এসআইআর-এ এখনও অবধি বাদ গেল প্রায় ৬২ লক্ষের বেশি নাম , জানালেন সিইও , এর পরও বাদ পড়ার সম্ভাবনা
deshersamay


রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করল নির্বাচন কমিশন। শনিবার দুপুর থেকে জেলায় জেলায় ধাপে ধাপে তালিকা প্রকাশ শুরু হয়। হার্ড কপি ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের দপ্তরে পৌঁছে গিয়েছে এবং বিকেল ৪টেয় সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন। এরপর অনলাইনেও তালিকা দেখা যাচ্ছে, যদিও প্রথম দিকে ওয়েবসাইটে ধীরগতির সমস্যা ছিল।

অনলাইনে নিজের নাম রয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট ভোটারেরা অনলাইনে এপিক নম্বর (ভোটার আইডি নম্বর) বসিয়ে তা দেখতে পারবেন। প্রথম দফার চূড়ান্ত তালিকা থেকে আপাতত বাদ গেল ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম।
খসড়া তালিকায় নাম ছিল ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০ জনের। খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছিল ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জন। ফলে সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত বাদের হিসাব দাঁড়াল ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনে। ৬ নম্বর ফর্মের মাধ্যমে নতুন নাম যুক্ত হয়েছে ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৩৬ জনের। ৮ নম্বর ফর্মের মাধ্যমে নাম যুক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৬৭১ জনের। শনিবার প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪।

তবে শনিবার প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী যে ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪ জনের নাম রয়েছে, তার মধ্যে ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম এখনও বিবেচনাধীন পর্যায়ে রয়েছে। যা বিবেচনা করছেন বিচারকেরা। এর মধ্যে থেকে আরও কিছু নাম বাদ যেতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ভোটারদের নামও যুক্ত হবে।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বাঁকুড়ায় প্রায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজার নাম বাদ পড়েছে। উত্তর কলকাতায় মোট বাদ ৪ লক্ষ ৭ হাজার, যার মধ্যে খসড়ায় ছিল ৩ লক্ষ ৯০ হাজার। নদিয়ায় বাদ প্রায় ৬০ হাজার। দক্ষিণ কলকাতায় তুলনামূলক কম, মাত্র ৩২০৭ জনের নাম বাদ গেছে। আলিপুরদুয়ারে মোট ভোটার ১১ লক্ষ ৯৬ হাজার ৬৫১; সেখানে ৮০ হাজারের বেশি নাম বিচারাধীন এবং প্রায় ১১ হাজারের কিছু বেশি নাম বাদ। কোচবিহার, রাসবিহারী, কলকাতা বন্দর ও বালিগঞ্জেও কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার নাম বিচারাধীন তালিকায় রয়েছে।

নন্দীগ্রামে খসড়া তালিকায় বাদ ছিল ১০ হাজার ৫৯৯ জনের নাম, চূড়ান্ত পর্যায়ে আরও ৩৯৫ জন বাদ পড়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৯৪। ভবানীপুর কেন্দ্রে খসড়ায় বাদ গিয়েছিল ৪৪ হাজার ৭৮৭ জনের নাম; চূড়ান্ত তালিকায় অতিরিক্ত বাদ পড়ে মোট সংখ্যা ৪৭ হাজারের বেশি হয়েছে।
তালিকায় নামের পাশে তিন ধরনের স্ট্যাটাস দেখা যাচ্ছে—‘Active’, ‘Adjudication’ (বিচারাধীন) এবং ‘Deleted’। কমিশন স্পষ্ট করেছে, নাম থাকলেই ভোটাধিকার নিশ্চিত নয়; স্ট্যাটাস দেখে নিতে হবে। ভোটাররা অনলাইনে Election Commission of India-র ওয়েবসাইট eci.gov.in এবং রাজ্যের সিইও দপ্তরের ওয়েবসাইট ceowestbengal.wb.gov.in-এ গিয়ে নাম যাচাই করতে পারবেন। অফলাইনে সংশ্লিষ্ট বুথ স্তরের আধিকারিকদের কাছেও হার্ড কপি পাওয়া যাচ্ছে।
সিইও মনোজ আগরওয়াল জানান, ১৩ ধরনের নথিকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং টি-গার্ডেন কর্মীদের পরিচয়পত্রও গ্রাহ্য হয়েছে।

একাধিক রাজনৈতিক দল এসআইআর প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। শনিবার তালিকা প্রকাশ করতে গিয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘কিছু ভুলভ্রান্তি’ হয়েছে। পাশাপাশি তিনি এ-ও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই বিরাট প্রক্রিয়ায় এই ভুল নিতান্তই সামান্য। মনোজ এ-ও জানিয়েছেন, যেখানে যেখানে ভুল হয়েছে, সেখানে সেখানেই কমিশন পদক্ষেপ করেছে।
শনিবার বিকাল ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ মনোজ দাবি করেন, বিকাল সাড়ে ৫টা থেকেই ওয়েবসাইটে বিধানসভা এবং বুথভিত্তিক তালিকা দেখা যাবে। মনোজ বলেন, ‘‘দু’টি বিধানসভার তালিকা আপলোড করার ক্ষেত্রে সফ্টঅয়্যারে কিছু সমস্যা ছিল। সেই দুই বিধানসভা হল যাদবপুর এবং বিধাননগর।’’
গত বছর ২৭ অক্টোবর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কথা জানিয়েছিল কমিশন। তখন রাজ্যে মোট ভোটার ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯। এনুমারেশন পর্ব শেষে গত ১৬ ডিসেম্বর খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়। ওই তালিকা থেকে বাদ পড়েন ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জন। তালিকায় নাম ওঠে ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০ জনের। শনিবার চূড়ান্ত তালিকা হিসাবে কমিশন এই সব ভোটারের নামই প্রকাশ করেছে। এই ৭ কোটি ৮ লক্ষের মধ্যে শুনানির জন্য চিহ্নিত হন প্রায় ১ কোটি ৫২ লক্ষ ভোটার। এর মধ্যে ‘নো-ম্যাপিং’ ভোটারের সংখ্যা ৩১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৪২৬। এই ভোটারেরা ২০০২ সালের শেষ এসআইআরের সঙ্গে লিঙ্ক দেখাতে পারেননি। বাকি ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারকে তথ্যগত অসঙ্গতি (লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি)-র তালিকায় শুনানিতে ডেকে পাঠায় কমিশন। সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৪২ লক্ষ ভোটারের শুনানি হয়।

পুরো প্রক্রিয়ায় ৫ লক্ষের বেশি সরকারি কর্মী যুক্ত ছিলেন, পাশাপাশি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলির তরফে ২ লক্ষের বেশি বিএলও নিয়োগ করা হয়। তিনি স্বীকার করেছেন, এত বড় প্রক্রিয়ায় কিছু ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে, যদিও সেগুলি সংশোধনের সুযোগ খোলা রয়েছে।
১ কোটি ৪২ লক্ষ ভোটারদের নথি যাচাই এবং নিষ্পত্তি নিয়ে রাজ্য ও কমিশনের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। ৮২ লক্ষ ভোটারের নথি নিয়ে ইআরও এবং এইআরও-দের সঙ্গে সহমত হয় কমিশন। তারা জানিয়েছে, শুনানিতে বাছাই করে মোট ৫ লক্ষের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে, বিতর্ক বাধে বাকি ৬০ লক্ষ ভোটারকে নিয়ে। ইআরও এবং এইআরও-দের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়নি কমিশন। অভিযোগ, কমিশনের নিযুক্ত মাইক্রো অবজ়ারভারেরা বিপরীত মত দেন। পরে সুপ্রিম কোর্ট এই ৬০ লক্ষ ভোটারের নথি নিষ্পত্তির জন্য বিচারকদের দায়িত্ব দেন। আগামী বিধানসভা ভোটের মনোনয়নের শেষ দিন পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৬০ লক্ষের বেশি ভোটারের তালিকা প্রকাশ করা হবে। চূড়ান্ত তালিকার সঙ্গে প্রকাশিত হলেও আপাতত এটিকে বিচারাধীন হিসাবে রাখছে কমিশন। এই অবস্থায় তারা মনে করছে, বাকি ভোটারদের নিষ্পত্তি হলে, ভবিষ্যতে আরও নাম বাদ পড়বে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের নাম প্রবাসী ভারতীয় হিসেবে চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে বলেও কমিশন জানিয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, বিচারাধীন নামগুলির নিষ্পত্তির ভিত্তিতে ধাপে ধাপে আরও আপডেট প্রকাশ করা হবে।

