

উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ভোটের অন্যতম নির্ণায়ক শক্তি মতুয়া ভোট। বিশেষ করে বনগাঁ মহকুমার চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেন মতুয়া ভোটাররা। এর মধ্যে রয়েছে বনগাঁ উত্তর, বনগাঁ দক্ষিণ, বাগদা ও গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্র। মতুয়া অধ্যুষিত এই চারটি বিধানসভা কেন্দ্রেই এ বার রেকর্ড পরিমাণ ভোট পড়েছে। সার-এর কোপে বিপুল সংখ্যক মতুয়া ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার পরেও সেখানে ভোটদানের হার বেড়ে যাওয়ায়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ভোটদানের এই প্রবণতা দেখে শাসক ও বিরোধী, উভয় শিবিরের লোকেরা দাবি করছেন, তাঁরাই বেশি লাভবান হবেন? ভোট মিটতেই তা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ।

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় সবথেকে বেশি ভোট পড়েছে হাড়োয়া বিধানসভা এলাকায়। এই কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৭.৩৪ শতাংশ। আর সবথেকে কম ভোট পড়েছে বিধাননগরে। এখানে ভোটের হার ৮৬.২৬ শতাংশ। তবে ভোটদানের নিরিখে অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে মতুয়াগড় বলে পরিচিত বনগাঁ উত্তর, বনগাঁ দক্ষিণ, বাগদা ও গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্র। এই চার কেন্দ্রে গড়ে ভোট পড়েছে প্রায় ৯২ শতাংশ। বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯২.৬১ শতাংশ। বনগাঁ দক্ষিণে ৯২.২৩ শতাংশ, গাইঘাটায় ৯৩.০৮ শতাংশ এবং বাগদায় ৮৯.৫১ শতাংশ ভোট পড়েছে। যদিও গত বিধানসভা ভোটে বনগাঁ উত্তরে ৮৪.২৬ শতাংশ, বনগাঁ দক্ষিণে ৮৭.৫ শতাংশ, বাগদায় ৮১.৪৭ শতাংশ এবং গাইঘাটায় ৮৮.৪৯ শতাংশ ভোট পড়েছিল। মতুয়াগড়ের প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে ৬-৮ শতাংশ অতিরিক্ত ভোট পড়েছে।

কিন্তু বনগাঁর মতুয়াগড়ে ভোটদানের হার বাড়ার পিছনে আসল রহস্যটা কী? এই অতিরিক্ত ভোট কার ঝুলিতে যাবে? এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। ভোট মিটতে না মিটতেই তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার তৃণমূলের সভাপতি তথা বনগাঁ উত্তরের তৃণমূল প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাস বলেন, ‘সার নিয়ে মতুয়াদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ রয়েছে কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে। সার-এর কারণে অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। শুনানি কেন্দ্রে গিয়ে বহু মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। ভোট দিতে না পারার আক্ষেপও রয়েছে মানুষের মধ্যে। সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ইভিএমে। তার জন্যই এত সংখ্যক মানুষ ভোট দিতে বেরিয়েছেন।’ তাঁর দাবি, ‘এ বার মতুয়া ভোট তৃণমূলের দিকেই যাবে। তার ফলে বনগাঁয় তৃণমূল খুবই ভালো ফল করবে।’

বনগাঁ উত্তরের বিজেপি প্রার্থী অশোক কীর্তনিয়ার ব্যাখ্যা, ‘এত বছর ধরে তৃণমূলের দুষ্কৃতীদের ভয়ে মানুষ ভোট দিতে পারেননি। নির্বাচন কমিশন যে ভাবে ভোট পরিচালনা করেছে, তার জেরেই একটা বিপুল সংখ্যক মানুষ বাইরে বেরিয়ে ভোট দিয়েছেন। মতুয়ারা বিজেপির সঙ্গেই আছেন।’
উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় সবমিলিয়ে ৩৩টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে। তার মধ্যে মধ্যে হাড়োয়া কেন্দ্রটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। এখানে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ার পিছনে সার একটা অন্যতম বড় ‘ফ্যাক্টর’ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, সার-এর জন্য হাড়োয়া কেন্দ্রে বহু সংখ্যালঘু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ চলে গিয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করেছে। ভবিষ্যতে যাতে তাঁদের ভোটাধিকার নিয়ে নতুন করে বিপদের মুখে পড়তে না হয়, সেই আতঙ্কে অনেকে ভোট দিয়েছেন।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে বিধাননগর কেন্দ্রে। এখানে ভোটের হার ৮৬.২৬ শতাংশ। জেলা নির্বাচনী দপ্তরের আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, বিধাননগরে বরাবরই কম ভোট পড়ে। এ বারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাজারহাট-গোপালপুর কেন্দ্রেও তুলনামাফিক কম ভোটই পড়েছে। এখানে ভোটের শতকরা হার ৮৬.৬৬ শতাংশ। ভোটদানের নিরিখে জেলার মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দেগঙ্গা। এই কেন্দ্রটিও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। এখানে ভোট পড়েছে ৯৬.৮৫ শতাংশ। এরপরেই আছে মিনাখাঁ। এখানে ভোট পড়েছে ৯৬.৭৭শতাংশ বসিরহাট উত্তরে ৯৬.৬২ শতাংশ, আমডাঙায় ৯৬.০৩ শতাংশ, সন্দেশখালিতে ১৫.৮৯ শতাংশ এবং বসিরহাট দক্ষিণে ৯৫.৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।

ব্যারাকপুর মহকুমার মধ্যে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে নোয়াপাড়া কেন্দ্রে। এখানে ভোটের হার ৮৭.১২ শতাংশ। এরপরেই আছে বরাহনগর। এখানে ভোটের হার ৮৮.৫৯ শতাংশ। ব্যারাকপুর কেন্দ্রে ভোটের হার ৮৯.৮২ শতাংশ। পানিহাটি কেন্দ্রে ভোটের হার ৯১.৪৮ শতাংশ।



