দুই দফায় প্রায় আড়াই ঘণ্টা শুনানি চলল সুপ্রিম কোর্টে। সকাল সাড়ে ১১টার কিছু আগে শুরু হয় শুনানি। দুপুর ১টা থেকে ২টো পর্যন্ত মধ্যাহ্নবিরতি। তার পরে আবার প্রায় এক ঘণ্টা ধরে শুনানি চলে। আইপ্যাক-কাণ্ডে সিবিআই তদন্তের আবেদন জানায় ইডি। অন্য দিকে ভোটের মুখে এই অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে রাজ্য।


রাজীবদের সাসপেনশন দাবি নিয়ে কিছুই বলল না সুপ্রিম কোর্ট, তবে আই-প্যাক তল্লাশিতে বাধায় কড়া পর্যবেক্ষণ

প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাট ও আই প্যাক তল্লাশি কাণ্ডে এদিনের মতো শুনানি শেষ হল। প্রথম দিনের শুনানির পর অন্তর্বতী নির্দেশ ঘোষণার সময়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাজে রাজ্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপের অভিযোগ শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে গিয়ে বিচারপতিরা এও জানিয়ে দেন, আইনের শাসন বজায় রাখতে এবং প্রতিটি সাংবিধানিক সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার স্বার্থেই এই বিষয়টি বিচার করা প্রয়োজন। বিচারপতি জে মিশ্রর কথায়, এখনকার দিনে সবাই সব কিছু জানতে পারে। এই মামলা ১০ মিনিট শুনেই রায় ঘোযণা করতে পারতাম। কিন্তু এত সওয়াল জবাব হল যে সুপ্রিম কোর্ট সবটাই রেকর্ডে রাখতে চায়। তার পর চূড়ান্ত একটা নির্দেশ দেওয়া হবে। নইলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আড়ালে অপরাধীদের রক্ষা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।”

তাৎপর্যপূর্ণ হল, ইডি বার বার দাবি করা সত্ত্বেও রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার বা কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মার বিরুদ্ধে কোনও নির্দেশ এদিন দেয়নি সর্বোচ্চ আদালত।

কয়লা পাচার মামলার সূত্রেই আই-প্যাক তল্লাশি
এদিন আদালতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, ২০২০ সাল থেকে প্রায় ২,৭৪২.৩২ কোটি টাকার কয়লা পাচার কেলেঙ্কারি তদন্ত করছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট । তদন্তে জানা যায়, কলকাতা থেকে গোয়ায় ‘কান্তিলাল’ ফার্মের মাধ্যমে অপরাধলব্ধ অর্থ পাঠানো হচ্ছিল, যার সূত্র গিয়ে মেলে আই-প্যাকের অপারেশনাল ফ্রেমওয়ার্কে।

এই তথ্যের ভিত্তিতেই ৮ জানুয়ারি প্রতীক জৈনের বাসভবন-সহ একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালাতে অনুমতি নিয়ে পৌঁছন ইডি আধিকারিকরা। সেই সময়ই কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার ও পরে স্বয়ং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে ঢুকে পড়েন।
‘তদন্তে বাধার একটি প্যাটার্ন’
সলিসিটর জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি তল্লাশিতে হস্তক্ষেপ করেন। ইডির দাবি, অতীতেও সিবিআই তদন্তের সময় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, যা কেন্দ্রীয় সংস্থার কাজে হস্তক্ষেপের একটি ‘প্যাটার্ন’ তৈরি করছে।

ইডির আরও অভিযোগ, তল্লাশির সময়ে সংগৃহীত কিছু সামগ্রী বেআইনিভাবে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে রাজ্য পুলিশের তরফে ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়। এই পরিস্থিতিতে বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে বলে আদালতকে জানানো হয়।
সিবাল–সিংভির পাল্টা যুক্তি
মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য সরকারের পক্ষে সওয়াল করে সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিবাল ও অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি বলেন, এই মামলাগুলি গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি ইতিমধ্যেই হাই কোর্টে বিচারাধীন, তাই সুপ্রিম কোর্টে নতুন করে শুনানির প্রয়োজন নেই।

সিবালের দাবি, পঞ্চনামা অনুযায়ী তল্লাশিতে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বা বেআইনি সামগ্রী উদ্ধার হয়নি। তাঁর বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারম্যান হিসেবে, কারণ প্রতীক জৈন দলের নির্বাচনী কাজের দায়িত্বে ছিলেন। আই-প্যাক অফিসে শুধুই নির্বাচনী সংক্রান্ত নথি ছিল, যার সঙ্গে ইডির কোনও সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করা হয়। অন্যদিকে, সিংভি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী Z+ নিরাপত্তা পান, তাই তাঁর সঙ্গে ডিজিপির যাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।
আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতিরা জানান, এই মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তে রাজ্য সংস্থার হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, “আইনের শাসন বজায় রাখা এবং প্রতিটি সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার জন্য এই বিষয়টি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। নচেৎ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আড়ালে অপরাধীদের রক্ষা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।”
বিচারপতিরা আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সংস্থার কোনও অধিকার নেই রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কাজে হস্তক্ষেপ করার। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন—যদি কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থা সৎ উদ্দেশ্যে গুরুতর অপরাধের তদন্ত করে, তবে কি দলীয় কাজের অজুহাতে তাদের কাজ আটকে দেওয়া যায়?

অন্তর্বর্তী নির্দেশ
এই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়—এই মামলায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নোটিস দেওয়া হবে। দুই সপ্তাহের মধ্যে কাউন্টার হলফনামা জমা দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। তা ছাড়া ৮ জানুয়ারি যে দুইটি জায়গায় তল্লাশি হয়েছিল, সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ ও স্টোরেজ ডিভাইস সংরক্ষণ করতে হবে। পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে চলতি সমস্ত পুলিশি তদন্ত স্থগিত থাকবে।
এদিন অন্তবর্তী রায় ঘোষণার পরেও বিচারপতিদের উদ্দেশে সলিসিটর জেনারেল বার বার বলেন, পুলিশ কমিশনার ও ডিজিপি-র বিরুদ্ধে কিছু তো ব্যবস্থার নির্দেশ দিন। কিন্তু শীর্ষ আদালত তাতে সম্মত হয়নি।




