১২৬০০ ফুট উঁচু থেকে নেমে এসেছিল সাক্ষাৎ মৃত্যু! পাণ্ডবদের তৈরি প্রাচীন মন্দির ‘কল্প কেদার’ ধ্বংসস্তূপের নীচে , মাত্র ৩০ সেকেন্ডে উত্তরকাশীর ধরালী গ্রামকে গ্রাস করে হড়পা বান

0
341

উত্তরকাশীর হড়পা বানে ধরালী গ্রামের কল্প কেদার মন্দির ধ্বংসস্তূপের তলায়। জনশ্রুতি, নির্বাসন কালে পাণ্ডবরা ওই মন্দির তৈরি করেছিল। মঙ্গলবার আচমকা হড়পা বান আসে ক্ষীরগঙ্গা নদীতে। ভয়ংকর সেই স্রোতে ধ্বংস ধরালী গ্রামের একাংশ। হড়পা বানের তোড়ে ভেসে গিয়েছে একাধিক ঘরবাড়ি, যানবাহন, হোটেল, রাস্তাঘাট। ধ্বংসস্তূপের তলায় গ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন মন্দির কল্প কেদারও।

স্থানীয়দের মতে, পাণ্ডবরা তৈরি করেছিল এই মন্দির। গর্ভগৃহে থাকা শিবলিঙ্গটি নন্দীর পিঠের মতো দেখতে, যা কেদারনাথের শিবলিঙ্গের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এমনকী, এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গেও মিল রয়েছে কেদারনাথ মন্দিরের। স্থানীয়রা এই মন্দিরটিকে পঞ্চ কেদারের অংশ মনে করতেন।

বহু বছর আগে হিমবাহের পরিবর্তনের ফলে এই মন্দিরটির অধিকাংশই মাটির নীচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। ১৯৪৫ সালে খনন কাজ চালিয়ে আবিষ্কার করা হয় মন্দিরটি। তার পর থেকে কেবল মন্দিরের গম্বুজটি দৃশ্যমান ছিল। সেই গম্বুজে খোদাই করা ছিল কালভৈরবের মুখ। দর্শনার্থীদের মন্দিরে প্রবেশ করতে হলে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে হতো, কারণ এটি ভূপৃষ্ঠের কিছুটা গভীরে অবস্থিত ছিল। কিন্তু আকস্মিক বন্যার জেরে পুনরায় ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়ে গিয়েছে ঐতিহাসিক এই মন্দির।

চারধাম তীর্থ মহাপঞ্চায়েতের সদস্য ব্রিজেশ সতী বলেন, ‘কল্প কেদারের তীর্থযাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই মন্দিরটি আদি শংকরাচার্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন।’ স্থানীয়দের কাছেও এই মন্দিরের আধ্যাত্মিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।

১২৬০০ ফুট উঁচুতে মেঘভাঙা বৃষ্টি হয়। তার পরই সেই বৃষ্টির জন্য হড়পা বান পাহাড়ের বুক চিরে নীচের দিকে নেমে আসে। ঘণ্টায় ৪৩ কিলোমিটার বেগে আছড়ে পড়ে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে তছনছ করে দেয় উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীর ধরালী গ্রাম এবং হর্ষিল উপত্যকাকে। পাহাড় থেকে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত হয়ে ক্ষীরগঙ্গা ধরে নেমে আসে হড়পা বান। সঙ্গে বয়ে নিয়ে আসে বিশাল বিশাল পাথর, বোল্ডার আর কাদার স্রোত। আর সেই পাথর, কাদা আর জলের স্রোতে একের পর এক বাড়ি, হোটেল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মঙ্গলবার এমনই এক ভয়ঙ্কর এবং শিরদাঁড়া বেয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে যাওয়ার মতো দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছে গোটা দেশ।

পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা যে ধরালী পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম জায়গা, মঙ্গলবারের পর থেকে সেই জায়গা যেন ‘মৃত্যুপুরী’তে পরিণত হয়েছে। যে গ্রাম হোটেল, হোমস্টে, রেস্তরাঁয় সাজানো ছিল, এখন সেখানে শুধু জল আর কাদার স্রোত বইছে। জানা গিয়েছে, শুধু ধরালী গ্রামই নয়, সুখী টপেও মেঘভাঙা বৃষ্টি হয়। ফলে পর পর দু’বার মেঘভাঙা বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে।

ক্ষীরগঙ্গা হয়ে হড়পা বান নেমে আসায় বোল্ডার আর কাদার স্রোতে ভাগীরথীর প্রবাহ রুখে দিয়েছে। ফলে নদীর পাশে একটি অস্থায়ী ঝিলের জন্ম হয়েছে। যা আরও বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা গিয়েছে, পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথর, কাদার স্রোত ১৩.৫ একর এলাকাকে গ্রাস করে ভাগীরথীতে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে। পাহাড় থেকে ক্ষীরগঙ্গা ধরে নেমে আসা হড়পা বানের পথে বাঁক থাকায় সেটি বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে হড়পা বানের গতিপথ বদলে গিয়েছিল। ভাগীরথীর ধারে রয়েছে হর্ষিল হেলিপ্যাড, সেনাছাউনি, ধরালী গ্রাম, কল্প কেদার মন্দির। হড়পা বানে সেনাছাউনি, হেলিপ্যাড, ধরালী গ্রাম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।

উত্তরকাশীর হর্ষিল উপত্যকায় ধরালী গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯০০৫ ফুট উঁচুতে এই গ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য খুবই জনপ্রিয়। হর্ষিল এবং গঙ্গোত্রীর মাঝে পড়ে এই গ্রাম। হর্ষিল থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে। উত্তরকাশী থেকে ধরালী যেতে আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা লাগে। এই গ্রামটি উত্তরকাশী জেলার ভটবারী তহসিলের অন্তর্গত। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, এই গ্রামে ১৩৭ পরিবারের বাস। জনসংখ্যা সব মিলিয়ে ৫৮৩।

উল্লেখ্য, পঞ্চ কেদার বলতে বোঝানো হয় ভগবান শিবের পাঁচটি রূপের মন্দির। কেদারনাথ, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, মধ্যমহেশ্বর এবং কল্পেশ্বর – এই পাঁচটি পবিত্র স্থান সম্মিলিত ভাবে হিন্দু ধর্মের প্রতিটি মানুষের কাছে এক অনন্য তীর্থযাত্রা। কিন্তু উত্তরকাশীর হড়পা বান তীর্থযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অংশকে চিরতরে মুছে দিয়েছে।

Previous articleশ্রাবণী সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার গিরিশমঞ্চে উমার আগমনী বার্তা দিয়ে সূচনা হল উৎকর্ষিণী ২০২৫: দেখুন ভিডিও
Next articleরাস্তা না পুকুর? বনগাঁ থেকে বয়রা ও দত্তফুলিয়া রাজ্য সড়কের বেহাল দশা ! খানা-খন্দে ভরা রাস্তার দ্রুত সংস্কারের দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের: দেখুন ভিডিও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here