

বাংলাদেশে কট্টরপন্থী তরুণ নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গত বছরের ৫ অগস্টের মতো অরাজক পরিস্থিতি ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে সে দেশের বিভিন্ন জেলায় লুট সন্ত্রাস শুরু হয়েছে। চলছে অগ্নিসংযোগ ভাঙচুরের ঘটনা।
বৃহস্পতিবার বেশি রাতে প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ও রেডিওতে ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি হাদিকে ‘শহিদ’ ঘোষণা করে শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক পালনের কথা ঘোষণা করেন। ভাষণে তিনি দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
আধপোড়া তবলা, উপরের খোলটা দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছে। হারমোনিয়াম দু’টুকরো করে মেঝেতে ফেলা। ইউনূসের ‘নতুন বাংলাদেশ’-এ হামলার পর এই দৃশ্যই দেখা গেল সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম পীঠস্থান ছায়ানট-এ। যেখানে কান পাতলে রবি ঠাকুর, নজরুলের গান বাজত, বৃহস্পতিবার রাতে সেখানেই চলল লাঠি, অস্ত্রের সন্ত্রাস। চলল অবাধে ভাঙচুর।ধরিয়ে দেওয়া হলো আগুন।

‘ইনকিলাব মঞ্চ’-র মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পরে উত্তাল ওপার বাংলা। বাদ পড়ল না ‘ছায়ানট’-ও। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পরে ধানমণ্ডির ছায়ানটের বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন জায়গায় চলে দেদার ভাঙচুর।
একাধিক বাদ্যযন্ত্র, শিল্পকর্মের উপরে হানা হয় আঘাত। শিল্পের উপরে নির্মম হামলার পর ভয়াবহ পরিস্থিতি ছায়ানট-এ। এ দিক ও দিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাগজপত্র, যেখানে সুর, নোট লেখা ছিল। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন হাদির মৃত্যুর খবর সামনে আসার পরে রাত ১টা নাগাদ ধানমণ্ডির ছায়ানটের সামনে জড়ো হতে থাকে ভিড়।
মুখ ঢেকে অনেকে সেখানে প্রবেশ করেন। এর পরে চলে দেদার ভাঙচুর। একটি ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল (এর সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময় অনলাইন’)। সেখানে হামলাকারীদের বলতে শোনা যায়, ‘এখানে ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার কোনও জায়গা নেই’।

এই দৃশ্যে শিউরে উঠছেন শুভবুদ্ধি সম্পন্নরা। ষাটের দশকে অবিভক্ত বাংলাদেশে হঠাৎ হুকুম জারি হয়েছিল, ‘পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া এবং সম্প্রচার নিষিদ্ধ’। সেই সময়ে বুক ঠুঁকে রবি চর্চার জন্য ছায়ানট গড়ে তোলেন কলিম শরাফী। এর পরে এই সাংস্কৃতির পীঠস্থান দেখেছে বাংলাদেশের জন্ম। ছায়ানট এতদিন ধরে ছিল রবীন্দ্র-নজরুল চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। নেটপাড়ার আস্ফালন, যে ভবন শাসকের রক্তচোখে চোখ রেখে সুরেলা বিপ্লবের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেখানে ভাঙচুর করে কোন বীরত্ব দেখানো হলো? আর সেই ‘বিপ্লবী’-দের গামছা দিয়ে মুখই বা লোকাতে কেন হলো? কোথায় ছিল ইউনূসের পুলিশ?
ওয়াকিবহাল মহলের পর্যবেক্ষণ হল, ইউনুসের ভাষণের পর হিংসা থামার পরিবর্তে আরও বেড়ে গিয়েছে। প্রয়াত হাদিকে সরকারিভাবে ‘শহিদ’ ঘোষণার সিদ্ধান্তে কট্টরপন্থীরা হামলায় আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে একাধিক মহল মনে করছে। ফলে দেশকে শান্ত রাখাই রাখাই মাঝরাতে ইউনুসের ভাষণের উদ্দেশ্য ছিল কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেকেই মনে করছেন তড়িঘড়ি এই প্রয়াত নেতাকে শহিদের মর্যাদা দিয়ে ভারত বিরোধিতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতেই জামাত ইসলামের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি হাদির মৃত্যুতে ভারতকে নিশানা করে। হাদির হত্যাকারীরা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ করে ওই দুই দল। যদিও তাৎপর্যপূর্ণ হাদির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলেও বিএনপি এই ইস্যুতে এখনো পর্যন্ত ভারত বিরোধী অবস্থান নেয়নি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে বিমানে হাদির দেহ ঢাকায় পৌঁছানোর কথা। শনিবার তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সম্মানিত করা হবে। তার আগে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার জানাজা বা প্রার্থনার আয়োজন করবে সরকার।
হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গত বছরের পাঁচ অগস্টের মতো বৃহস্পতিবার রাতে উগ্রবাদীরা ফের ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে হামলা চালায়। গত বছর ৫ অগস্টের পর থেকে বাড়িটিতে এ নিয়ে পাঁচবার হামলা হল। যদিও ওই বাড়ির মাত্র এক চতুর্থাংশ অবশিষ্ট আছে। শুক্রবার সকালেও সেই বাড়ি ভাঙতে দেখা যায় উগ্রবাদীদের।

ধানমন্ডিতেই অবস্থিত বাংলাদেশের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক সংস্থা ছায়ানটের অফিস। বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় উগ্রবাদীরা। গভীর রাতে ওই সংগঠন তাদের ফেসবুকে জানিয়েছে ভবনটিতে ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের ক্লাসসহ সংগঠনের সব কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা হল।
হামলার চেষ্টা হয় ভারতীয় হাই কমিশনের সহকারী হাইকমিশনারের চট্রগ্রাম ও খুলনার অফিসে। ইনকিলাব মঞ্চের লোকেরা সেখানে ইট পাটকেল ছোড়ে। গভীর রাতে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বৃহস্পতিবার রাতেই চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহম্মদ মহিউদ্দিনের বাড়িতে আগুন দেয় হামলাকারীরা ।

রাতেই প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের ঢাকা অফিসে হামলা হওয়ায় পত্রিকার দুটি শুক্রবার প্রকাশিত হয়নি। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বহু মানুষ ওই অফিস দুটি থেকে কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী লুট করে বেরিয়ে যাচ্ছে। গত বছর ৫ অগস্ট প্রধানমন্ত্রীর অফিস গণভবণে এভাবেই লুটতরাজ চালিয়েছিল উগ্রবাদীরা। ’দ্য ওয়াল’ ওই ভিডিও সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। ভারতীয় সাংবাদিকদের তরফে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই ভিডিওর সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। এই খবর প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
আওয়ামী লিগ নেতৃত্ব জানিয়েছে, চট্টগ্রামে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর বাড়ি, সাবেক এমপি হাবিবের ঢাকার উত্তরার ফ্ল্যাটে হামলা হয়। রাজশাহীতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লিগের পার্টি অফিস। বান্দরবনে আগুন দেওয়া হয় সাবেক মন্ত্রী বীরবাহাদুরের বাড়িতে।

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির মৃত্যুতে অশান্তির কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করছেন তাঁর আওয়ামী লিগ ও কট্টর ভারত বিরোধী ভাবমূর্তি। গত বছর গণঅভ্যুত্থানের আগে পরে তিনি লাগাতার ভারত বিরোধী প্রচারে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। বাংলাদেশের উপর ভারত আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং আওয়ামী লিগ সেই কাজে সহায়তা করে বলে একাধিক সমাবেশে প্রচার করেন ওই নেতা। বস্তুত সেই কারণেই ক্ষুদ্র একটি সংগঠনের মুখপাত্র হয়েও তিনি গোটা বাংলাদেশে আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। গত শুক্রবার দুপুরে নির্বাচনী প্রচার চালানোর সময় দুষ্কৃতীরা তাঁকে গুলি করে। ঢাকার দুটি বড় হাসপাতালে চিকিৎসার পর তাঁকে সরকারি খরচে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার অফিস থেকে সমাজমাধ্যমে জানানো হয় হাদির শারীরিক পরিস্থিতি ভাল নয়।

বৃহস্পতিবারই সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে হাদির অপারেশন হয়েছিল। তারপর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জানা গিয়েছে, দুপুরে তার শারীরিক পরিস্থিতি সংকটজনক বলে ঘোষণার পর থেকেই উত্তেজনা চড়তে শুরু করে।



