

একদিকে তৃণমূল। যারা শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখকে সামনে রেখেই লড়াই করছে। দলের সুপ্রিমো সভায় গিয়ে বলে আসছেন, তিনিই ২৯৪টি আসনের প্রার্থী। আর একদিকে বিজেপি। যারা কখনই কোনও একটি মুখ সামনে রেখে রাজনীতি করে না, কোনও রাজ্যেই নয়। বলা ভালো, শুধুমাত্র নরেন্দ্র মোদীকে ‘মুখ’ করেই নির্বাচন লড়ে বিজেপি। তবু পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্য, যেখানে বিভিন্ন সবসময় মুখ্যমন্ত্রী মুখ গুরুত্ব পেয়ে থাকে, সেখানে জল্পনা তো থাকবেই।

বঙ্গ বিজেপির মুখ বলতে আলোচনায় উঠে আসে সুকান্ত মজুমদার, শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারীর মতো নাম।।
ছাব্বিশের নির্বাচনে সক্রিয় হয়ে ময়দানে রয়েছেন দিলীপ ঘোষও। তবে বিজেপি যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে মুখ্যমন্ত্রী হবে কে? এর উত্তর কখনই দেয় না বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব। দলের সংগঠনের নীতি মেনেই কাজ করে গেরুয়া শিবির। তবে এবারের নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে জল্পনা বাড়ছে।
বুধবার বিকেলে দক্ষিণ কলকাতার হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রে প্রচারে বেরিয়ে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী । এদিন বিজেপি কর্মীদের স্লোগান ঘিরে মুখ্যমন্ত্রী মুখ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শুভেন্দুকে সামনে রেখে গেরুয়া শিবিরের একাংশ এদিন গলা ফাটালেন, ‘ভবানীপুরে জিতবে যে, মুখ্যমন্ত্রী হবে সে’।

বকলমে শুভেন্দুই কি তবে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী? রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন যখন ঘোরাফেরা করছে, তখন দলের অন্দরের সমীকরণ কিন্তু অন্য কথা বলছে। বিজেপির একটি অংশ এখনই শুভেন্দুকে ‘মুখ’ হিসেবে মানতে নারাজ। বিশেষ করে দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা খড়্গপুর সদরের প্রার্থী দিলীপ ঘোষের মন্তব্য জল্পনা আরও উসকে দিয়েছে।
নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর মনোনয়ন পেশের সময় সশরীরে উপস্থিত থাকলেও, মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী প্রসঙ্গে দিলীপবাবু চিরাচরিত কায়দাতেই বলেন, “কে প্রার্থী হবেন, তা তো ভোটের পরে দেখা যাবে। দলের পদ্ধতি আপনারা জানেন, আগে থেকে কোনও ঘোষণা হয় না। অনেক সময় এমন কেউ মুখ্যমন্ত্রী হন যাঁর মুখ কেউ আগে থেকে চেনে না।” তাঁর স্পষ্ট কথা, দলই সব ঠিক করে। সর্বভারতীয় নেতৃত্ব কাকে কোথায় থাকতে বলবেন, সেটাই চূড়ান্ত।

বিজেপি সাধারণত নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করে না। কিন্তু বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নামায় শুভেন্দুকে ঘিরে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আলাদা উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। শুভেন্দু নিজে অবশ্য ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের অবস্থানেই অনড়। তাঁর কথায়, “২৯৪ জনের মধ্যে কেউ একজন মুখ্যমন্ত্রী হবেন। নির্বাচনের পর বিধায়করা আলোচনা করবেন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা মোদীজিকে সামনে রেখেই লড়ছি। কর্মীদের আবেগ থাকতেই পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবেন মোদীজিই।”
অতীতে তাকালে দেখা যাবে, ২০১৫ তে দিল্লিতে কিরণ বেদী বা ২০১৬-তে অসমের মুখ্যমন্ত্রী মুখ হিসেবে সর্বানন্দ সোনোয়ালের নাম ঘোষণা করেছিল গেরুয়া শিবির। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা হয়েছে ফলাফল ঘোষার পর। সে ক্ষেত্রে একদিকে যেমন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যোগী আদিত্যনাথ বা বিপ্লব দেবের মতো আরএসএস যোগ থাকা নেতার নাম ঘোষণা করা হয়েছে, অন্যদিকে, হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো নজিরও রয়েছে, যিনি কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে এসে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার এক সভায় বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, “আগামিদিনে রাজ্যে যিনিই বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হোন না কেন, তিনি আমিষাশী হবেন।”
সোমবার নন্দীগ্রামে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, আর বৃহস্পতিবার ভবানীপুরে শুভেন্দুর সঙ্গে থাকবেন অমিত শাহ। বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের উপস্থিতি শুভেন্দুকে কি সবার থেকে আলাদা করে দিচ্ছে না?
সোমবার নন্দীগ্রামে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, আর বৃহস্পতিবার ভবানীপুরে শুভেন্দুর সঙ্গে থাকবেন অমিত শাহ। বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের উপস্থিতি শুভেন্দুকে কি সবার থেকে আলাদা করে দিচ্ছে না?
বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতির নাম নিতিন নবীন হলেও, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই যে দলের সর্বেসর্বা, তেমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক অতীতে সেই অমিত শাহ অন্য কোন বিজেপি প্রার্থীর সঙ্গে এভাব মনোনয়ন জমা দিতে গিয়েছেন, তা কেউ মনে করতে পারছেন না।
তবে, ২০২২-এ গুজরাটের সানন্দ বিধানসভার প্রার্থী কানু পটেলের সঙ্গে শুধুমাত্র যেতে দেখা গিয়েছিল শাহকে। সে ক্ষেত্রে কানু পটেল কোনও মুখ্যমন্ত্রী মুখ ছিলেন না। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের আরও একটা মত হল, ভবানীপুরে এসে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর চাপ তৈরি করতে চাইছেন শাহ। বুঝিয়ে দিতে চাইছেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই আদতে মমতার প্রতিপক্ষ।

শাহ শুধু মনোনয়নের সঙ্গীই হচ্ছেন না। সম্প্রতি তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করার সময় তিনবার শুভেন্দু অধিকারীর নাম নিতে শোনা যায় অমিত শাহকে। বিজেপির ‘চার্জশিট’-এ ‘গণতন্ত্রের উপরে আঘাত’ শীর্ষক অধ্যায়ে শুভেন্দুর উপরে ‘হামলা’র অভিযোগের কথা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। শাহ নিজে যখন পশ্চিমবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বলছিলেন, তখনও তিনি শুভেন্দুর উপর ‘হামলা’র কথা উল্লেখ করেন। পশ্চিম মেদিনীপুরে শুভেন্দুর উপর হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শুধু তাই নয়, বিধানসভায় ৭৭ জন বিধায়ককে কীভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন শুভেন্দু, সে কথাও বলেন অমিত শাহ। শুভেন্দু অধিকারী কীভাবে অনুপ্রবেশ ইস্যু গোটা রাজ্যে তুলে ধরেছেন, সেই বর্ণনাও দেন অমিত শাহ। বঙ্গ বিজেপিতে শুভেন্দুর গুরুত্ব যে ক্রমশ বাড়ছে, তেমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সবুজ সংকেত নিয়েই অমিত শাহ ও নিতিন নবীনরা শুভেন্দুকে ভবানীপুরে প্রার্থী করেছেন। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে কারও নাম ঘোষণা না করলেও, খোদ মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে লড়তে নেমে শুভেন্দু নিজেকে ‘ডিফল্ট চয়েস’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। বাকিটা তো বলবে ৪ মে।



