

“ওঁ নমঃ পার্বতী পতয়ে হর হর মহাদেব” বাগদা সভা মঞ্চে যোগী আদিত্যনাথ ভগবান শিবের এই মন্ত্র উচ্চারণ করতেই উত্তর প্রদেদেশের মুখ্যমন্ত্রীকে দেখেই মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণী ফ্লাইং কিস দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন ।

এরপর উত্তর ২৪ পরগনার বাগদা সভা থেকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। বাংলার মানুষ কাটমানি-সিন্ডিকেটরাজ থেকে মুক্তি চাইছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শনিবার বিজেপি প্রার্থী সোমা ঠাকুরের সমর্থনে প্রচারে এসেছিলেন আদিত্যনাথ। এদিন বাগদায় জনসভা করেন তিনি।রাজ্য সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করার সঙ্গে বিজেপি এই রাজ্যে এলে যে বুলডোজ়ার নীতি প্রয়োগ হতে পারে, তারইঙ্গিতও দিয়েছেন।
শনিবার বাগদার সভা থেকে যোগীর অভিযোগ, সারা দেশ যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ‘বিকাশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে তোষণ ও দুর্নীতির রাজনীতি চলছে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রাজ্যে রামনবমীর মিছিলে বাধা দেওয়া হয় এবং যারা হিংসা করে, তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়।’ এ প্রসঙ্গে উত্তরপ্রদেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘আমার রাজ্যে এখন এখন হিংসা নেই, কার্ফু নেই— শুধু উন্নয়ন ও উৎসবের পরিবেশ। কারণ আমরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি।’দেখুন ভিডিও
রাজ্যের শাসকদলকে নিশানা করে যোগী বলেন, ‘বাংলার মানুষ কাটমানি ও সিন্ডিকেটরাজ থেকে মুক্তি চায়। কেন্দ্রের একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, যেমন আয়ুষ্মান ভারত বা পিএম কিসান নিধির সুবিধা রাজ্য সরকার মানুষের কাছে পৌঁছোতে দিচ্ছে না।’ এ বারের ভোটকে তিনি ‘বাংলাকে বাঁচানোর লড়াই’ বলে উল্লেখ করেছেন।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সারমর্ম, বাংলায় কোনও উন্নয়ন হয় না। তাঁর অভিযোগ, এই রাজ্যে উন্নয়নের বদলে ‘উসুলি–তন্ত্র’ চলছে। তাই বাংলার হারানো গৌরব ফেরাতে পরিবর্তন আনতে হবে। সভায় মনীষীদের প্রসঙ্গ টেনে যোগী বলেন, ‘বাংলার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।’
এ দিন বাগদার সভায় উপস্থিত ছিলেন সাংসদ তথা জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর ।ভাষণের শেষ লগ্নে যোগী বাংলায় বলেন, ‘বাংলা আর চুপ থাকবে না। এ বার খেলা শেষ, উন্নয়ন শুরু।’
উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে বাংলার তুলনা টেনে তিনি বলেন, ‘বাংলায় এখন যেমন অরাজকতা, গুন্ডাগিরি চলছে, একই রকম রাজত্ব উত্তরপ্রদেশেও চলত ৮-৯ বছর আগে। কিন্তু সেখানে বিজেপির ডাবল ইঞ্জিন সরকার তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি বদলেছে। যোগীর কথায়, ‘ এখন নো কারফিউ, নো দাঙ্গা, ইউপি মে হ্যায় সব চাঙ্গা। যত মাফিয়া, জাহান্নমে চলে গিয়েছে। সব নাগরিক সুরক্ষিত। আইনের শাসন তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির উন্নতি ঘটেছে। যুবকেরা কাজ পাচ্ছেন। উত্তরপ্রদেশে এখন আর তুষ্টিকরণ হয় না,এখন সন্তুষ্টিকরণ।’

এবারে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে বাগদা বিধানসভা। উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী মধুপর্ণা ঠাকুরের জয় এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এ বারও তৃণমূল তাঁকেই প্রার্থী করেছে। মতুয়া ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হিসেবে তাঁর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আবেগঘন সংযোগ মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী করেছে ঠাকুরবাড়ির বৌ সোমা ঠাকুরকে। কিন্তু দলীয় কর্মীদের একাংশের মধ্যে তাঁকে ঘিরে ক্ষোভ রয়েছে বলে অভিযোগ। তার উপর বিজেপি নেতা দুলাল বর নির্দল প্রার্থী হওয়ায় ভোটভাগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে এই কেন্দ্রে বিজেপির লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রসঙ্গত,এ বারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা। এসআইআর প্রক্রিয়ায় বনগাঁ মহকুমার চারটি কেন্দ্র মিলিয়ে মোট ১ লক্ষ ৭১ হাজার ৫৬৯ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ। পাশাপাশি বিবেচনাধীন তালিকা মিলিয়ে আরও ৮৫ হাজার ৩৯৬ জনের নাম বাদ গিয়েছে।
শুধু বাগদা কেন্দ্রেই ২ লক্ষ ৭৭ হাজার ভোটারের মধ্যে ৫৫ হাজার নাম বাদ গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এই বাদ পড়াদের মধ্যে বড় অংশই মতুয়া উদ্বাস্তু সম্প্রদায়ের। ফলে এই ঘটনা শুধু প্রশাসনিক নয়, সরাসরি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। মতুয়া সমাজের একাংশের অভিযোগ, বিজেপি আগে আশ্বাস দিয়েছিল-কোনও হিন্দু মতুয়া উদ্বাস্তু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না। কিন্তু বাস্তবে বহু মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এতে তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

এসবের মধ্যে আবার শান্তনু ঠাকুর হিন্দু হওয়ার প্রমাণ হিসাবে টাকার বিনিমিয়ে মতুয়া সার্টিফিকেট বিলি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। সেটা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। মতুয়া ভোটারদের কণ্ঠে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মতুয়া ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা এবং অনিশ্চয়তা—তিনটিই স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাগদা মতুয়া ভোটাররাই দীর্ঘদিন ধরে ফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন। ফলে তাঁদের একাংশের ক্ষোভ বা সমর্থন দুই-ই সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে নির্বাচনের ফলাফলে। তাছাড়া প্রভাবশালী নেতা দুলাল বর নির্দল হওয়ায় বিজেপির চাপ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। আবার পালটা বিজেপি বলছে, তৃণমূলও বিশ্বজিত দাসকে তাঁর পুরনো আসন থেকে সরিয়ে অন্যত্র প্রার্থী করেছে। সেটার প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে শুধু দলীয় সংগঠন বা প্রচার নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একদিকে নাগরিকত্ব ও সিএএ নিয়ে প্রত্যাশা, অন্যদিকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বাস্তবতা—এই দ্বন্দ্বই নির্ধারণ করতে পারে ভোটের রায়। সব মিলিয়ে, বাগদা কেন্দ্রেই এ বার লড়াই অত্যন্ত তীব্র ও অনিশ্চিত। মতুয়া ভোট কোন দিকে যাবে, সেটাই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দিতে পারে কে এগিয়ে থাকবে আর কে পিছিয়ে পড়বে।



