Desher Samay
প্রচ্ছদলেটেস্ট নিউজদেশপশ্চিমবঙ্গকলকাতাউত্তরবঙ্গজেলাব্যবসাবিনোদনখেলাআন্তর্জাতিকবাংলাদেশফটো গ্যালারিভ্রমণকাহিনীসম্পাদকের পছন্দসরাসরিইউটিউবই-পেপার
Breaking News

বনগাঁর বনেদি বাড়ির পুজো আজও ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল

deshersamay

Share article:

রতন সিনহা: বনগাঁ: ঝাড়বাতির রোশনাইতে দুর্গাপুজোর গল্প ৷ ঠাকুর দালানে আলপনা, ঢাকের আওয়াজে পুরনো দেওয়াল ঘিরে বার বার ফিরে যাওয়া নস্ট্যালজিয়া৷ পঞ্চপ্রদীপের আলোয় মায়ের মুখ দেখা ৷ ধূপের গন্ধে, ধুনোচি নাচের ছন্দে, মায়ের তখন মৃণ্ময়ী রূপ ! সারা বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রাজ-রাজাদের ইতিহাস ৷ জমিদার বাড়ি থেকে রাজবাড়ির ঠাকুরদালান, সেই স্মৃতি আজও অমলিন ৷ সেই সব স্মৃতি দালান আজও বনগাঁর ইতিহাসে উজ্জ্বল। তেমনই কিছু অসাধারণ দুর্গাপুজোর গল্প রইল আপনাদের জন্য ৷

সীমান্ত শহর বনগাঁয় প্রথম দুর্গাপুজো হয় দত্তপাড়ার দত্ত বাড়িতে। সূর্যনারায়ণ দত্ত যশোরের রাজা সীতারাম রায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ১৭১৪ খ্রিস্টাব্দে সীতারাম মুঘল বাহিনীর হাতে পরাজিত হলে সূর্যনারায়ণ যশোর থেকে বনগাঁর দত্তপাড়ায় এসে বাড়ি নির্মাণ করেন। তাঁর পৌত্র স্বরূপ নারায়াণ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে দত্ত বাড়িতে দুর্গা পুজোর প্রচলন করেন। 

ছবি তুলেছেন রাজু মন্ডল।

সেই সময় বনগাঁর মানুষের কাছে আনন্দ উৎসবের একমাত্র প্লাটফর্ম ছিল এই পুজো। পুজো মণ্ডপের সামনে মাঠে পুজোর পাঁচ দিন ধরে খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এই তিনদিনই এই মাঠেই প্রসাদ বিতরণ করা হতো এলাকার মানুষের মধ্যে। দত্ত বাড়ির পুজোমন্ডপ এখন ভগ্নপ্রায়।  এলাকার সাধারণ মানুষ প্রাচীন এই দুর্গাপুজোকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন। 

অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে কলকাতার উল্টোডাঙার কাছে বাগখাল কাটার সময় যুধিষ্ঠির সিংহ ও তাঁর পরিবার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে বনগাঁর যশোর রোডের ধারে মুস্তাফিপাড়াতে এসে বাড়ি তৈরি করেন। এই পরিবারের পুরনো ঐতিহ্য পারিবারিক দুর্গাপুজো। সেইমতো ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে গোপালচন্দ্র ও বরদাকান্ত সিংহের উদ্যোগে শুরু হয় দুর্গাপুজো। প্রথম মাটির তৈরি চালাঘরে পরে পাকা মন্ডপ নির্মাণ করে দুর্গাপুজো শুরু হয়।  

বর্গী আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য দেড়শ বছর আগে বর্ধমান জেলার বৈঁচি থেকে কৃষ্ণচন্দ্র দাঁ তাঁর পরিবার নিয়ে চলে আসেন উত্তর ২৪ পরগনার গোপালনগরে। ভিটে ছেড়ে এলেও পরম্পরা বজায় রাখতে গোপালনগরে বাসগৃহের পাশাপাশি পুজোমণ্ডপ নির্মাণ করে দুর্গাপুজো শুরু করেন। 

গোপাল নগর দাঁ বাড়ি- ছবি তুলেছেন রাজু মন্ডল।

কথিত আছে, ধনপতি পুত্র শ্রীমন্ত বাণিজ্য করার পথে ঝড়ে মাঝ সমুদ্রে জলে ডুবে যাচ্ছিলেন। সেই সময় মা দুর্গা তার হাত ধরে তুলে রক্ষা করেন। দেবী সেই কমলে কামিনী রূপে এই পরিবারে পূজিত হন। চন্ডীমঙ্গল কাব্যের ধনপতি সওদাগরের পুত্র শ্রীমন্তকে মা মঙ্গলচণ্ডী যেভাবে উদ্ধার করেছিলেন, তারই প্রতিমূর্তি। 

ছবি তুলেছেন রাজু মন্ডল।

পরবর্তীতে ব্যবসায়িক সূত্রে কৃষ্ণচন্দ্র দাঁ-এর পঞ্চম বংশধর অজিত কুমার দাঁ  বনগাঁর ‘ট’ বাজারে চলে এসে বসতি গড়ে তোলেন। ১৯৭১ সালে তিনিও এই বাড়িতে কমলে কামিনী রূপে মাদুর্গার পুজো শুরু করেন। পুজোয় ধুনো পোড়ানো এই বাড়ির একটি বিশেষত্ব। এই পরিবারের বনগাঁর বাড়ির পুজো এবারে ৫০ বছরে পা দিল। প্রথম থেকেই একই সঙ্গে এই বাড়িতে কুমারী পুজোরও প্রচলন হয়। 

ছবি তুলেছেন রাজু মন্ডল।

 বনগাঁর রাখালদাস বন্দ্যোপাধায় বাড়ির দুর্গাপুজো 
‘‘পঞ্চমীর সন্ধ্যায় বেদিতে ঠাকুর ওঠানো এটাই দুর্গাপুজোর পরম্পরা।প্রান্তিক জনপদ বনগাঁয়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বনগাঁ শহর-সংলগ্ন ছয়ঘরিয়া এলাকায় প্রত্নস্তুপের মাঝে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংঘর্ষ করছে প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটো ঠাকুরদা গৌরহরি বন্দ্যোপাধায়ের বাড়ি। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই শহরে জন্মগ্রহণ করেননি বা এখানে বসবাসও করতেন না কিন্তু পারিবারিক দুর্গাপুজোর সময় যেখানেই থাকুন না কেন এখানে চলে আসতেন।

রাখালদাসের স্মতিবিজড়িত বাড়ি’ টি নানান শরিকে ভাগ হয়ে গেছে। ফলকহীন দরজা পার হলেই বিশাল উঠোন, দালান বাড়ি। প্রায়  তিনশো বছর আগে রাখালদাসের ঠাকুরদা গৌরহরি বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঠাকুর দালানে দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন। গৌরহরি বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন স্বপ্নে অদ্ভুত দর্শন এক দেবীমূর্তি দেখতে পান। যে দেবীমূর্তির কিনা দশটি হাতের মধ্যে দু’টি হাত কেবল বড়। বাকি আটটি হাত বেড়ালের মতো ছোটো ছোটো। স্বপ্নাদেশ পাওয়া দেবীর আদলেই নির্মিত হয় মূর্তি। আর তার নাম হয়ে যায় ‘বেড়ালহাতি দুর্গা’। একসময় সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত বলির প্রথা চালু ছিল বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে। পরে  তা বন্ধ হয়ে চিনি-নাড়ু দিয়ে নৈবেদ্য দেওয়ার প্রথা চালু হয়।

বিজয়া দশমীর দিন  খুব উৎসাহ নিয়ে প্রতিমা নিরঞ্জন হয়। বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির প্রতিমা নিরঞ্জনে থাকে নানা চমক। যেমন দশমীর দিন সন্ধ্যাতারা ওঠার পরই হত প্রতিমা নিরঞ্জন। অতীতে রাখালদাস থাকতেন প্রতিমা নিরঞ্জনের দায়িত্বে। আজও  স্থানীয় নাওভাঙা নদীতে নিয়ে যাওয়া হয় প্রতিমা। দু’টি নৌকোর ওপর প্রতিমা রেখে প্রথমে প্রতিমাকে সাত পাক ঘোরানো হত। তারপর নৌকো দু’টিকে ধীরেধীরে দু’দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিমা পড়ে যায় জলে। দেবী প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকের তালে আকাশ বাতাস জুড়ে আওয়াজ ভেসে বেড়ায় ‘আসছে বছর আবার হবে।’ ‘

Advertisement

একটি মন্তব্য করুন

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলি আবশ্যক *

Home Language Gallery e-Paper
Menu
© 2026 Desher Samay.

Select Language

ভাষা নির্বাচন করুন