজেপি প্রার্থী অশোক কীর্তনিয়া। দলীয় কর্মীদের নিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে দুই বেলা পুরসভা থেকে পঞ্চায়েত এলাকা ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। বিজেপির বিভিন্ন শাখা সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে বৈঠক থেকে বাজারে, মহল্লায় বাড়ি বাড়ি প্রচার করছেন অশোক।

অন্যদিকে, বনগাঁ উত্তরের বিজেপির শক্ত ঘাঁটিগুলোকে চিহ্নিত করে বুথ স্তরের কর্মীদের নিয়ে বৈঠকের পাশাপাশি স্থানীয়দের নিয়ে চাটাই বৈঠকের উপরেই বেশি জোর দিচ্ছেন তৃণমূলের প্রার্থী বিশ্বজিৎ। গেরুয়া পার্টির ওই ঘাঁটিগুলোতেই এবারের নির্বাচনে ঘাসফুল ফোটাতে চাইছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। বিদায়ী বিধায়কের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভাব, অভিযোগ, বঞ্চনাকে হাতিয়ার করে এই চাটাই বৈঠক দলের ভোট ব্যাঙ্ক বাড়াবে বলেই দাবি তৃণমূলের প্রার্থীর।
অন্যদিকে, শাসক দলের দুর্নীতির ইস্যুকে তুলে ধরে প্রচার চালাচ্ছেন সিপিএম প্রার্থী পীযূষকান্তি সাহা। তৃণমূলের আমলে চাকরি দুর্নীতিকে বেশি করে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রচার করে ভোটের ফায়দা তুলতে চাইছেন তিনি। তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের নীতিকে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষদের স্বার্থের বিরোধী হিসেবে তুলে ধরে জোর প্রচার সারছেন তিনি।

এই প্রসঙ্গে বিশ্বজিৎ দাস বলেন, ‘আমি চাটাই বৈঠকের মাধ্যমে জনসংযোগ বেশি করার চেষ্টা করছি। পাড়ার একটা জায়গায় বসে কথা বলে এলাকার মানুষের অভিযোগ বা দাবি শোনা হচ্ছে। এর সুফল মিলছে। এ বার বনগাঁ উত্তর তৃণমূলই জিতবে।’ বিজেপি প্রার্থী অশোক কীর্তনিয়া বলেন, ‘বনগাঁ উত্তর বিজেপির দুর্জয় ঘাঁটি। ২০২১–এর জয়ের ধারা এ বারেও বজায় থাকবে। তৃণমূলের প্রার্থী ৫০ হাজার ভোটে পরাজিত হবেন।’




