

রাজ্যে নির্বাচনের মুখে আবার দল বদল। তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে ফিরেছেন মৌসম বেনজির নূর । গনি খান চৌধুরীর পরিবারের এই সদস্যের দলবদল ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে জোর চর্চা ।
মালদহের সুপরিচিত নূর পরিবারের মেয়ে মৌসম। মা রুবি নূরের মৃত্যুর পরই রাজনীতিতে পা রাখেন তিনি। মায়ের বিধানসভা কেন্দ্র সুজাপুর থেকই শুরু হয়েছিল তাঁর নির্বাচনী যাত্রা। পরে ২০০৯ থেকে ২০১৪, টানা পাঁচ বছর মালদহ উত্তর কেন্দ্রের সাংসদ ছিলেন।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন করলেন মৌসম বেনজির নুর। শনিবার দিল্লিতে ২৪ নম্বর আকবর রোডে কংগ্রেসের দপ্তরে গিয়ে নিজের পুরোনো দলে যোগদান করেন তিনি। তাঁর যোগদান কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এবং মালদা উত্তরের কংগ্রেস সাংসদ তথা মৌসমের দাদা ইশা খান চৌধুরী।
তাঁর যোগদানের পরে দিল্লি থেকেই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেন, ‘এটা ট্রেলার দেখলেন। এত দিন আমরা জানালা খুলে রেখেছিলাম। এ বার দরজাও খুলে দিলাম।’ যদিও মৌসমের দলে ফেরায় আদৌ কোনও লাভ হাত শিবিরের হবে কি না, তা সময় বলবে, দাবি ওয়াকিবহাল মহলের। এ দিকে যোগদানের পরেই মৌসম দাবি করেন, কংগ্রেসের প্রধান বিরোধী বিজেপি। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলায় পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাকে দিয়েই এই পরিবর্তন শুরু হোক, এটাই আমি চাই।’ অন্যদিকে, ইশা খান চৌধুরী বলেন, ‘ওঁর রক্তে কংগ্রেস। ওঁর অন্য দলে যোগদানে পরিবারের মধ্যে যে বিভাজন তৈরি হয়েছিল, এ দিন তা ঘুচে গেল।’

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতীকে মালদা উত্তরে জয়ী হয়েছিলেন মৌসম। ২০১৪ সালেও তিনি সেই দলে থেকেই লোকসভায় জয়ের ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন। গনি খান চৌধুরীর পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে রাজনীতিতে বেশ খানিকটা বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলেন তিনি, দাবি রাজনৈতিক মহলের।
কিন্তু, ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে হঠাৎ করে দল বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রয়াত কংগ্রেস নেতা গনি খান চৌধুরীর ভাগ্নি মৌসম। ওই বছরে ২৮ জানুয়ারি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগদান করেছিলেন তিনি। সেই লোকসভা নির্বাচনে তাঁকে মালদা উত্তর কেন্দ্রের প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। কিন্তু বিজেপির খগেন মুর্মুর কাছে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। যদিও তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদ করা হয়েছিল তৃণমূলের তরফে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁকে ফের লোকসভায় প্রার্থী করেনি তৃণমূল কংগ্রেস। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে কান পাতলে শোনা যায়, দলের সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নাকি একেবারেই খুশি ছিলেন না মৌসম। সেই সময়ে এই নেত্রী দাবি করেছিলেন, তাঁকে প্রার্থী করা হলে জয়ের বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন তিনি। শনিবার ছ’বছর পরে ফের একটি ভোটের আগেই কংগ্রেসে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন মৌসম।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, হয়তো কংগ্রেসের টিকিটে বিধানসভা নির্বাচনে লড়তে পারেন তিনি। এ দিকে কংগ্রেসে ফেরার পরে মৌসম বলেন, ‘ছ’বছর পরে কংগ্রেসের অফিসে ফিরে এসেছি। খুব ভালো লাগছে। কংগ্রেসকে ধন্যবাদ, পরিবারের সদস্যের মতো করে গ্রহণ করেছেন এবং ফিরিয়ে নিয়েছেন।’

রাজনীতিতে নামার আগে প্রায় দু’বছর সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করেছেন। তাঁর স্বামী মির্জা কায়েশ বেগ এখনও সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাক্টিস করেন।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, ২০০৫ সালে হাজরা ল কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করেন তিনি। কর্মজীবনের শুরুতে ফক্স অ্যান্ড মণ্ডল নামে একটি আইনি সংস্থায় কাজও করেন।
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে প্রার্থী হওয়ার সময় জমা দেওয়া হলফনামায় মৌসম নিজের আয়ের বিস্তারিত হিসেব দেন। নথি বলছে, ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে তাঁর আয় ছিল ৫ লক্ষ ১৯ হাজার ৫৬৫ টাকা। ২০১৪-১৫ সালে তা সামান্য কমে দাঁড়ায় ৫ লক্ষ ১১ হাজার ৭৯০ টাকা। ২০১৫-১৬ সালে আয় আরও কমে হয় ৪ লক্ষ ৯৬ হাজার ১১০ টাকা। ২০১৬-১৭ সালে আয় ছিল ৪ লক্ষ ৮০ হাজার ৭২০ টাকা এবং ২০১৭-১৮ সালে ৪ লক্ষ ৮১ হাজার ৭৮০ টাকা।

২০১৯ সালে তাঁর হাতে নগদ ছিল ৯০ হাজার ৪৫০ টাকা। তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ছিল যথাক্রমে ৯ লক্ষ ২৪ হাজার ২৫৭ টাকা, ১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৮২৯ টাকা এবং ১ লক্ষ ৯৯ হাজার ৬৩৮ টাকা। পাশাপাশি ২ লক্ষ টাকা, সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা ও ৯ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকার বিনিয়োগের উল্লেখও ছিল সেখানে। মোট তিনটি এলআইসি বিমা রয়েছে তাঁর।
সম্পত্তির তালিকাও খুব ছোট নয় মৌসমের। গ্যারাজে রয়েছে একটি অ্যাম্বাসাডর , একটি মারুতি ও একটি মাহিন্দ্রা স্করপিও । এসবিআই থেকে গাড়ি কেনার জন্য লোন নেওয়ার কথা তিনি হলফনামায় উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর কাছে থাকা সোনার পরিমাণ ৮০ গ্রাম, যার মূল্য ২০১৯ সালে ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে তাঁর স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ৫২ লক্ষ ৯১ হাজার ১৩৬ টাকা।
মালদহ স্টেশন রোডে রয়েছে তাঁর কমার্শিয়াল বিল্ডিং ‘নূর ম্যানসন’ প্রায় ১০ হাজার বর্গফুটজুড়ে। সাহজালালপুরে রয়েছে প্রায় ৬ হাজার বর্গফুটের আবাসন।
২০১৯ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন মৌসম। ২০২০ সালে রাজ্যসভার সাংসদ হন। তৃণমূলে থাকাকালীন মালদহ জেলা তৃণমূলের সভানেত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন। সাত বছরের মাথায়, রাজ্যসভা মেয়াদ শেষের চার মাস আগেই আবার কংগ্রেসে ফেরা, এই সিদ্ধান্ত যে বাংলার ভোট রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, তা বলাই বাহুল্য।




