

জল্পনা-কল্পনা শুরু হয় হপ্তা দুয়েক আগে। খবরের প্রথম খসড়া। মঙ্গলবারে। নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে অরিজিৎ লিখলেন, “আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি, এ বার থেকে আমি আর প্লেব্যাক গায়ক হিসাবে কোনও কাজ করব না। আমি সিনেমায় গাওয়া বন্ধ করলাম।”
অরিজিতের সেই সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট যেন আকাশভাঙা। অস্থিরচেতা বাঙালিই শুধু নয়, অরিজিতের দৈবাৎ ঘোষণা গোটা ভারতভূমে হইচই ফেলে দিয়েছিল।

প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার রেশ এখনও কাটেনি। ঠিক তার মধ্যেই রোববার কলকাতার মঞ্চে ফের শোনা গেল অরিজিৎ সিংয়ের কণ্ঠ! আর সেই মুহূর্ত ঘিরেই আবেগে ভেসে গেল নেটদুনিয়া।
সেই গায়কই ফিরে এলেন। কলকাতার মঞ্চে। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে ‘চার্টবাস্টার’ নয়। একেবারে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে।

গাইলেন লক্ষ্মী শঙ্করের গাওয়া জনপ্রিয় ধ্রুপদী আধুনিক বাংলা গান ‘মায়া ভরা রাতি’। শ্যামল গুপ্তের কথায় এই গানে সুরারোপ করেছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। যা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে ‘চয়নিকা রাগাশ্রয়ী বাংলা গান’-এর সংকলনে। সে গানের লিরিক্স ঘাঁটলে দেখা যাবে, “ছলো ছলো চোখে চাঁদ কী যে বলে যায়, শুনে গেলে না”। যদিও অনুষ্কার ঐতিহাসিক মঞ্চে অরিজিৎ গাইলেন, “চলে গেলে না”।

এ অরিজিৎ পূর্ববৎ নয়। সুরকার-সেতারবাদক অনুষ্কার সঙ্গতে ব্যতিক্রমী গাইয়ে দেখিয়ে দিলেন, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’। নেতাজি ইন্ডোরে এমনই ঘরওয়াপসির সাক্ষী থাকল কলকাতাবাসী।
অনুষ্কা শঙ্করের কনসার্টে অতিথি শিল্পী হিসেবে হাজির ছিলেন অরিজিৎ। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি কেউ আগাম ঘোষণা দিয়েই রাখেনি, হঠাৎ করেই হাজির হলেন অরিজিৎ। অনুষ্কা যখন দর্শকদের সামনে জিয়াগঞ্জের ভূমিপুত্রকে আমন্ত্রণ জানান, তখনই গ্যালারি জুড়ে শুরু হয়ে যায় আকাশ ফাটানো চিৎকার! সঙ্গে মুহুর্মুহু হাততালি। সেই মুহূর্তের ভিডিওতে ধরা পড়ে, মঞ্চে উঠে খানিকটা ইতস্তত অরিজিৎ বলছেন, “ এইমুহূর্তে আমি খুব নার্ভাস…আর আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ।”

তারপর যা হল, তা নিছক একটি পারফরম্যান্স নয়, একটি আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম। অনুষ্কা শঙ্কর ও তবলাবাদক বিক্রম ঘোষের সঙ্গে অরিজিৎ পরিবেশন করেন ‘মায়া ভরা রাতি’। লক্ষ্মী শঙ্করের গাওয়া এই বাংলা গান, প্রয়াত সেতার-সম্রাট পণ্ডিত রবি শঙ্করের সুরে বাঁধা আর সেই সুরে অরিজিতের কণ্ঠ যেন নতুন করে প্রাণ পেয়ে ওঠে। গান শেষ হতেই দর্শকাসনে ছড়িয়ে পড়ে আবেগের ঢেউ।
শুধু মঞ্চেই নয়, গান শেষে অরিজিৎ আরও জানান, অনুষ্কার বাড়িতে গিয়ে দু’জনে একসঙ্গে নতুন একটি গানও কম্পোজ করেছেন। শিল্পীর এই মন্তব্য থেকেই ইঙ্গিত স্পষ্ট -প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ালেও সঙ্গীত থেকে তিনি কোনওভাবেই দূরে নন।
এই পারফরম্যান্সের ভিডিও ভাইরাল হতেই অনুরাগীদের প্রতিক্রিয়ায় ভরে ওঠে সমাজমাধ্যম। কেউ লেখেন, “খুশি আর ভাঙা মন -দুটো একসঙ্গে।” কারও মন্তব্য, “অনেকদিন পর ওঁকে লাইভ শুনলাম।” আবার কেউ আবেগে লিখেছেন, “অরিজিৎ! তোমার গলা মিস করছিলাম। এখনও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।”

সঙ্গীতজীবনের তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে ‘ইন্ডিয়া ট্যুর’-এ নেমেছেন অনুষ্কা শঙ্কর। ৩০ জানুয়ারি হায়দরাবাদ থেকে শুরু হয়েছে তাঁর এই সফর। পরদিন বেঙ্গালুরু, ১ ফেব্রুয়ারি মুম্বই, ৬ ফেব্রুয়ারি পুণে, ৭ ফেব্রুয়ারি দিল্লি—একটির পর একটি শহর ছুঁয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি সকালে গোটা দল নিয়ে তিনি পৌঁছন কলকাতায়।

কলকাতার সঙ্গে অবশ্য অনুষ্কার এই ‘সারপ্রাইজ’ সম্পর্ক নতুন নয়। এর আগে টটেনহ্যামে অরিজিৎ সিংয়ের এক অনুষ্ঠানে আচমকাই সেতার হাতে হাজির হয়েছিলেন তিনি। সেই অপ্রত্যাশিত যুগলবন্দি আজও অনুরাগীদের স্মৃতিতে তাজা। এ বার সেই স্মৃতিই যেন সিদ্ধি পেল প্লেব্যাক থেকে মুখ ফেরানো অরিজিতের উপস্থিতিতে।



