বনগ্রামের বাঙাল শংকরের চিরস্থায়ী জায়গা বাঙালির হৃদয়ে

0
230
মিলি দাস , দেশের সময়

প্রয়াত জনপ্রিয় সাহিত্যিক মণি শংকর মুখার্জি। পাঠকমহলে যিনি সমাদৃত ছিলেন শংকর নামেই। বয়স হয়েছিল ৯৩। গত বেশ কিছুদিন ধরেই বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ‘চৌরঙ্গী’র লেখক। শুক্রবার দুপুরে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই লেখক। ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের জনপ্রিয়তা তাঁকে রাতারাতি যেমন বাঙালি পাঠকের ঘরের মানুষ করে তুলেছিল। এই উপন্যাস নিয়ে বিখ্যাত ছবিও তৈরি হয়েছিল পরবর্তীতে। উত্তমকুমার, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত সেই ছবি কালজয়ী তকমা পেয়েছে। 

১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম হয় লেখকের। এরপর সপরিবারে চলে আসেন হাওড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি আক্রমণের ভয়ে পরিবারের সবাই বনগাঁ ফিরে গেলেও শংকর তাঁর বাবার সঙ্গে থেকে যান হাওড়াতেই। কিন্তু স্বাধীনতার বছরে পিতৃবিয়োগ হয় মণিশংকরের। সম্বলহীন কিশোর, জীবিকার প্রয়োজনে অফিসের কেরানির চাকরি থেকে গৃহ পরিচারকের কাজ এমনকি হকারিও করেছেন। এরপর তৎকালীন রিপন কলেজে পড়ার সময় তিনি কাজ করতেন হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে। তাঁকে নিয়েই লিখে ফেলেন আস্ত একটি উপন্যাস, ‘কত অজানারে’। সাহিত্য জগতে সেই প্রথম পা রাখা শংকরের।

১৯৩৩ সালে যশোর জেলার বনগ্রামে শংকরের জন্ম— আর সেখানেই লুকিয়ে আছে এক ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর কয়েক ঘণ্টার জন্য বনগ্রাম পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়, এমনকি পতাকাও উত্তোলন করা হয়েছিল। “তারপর র‍্যাডক্লিফের মানচিত্রে গুরুতর ভুল ধরা পড়ল, আর আমরা পাকিস্তানি থেকে আবার ভারতীয় হয়ে গেলাম,” —‘এ বঙ্গাল ফ্রম বনগ্রাম’ প্রবন্ধে লিখেছেন তিনি। বাংলায় পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আগতদের বলা হয় ‘বাঙাল’, আর পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ‘ঘটি’— দু’পক্ষের মধ্যে বই, গান, খাবার থেকে প্রিয় ফুটবল ক্লাব পর্যন্ত নানা বিষয় নিয়ে মিষ্টি-ঝাল ঠাট্টা-তর্ক চলে।

শংকর ছিলেন মধ্যবিত্ত-উচ্চ মধ্যবিত্তদের মন-মানসিকতা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ভণ্ডামির খোলনলচে বের করে দেওয়া লেখক। একেবারে বনগাঁর ভূত থেকে কোট-টাই পরা জনসংযোগ অফিসারটি। গাঁগঞ্জের চাষাভুসোরা শংকরের চরিত্র নন, বরং সাহেবি কেতায় থাকা উচ্চবিত্ত ও স্ট্যাটাস সিম্বলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভেতো বাঙালিই তাঁর মূল চরিত্র। ভোগ-লালসা, অর্থ পিপাসার জন্য পাপ ও সেই পাপের জন্য অন্তরাত্মার অনুশোচনার মতো ভণ্ডামিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। আবার সেই শংকরই আচমকাই উপন্যাসের জগৎ ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন বিবেকানন্দ লোকে।

হোটেলের লাল আলোগুলো তখনও জ্বলছে, নিভছে।’
মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ওরফে শংকর লিখিত ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের শেষটা হয়েছিল এভাবেই ।

লেখক নিজেই একটি সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলেন
উল্লিখিত পংক্তিটি নাকি জীবনের কথা বলে। যে জীবনে স্থবিরতা নেই। আছে বহমানতা। আলোর এই নিভে গিয়ে আবার জ্বলে ওঠাই বুঝিয়ে দেয় কিছু এখনও বাকি রয়ে গেছে।

পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিক। ইংরেজ শাসন শেষ হয়ে গেলেও, তখনও ভারত ছাড়েননি সাহেবরা। কলকাতাও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানকারই হাইকোর্টে তখন ওকালতি করছেন এক ইংরেজ ব্যারিস্টার— নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল। ইতিহাস বলে দেবে, ইনিই ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার। যাই হোক, সেই নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে হাজির হলেন এক বাঙালি তরুণ। সাহেবের অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে শুরু করলেন কাজ। তবে সে তো কেবল পকেটের জন্য। ভেতরের স্বপ্ন যে অন্য। তরুণটি লিখতে চান। কিন্তু সাহেব বেশ অসুবিধাতেই পড়লেন প্রথমে। না, লেখালেখি নিয়ে নয়, ছোকরার নাম নিয়ে। এত বিশাল একটি বাঙালি নাম, উচ্চারণ করবেন কী করে! অতএব, ছোটো হল নাম। সেদিন থেকেই, ‘মণিশংকর মুখোপাধ্যায়’ হয়ে গেলেন ‘শংকর’…।

এই হাইকোর্টের কেরানির জীবন, সেখানকার পরিবেশ, চেনা-অচেনা মানুষ ও কলকাতা— এই সবকিছু একটু একটু করে দেখছিলেন শংকর। দেখছেন, আর এগোচ্ছেন। ১৯৫৩ সাল। ঠিক করলেন, যা ঘটছে চারপাশে সেখান থেকেই উপাদান নিয়ে শুরু করবেন লেখা। শংকরের বয়স তখন সবে উনিশ কি কুড়ি। শুরু হল ‘কত অজানারে’ লেখার কাজ। বারওয়েল সাহেব, তাঁর জীবনের গল্প, হাইকোর্টের দৃশ্য এবং সেখানকার গল্প— সব নিয়ে তৈরি হল একটা উপাখ্যান। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ, এবং ১৯৫৫ সালে বইয়ের আকারে প্রকাশ পেল ‘কত অজানারে’। প্রথম বইতেই বাজিমাত। সাহিত্যমহলে সদর্পে পা রাখলেন শংকর।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি একটি নাটক রচিত হয় ‘চৌরঙ্গী’ নিয়ে। ‘চৌরঙ্গী’ তো বটেই পাশাপাশি শংকরকে আমরা মনে রাখব ‘জন অরণ্য’,‘সীমাবদ্ধ’,‘স্থানীয় সংবাদ’-এর মতো কালজয়ী উপন্যাসগুলির জন্যও। ‘জন অরণ্য’ এবং ‘সীমাবদ্ধ’ অবলম্বনে ছবি নির্মাণ করেছেন সত্যজিৎ রায়
এক সাক্ষাৎকারে এই স্বপ্নের চরিত্র নিয়ে লেখক বলেন
 “ইস্টার্ন রেলওয়েতে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর নাম ছিল সত্যসুন্দর বসু। আমি তখন ওখানে চাকরি করি। তিনি সাহেবদের সঙ্গে খুব মিশতেন। স্কাউটিং করতেন। স্মার্ট লোক ছিলেন। কায়দা করে ইংরেজি বলতেন। সব সময় বলতেন আমার নাম স্যাটা বোস। খুব পপ্যুলার ফিগার ছিলেন। আমি অবশ্য দূর থেকে দেখেছি। অতটা আলাপ ছিল না। আবার স্পেনসেস হোটেলে একজনকে পেয়েছিলাম, যিনি পরে গ্রেট ইস্টার্নে চলে যান। তাঁর মধ্যে একটা অভিভাবক সুলভ ব্যাপার ছিল। তাঁরও ধারণা ছিল ওঁকে ভিত্তি করে লিখেছি।”

তখন ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস শুরু করবেন। কিন্তু কীভাবে করবেন বুঝতে পারছেন না। মধ্যবিত্ত পরিবার, কোনদিন বড়ো হোটেলে যাননি। কিন্তু ঠিক করেছেন, হোটেল নিয়ে বই লিখবেন। কথায় কথায় একদিন এমনটা জানালেন অমিয় চক্রবর্তীকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। কলকাতার হোটেল নিয়ে বই লিখবে, অথচ সেখানকার জীবন দেখবে না, জানবে না তা হয় নাকি? যদি ভুলভাল লিখে ফেলে, তাহলে তো বদনাম হয়ে যাবে! সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিলেন অমিয় চক্রবর্তী। পরবর্তী দুই বছর, শংকর যে যে হোটেল, বারে যেতে চান সেখানে বিনা বাধায় যাবেন। কেউ কিচ্ছু বলবে না। কোনো খরচও লাগবে না। ‘চৌরঙ্গী’ লেখার জন্য যা যা করার দরকার, সব করবেন শংকর।

ব্যস, এমন সাহায্য চলে এলে তো থেমে থাকতে নেই। গ্র্যান্ড, গ্রেট ইস্টার্ন, স্পেনসেস— শংকরের হাত ধরে কলকাতা চিনল তার আরও একটি সত্তাকে। বাকিটা নিশ্চয়ই নতুন করে বলে দিতে হবে না। ২০১২ সাল পর্যন্ত যে উপন্যাসের ১১১টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে, সেটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ ওঠারই কথা নয়। সেই সময় প্রশংসাও এসেছে, সঙ্গে নিন্দাও। কিন্তু ‘চৌরঙ্গী’ এড়িয়ে কি যাওয়া যায়? 

শংকর ছিলেন মধ্যবিত্ত-উচ্চ মধ্যবিত্তদের মন-মানসিকতা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ভণ্ডামির খোলনলচে বের করে দেওয়া লেখক। একেবারে বনগাঁর ভূত থেকে কোট-টাই পরা জনসংযোগ অফিসারটি। গাঁগঞ্জের চাষাভুসোরা শংকরের চরিত্র নন, বরং সাহেবি কেতায় থাকা উচ্চবিত্ত ও স্ট্যাটাস সিম্বলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভেতো বাঙালিই তাঁর মূল চরিত্র। ভোগ-লালসা, অর্থ পিপাসার জন্য পাপ ও সেই পাপের জন্য অন্তরাত্মার অনুশোচনার মতো ভণ্ডামিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। আবার সেই শংকরই আচমকাই উপন্যাসের জগৎ ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন বিবেকানন্দ লোকে।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে আমার একটি নন-ফিকশন বই বাংলায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। ইংরেজিতেও অনূদিত হয়েছে –

দ্য মঙ্ক অ্যাজ ম্যান: দ্য আননোন লাইফ অব স্বামী বিবেকানন্দ। কেন এমন হল কে জানে—তিনি তো এক বিস্ময়, আর আমি স্রেফ এক বৃদ্ধ মানুষ। সারা দেশ থেকে অবিশ্বাস্য সব ফোন পাই। দু’দিন আগে গুজরাট থেকে এক পাঠক ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, বলুন তো, বিবেকানন্দ কেন গেরুয়া রং বেছে নিয়েছিলেন? তা কি এই কারণে যে এতে সহজে ময়লা ধরা পড়ে না?

২০১৫ সালে,তাঁর ৮১ বছর পূর্তিতে একা একা একাশি
প্রথম বাংলায় প্রকাশিত হয়। পরে অনুবাদক অরুণাভ সিংহর ইংরেজি অনুবাদে বইটি বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছেছে।

যে লেখক তাঁর উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি এমনকি বিবেকানন্দ-অনুসন্ধানেও নিজের স্মৃতিকে আলোকবর্তিকার মতো ব্যবহার করেছেন, তাঁর পাঠকসংখ্যা এই অনুবাদে আরও বেড়েছে।

অখ্যাত এক নবাগত লেখকের বেস্টসেলার উপন্যাস দেখে অনেকে তাঁকে ‘এক-বইয়ের লেখক’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের গল্পকার হার মানেননি। কারণ তাঁর নাম যে মণিশংকর। ভোলাশঙ্করের মতোই বাঙালি পাঠকের মনের মণিকোঠায় বসে থাকার জন্যই জন্মেছিলেন। মুচমুচে গল্পকথার জনক শংকর তাই বাংলা সাহিত্যে হয়তো কোনওদিনই অমরত্ব পাবেন না, কিন্তু, বাঙালির ভিতরের চরিত্রটার খোঁজে নামলে, অবশ্যই স্মরণ নিতে হবে তাঁকে। শরৎচন্দ্রের মতোই তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কথাশিল্পী।

শংকর-এর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জানালেন, সাহিত্য জগতের এই অপূরণীয় ক্ষতিতে শোকাহত তিনি।

Previous articleভারত-বাংলাদেশ ভিসা পরিষেবা চালু? বদলাচ্ছে সম্পর্ক ,বড় পদক্ষেপের পথে ভারত
Next articleমিমি ২ কোটির মানহানির মামলা ঠুকতেই নতুন পদক্ষেপ!অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে  বনগাঁ থানায় লিখিত অভিযোগ তনয় শাস্ত্রীর! 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here